মার্চ মাস শেষ হয়ে আসছে। এই একটা মাসে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হামে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে ১২টি শিশু। ৯ জন মারা গেছে আইসিইউতে ঢোকার পরে, আর তিনজন আইসিইউতে ঢোকারই সুযোগ পায়নি, তার আগেই শেষ। শিশু হিয়ার বাবা রিফাত হোসেন বলেছেন, আইসিইউ পাওয়ার আগেই তার মেয়ে চলে গেছে। এই একটা বাক্যেই বোঝা যায় দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা এখন কোথায় দাঁড়িয়ে আছে।
ফেব্রুয়ারির ১২ তারিখে যে সরকার ক্ষমতায় বসেছে, তারা এই পরিস্থিতিতে কী করেছে? হাসপাতালে আইসোলেশন ব্যবস্থা নেই, জনবল নেই, আইসিইউ নেই। ৮৪ জন শিশুকে আইসিইউতে নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছিল এই মাসে। সুপারিশ হয়েছে, কিন্তু ব্যবস্থা হয়নি। কারণ সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে নাকি পর্যাপ্ত জনবল নেই। এই কথাটা হাসপাতালের মুখপাত্র নিজেই বলেছেন। তার মানে সমস্যাটা সবাই জানেন, কিন্তু কেউ সমাধান করেননি।
সবচেয়ে ভয়াবহ যে তথ্যটা বেরিয়ে এসেছে সেটা হলো, হাসপাতালে আইসোলেশন না থাকায় হামে আক্রান্ত শিশুদের সাধারণ রোগীদের সাথেই রাখা হচ্ছিল। মোহাম্মদ ওয়াসিম ঠান্ডার সমস্যা নিয়ে তার শিশুকে ভর্তি করেছিলেন। একই ওয়ার্ডে হাম আক্রান্ত শিশু থাকায় তার সন্তানও আক্রান্ত হয়ে গেছে। হাসপাতালে গিয়ে সুস্থ শিশু হামে আক্রান্ত হচ্ছে। এটা কোনো উন্নয়নশীল দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার চিত্র হতে পারে না, এটা সম্পূর্ণ ব্যর্থতার চিত্র।
রাজশাহী, পাবনা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ তিনটি জেলায় সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহায়তায় ১৮ মার্চ ১৫৩ জনের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে, তার মধ্যে ৪৪ জনের হাম পজিটিভ এসেছে। প্রায় ২৯ শতাংশ। এই হার অত্যন্ত উচ্চ। আর এই পরিস্থিতিতে কোনো জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে কি? শনিবার, মানে ২৮ মার্চ, মাসের শেষ দিকে এসে হাসপাতালের দুটো ওয়ার্ডকে হাম আইসোলেশন কর্নার ঘোষণা করা হয়েছে। ১২টা শিশু মরে যাওয়ার পরে এই সিদ্ধান্ত এল।
বিএনপির এই সরকার ক্ষমতায় এসেছে দেশের বড় রাজনৈতিক দলগুলোকে বাইরে রেখে, জনগণের বয়কট করা একটা নির্বাচনের মাধ্যমে। তারা বলেছিল দেশ চালাতে পারবে, মানুষের জন্য কাজ করবে। রাজশাহীতে এখন যা হচ্ছে সেটা তাদের সেই দাবির জবাব। শিশুদের জন্য আইসিইউ নেই, আইসোলেশন নেই, জনবল নেই। যা আছে তা হলো অজুহাত আর বিলম্বিত সিদ্ধান্ত।
স্বাস্থ্য বিভাগের কর্তারা বলছেন পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। নির্দেশনা জারি হয়েছে। কিন্তু নির্দেশনা আর বাস্তবতার ফারাকটা ঠিক কতটা, সেটা বোঝা যায় রিফাত হোসেনের কথায়। তার মেয়ে নির্দেশনার জন্য অপেক্ষা করেনি। হাম কোনো নতুন রোগ না, এর টিকা আছে, চিকিৎসা আছে। কিন্তু ব্যবস্থাপনা না থাকলে টিকা আর চিকিৎসা থাকলেই কী আর না থাকলেই কী।
যে দল জনগণের ভোটে ক্ষমতায় আসেনি, তাদের কাছ থেকে জনগণের জন্য দায়িত্ববোধ আশা করাটা হয়তো বেশি চাওয়া। কিন্তু ১২টা শিশুর মৃত্যু এই প্রশ্নটা তুলে দিয়ে গেছে যে এই সরকার আদৌ দেশ চালানোর যোগ্য কিনা। উত্তরটা রাজশাহী মেডিকেলের সেই ওয়ার্ডগুলোর দিকে তাকালেই পাওয়া যায়।

