নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার প্রথম মাসেই গভীর সংকটে পড়েছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার। একদিকে লুটপাট ও অব্যবস্থাপনায় বিপর্যস্ত অর্থনীতি, অন্যদিকে মন্ত্রীদের একের পর এক বিভ্রান্তিকর ও বাস্তবতা-বিবচ্ছিন্ন মন্তব্যে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। বিশেষ করে ঈদযাত্রা ও দেশের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট নিয়ে সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের অসত্য বক্তব্য চরম ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে জনমনে।
ঈদযাত্রায় ‘ভাড়া সন্ত্রাস’ ও মন্ত্রীর বিতর্কিত মন্তব্য
এবারের ঈদুল ফিতরে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি এবং অতিরিক্ত ভাড়া আদায় নিয়ে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের নানা মন্তব্য তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ঈদযাত্রার পুরোটা সময় তিনি দাবি করেছেন—কোথাও অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়া হচ্ছে না, বরং যাত্রীদের অভিযোগ যে ভাড়া কম নেওয়া হচ্ছে!
তবে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির পরিসংখ্যান বলছে ভিন্ন কথা। সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী এক বিবৃতিতে জানান, পরিবহন মালিকদের নৈরাজ্য এবং সরকারের নজরদারির অভাবে গত ২০ বছরের রেকর্ড ভেঙেছে এবারের ভাড়া সন্ত্রাস। সমিতির তথ্যানুযায়ী:
৮৭ শতাংশ বাস-মিনিবাসে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হয়েছে। ৫৫০ টাকার ঢাকা-পাবনা/নাটোরের ভাড়া নেওয়া হয়েছে ১২০০ টাকা। ৫০০ টাকার ঢাকা-রংপুরের ভাড়া ঠেকেছে ১৫০০ টাকায়। সব মিলিয়ে দূরপাল্লার ৪০ লাখ ট্রিপে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় হয়েছে প্রায় ১৪৮ কোটি টাকা।
মন্ত্রীর ‘স্বস্তিদায়ক ঈদযাত্রা’র দাবির বিপরীতে চন্দ্রায় ৩০ কিলোমিটার দীর্ঘ যানজট, সদরঘাটে বিশৃঙ্খলা এবং ট্রেনের বগি লাইনচ্যুত হয়ে অসংখ্য মানুষের আহত হওয়ার ঘটনা সরকারের ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতাকেই স্পষ্ট করেছে।
ঈদযাত্রায় রেকর্ড প্রাণহানি: সরকারি হিসেবে সড়কে ৯২ দুর্ঘটনায় ১০০ জন নিহত হলেও বেসরকারি সংস্থা ‘রোড সেফটি ফাউন্ডেশন’ জানিয়েছে ভিন্ন তথ্য। তাদের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, ঈদের ছুটিতে ২৬৮টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২০৪ জন নিহত এবং ৬ শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন। নির্বিঘ্ন ঈদযাত্রার সরকারি দাবির মুখে এই প্রাণহানি অতীতের যেকোনো রেকর্ডের চেয়ে বেশি।
তেলের পর্যাপ্ত মজুতের দাবি, অথচ পাম্পে দীর্ঘ লাইন
দেশে জ্বালানি তেলের কোনো সংকট নেই এবং পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে বলে সম্প্রতি এক বিবৃতিতে দাবি করেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের তথ্যকে ‘বিভ্রান্তিকর’ বলে উড়িয়ে দেন।
অথচ মাঠপর্যায়ের চিত্র সম্পূর্ণ বিপরীত। ঈদের ছুটি শেষ হতেই রাজধানীসহ সারাদেশে পেট্রোল, অকটেন ও ডিজেলের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। ফিলিং স্টেশনগুলোতে গাড়ির দীর্ঘ লাইন এবং ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও তেল না পাওয়ার অভিযোগ চালকদের। কোথাও কোথাও পাম্প বন্ধ রাখা হয়েছে ‘তেল নেই’ লিখে। তেলের মজুত শেষ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় সরকার সরবরাহ ১০ থেকে ১৫ শতাংশ কমিয়ে দেওয়ায় তৈরি হয়েছে চরম বিশৃঙ্খলা।
দেশীয় সম্পদেও সংকট: সুশাসনের অভাব ও নীতিহীনতা
বাংলাদেশের গ্যাস উত্তোলনের উপজাত (বাই-প্রোডাক্ট) হিসেবে পেট্রল ও অকটেন দেশীয় চাহিদার চেয়েও বেশি উৎপাদিত হয়। ২০২২ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক অনুষ্ঠানে স্পষ্ট বলেছিলেন, বাংলাদেশ অকটেন ও পেট্রলে স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং মাঝে মাঝে উদ্বৃত্ত তেল বাইরে বিক্রিও করা হয়।
স্বয়ংসম্পূর্ণ এই খাত নিয়ে যেখানে কোনো দুশ্চিন্তা থাকার কথা ছিল না, সেখানে বর্তমান সরকারের অদক্ষতা ও সিন্ডিকেট তোষণের কারণে জনগণকে আজ তেলের জন্য হাহাকার করতে হচ্ছে। ডিপোগুলো চাহিদামতো তেল সরবরাহ করতে পারছে না। প্রশ্ন উঠেছে, যে অকটেন-পেট্রল এতদিন বাংলাদেশ রপ্তানি করত তা আজ কোথায় গেল?
মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতাকে অজুহাত করা হলেও বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সংকটের মূল কারণ সরকারের চরম অদক্ষতা ও লুটপাটের মনোভাব। এই সংকটের বহুমুখী প্রভাব পড়ছে অর্থনীতিতে। গ্যাসের তীব্র সংকটে দেশের চারটি বড় সরকারি সার কারখানা উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে। লোডশেডিংয়ের কারণে গার্মেন্টস খাতের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের অজুহাতে পাবলিক ও প্রাইভেটসহ দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয় ঈদের অনেক আগেই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে টান: কাতার থেকে এলএনজি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় এবং চড়া মূল্যে স্পট মার্কেট থেকে কার্গো কেনার কারণে রিজার্ভ তলানিতে ঠেকেছে।
অর্থনীতিবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দেড় বছরের অন্তর্বর্তী অধ্যায় পার করে নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এলেও তাদের লুটপাটের মনোভাবের কারণে অর্থনীতির রক্তক্ষরণ কমেনি। দেশ নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি কৌশল গ্রহণে সরকারের উদাসীনতা অব্যাহত থাকলে দেশের অর্থনীতি অচিরেই পঙ্গু হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের।

