বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় ইতিহাস বিকৃতির অভিযোগ দীর্ঘদিনের হলেও সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক স্বার্থে এই প্রচেষ্টা আরও তীব্রতর রূপ নিয়েছে। বিশেষ করে বিএনপি-জামায়াত জোট এবং স্বার্থান্বেষী মহলের পক্ষ থেকে স্বাধীনতার প্রতিষ্ঠিত সত্যকে প্রশ্নবিদ্ধ ও বিতর্কিত করার এক মরিয়া চেষ্টা দৃশ্যমান হচ্ছে।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের দলিলপত্র সংকলনে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে—জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানই প্রথম ওয়্যারলেসে স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন। অথচ বিভিন্ন সময় ক্ষমতায় এসে রাজনৈতিক দলগুলো এই ইতিহাসকে নিজেদের মতো করে কাটছাঁট করার চেষ্টা করেছে।
জিয়াউর রহমানকে নিয়ে জামায়াত জোটের অলি আহমদের বিতর্কিত দাবি
সম্প্রতি ঢাকায় জাতীয় প্রেস ক্লাবে জামায়াত আয়োজিত এক আলোচনা সভায় প্রধান বক্তা হিসেবে অংশ নেন এলডিপি চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ (বীর বিক্রম)। সেখানে তিনি দাবি করেন, ১৯৭১ সালে তিনি নিজে বিদ্রোহ না করলে বিদ্রোহ হতো না এবং তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমান চট্টগ্রাম বন্দরের দিকে যাচ্ছিলেন, তাকে ফিরিয়ে না আনলে কয়েক মিনিট পর মেরে কর্ণফুলী নদীতে ফেলে দেওয়া হতো।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, জামায়াতের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ হয়ে জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেওয়া অলি আহমদের এই বক্তব্য মুক্তিযুদ্ধের মাঠপর্যায়ের সত্যকে ধোঁয়াশায় ফেলার চেষ্টা। অন্যদিকে বিএনপি বরাবরই দাবি করে আসছে জিয়াউর রহমানের ঘোষণাই ছিল মুক্তিযুদ্ধের মূল ডাক এবং খালেদা জিয়া দেশের প্রথম নারী মুক্তিযোদ্ধা। দুই পক্ষের এমন পরস্পরবিরোধী ও অতিশয়োক্তিমূলক বয়ান ইতিহাস বিকৃতির রাজনীতিকেই স্পষ্ট করে।
৫ আগস্ট ২০২৪-এর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও ইতিহাসকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার অভিযোগ উঠেছে। উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলো হলো:
জাতীয় দিবস বাতিল: মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার ঐতিহাসিক ৭ই মার্চ, ১৫ই আগস্ট (জাতীয় শোক দিবস), ১৭ই মার্চসহ ৮টি জাতীয় দিবস বাতিল করে। আওয়ামী লীগ একে “ইতিহাস মুছে ফেলার ষড়যন্ত্র” ও “পাকিস্তানি মতাদর্শের প্রচার” বলে তীব্র নিন্দা জানায়।
পাঠ্যপুস্তকে কাঁটাছেঁড়া: ২০২৫ সালের শুরু থেকে পাঠ্যবইয়ে মুক্তিযুদ্ধ অংশে ব্যাপক পরিবর্তন এনে অন্য নেতাদের সামনে আনা হয়। এক পক্ষ একে ভারসাম্য আনার চেষ্টা বললেও অন্য পক্ষ একে পূর্ববর্তী ইতিহাসকে খাটো করার চেষ্টা হিসেবে দেখছে।
স্মৃতিস্তম্ভ ও ম্যুরাল ভাঙচুর: ৫ আগস্টের পর দেশজুড়ে বঙ্গবন্ধুর অসংখ্য ভাস্কর্য, ম্যুরাল ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন ভাঙচুর করা হয়, যা বীর মুক্তিযোদ্ধাদের হৃদয়ে চরম আঘাত হেনেছে।
স্বীকৃতি বাতিলের গুঞ্জন: জাতীয় চার নেতা ও ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বিজয়ী জনপ্রতিনিধিদের “বীর মুক্তিযোদ্ধা” তালিকা থেকে বাদ দিয়ে কেবল “সহযোগী” করার অধ্যাদেশের খবর গণমাধ্যমে এলে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
ইতিহাসের খলনায়ক হিসেবে পরিচিত জামায়াত কিছু নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মহল ১৯৭১-এর গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসকে সবসময়ই “ভারতকেন্দ্রিক” বা “অতিরঞ্জিত” বলে লঘু করার অপচেষ্টা চালিয়ে আসছে।
বিশ্লেষকদের মতে, দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে মুক্তিযুদ্ধের নির্ভেজাল সত্যকে ধারণ না করলে জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা অসম্ভব। ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে জাতীয় বীরদের অবদানকে খাটো করা কিংবা স্বাধীনতার ঘোষণার একক কৃতিত্ব নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানো মূলত মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনার সঙ্গেই বড় ধরনের বিশ্বাসঘাতকতা।

