বাংলাদেশের রাজনীতি যেন আবারও ফিরে যাচ্ছে ভয়ের অন্ধকারে। যতই নির্বাচনের দিন ঘনিয়ে আসছে, ততই দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন ভারী হয়ে উঠছে আতঙ্কের মেঘে। যে নির্বাচন একসময় ছিল জনগণের উৎসব, আজ তা পরিণত হচ্ছে উদ্বেগ আর অনিশ্চয়তার প্রতীকে।
ঢাকা, চট্টগ্রাম ও রাজশাহী—এই তিন বিভাগে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নীরব উদ্বেগ এখন একটাই রাজনীতির আড়ালে সশস্ত্র শক্তির উত্থান। গোয়েন্দা প্রতিবেদনে ইঙ্গিত মিলেছে, জামায়াত, ইসলামী ছাত্রশিবির এবং নবগঠিত এনসিপি যৌথভাবে বিপুল পরিমাণ অবৈধ অস্ত্র মজুদ করেছে, যার পরিমাণ যেকোন বিভাগীয় শহরের পুলিশ বাহিনীর অস্ত্রভাণ্ডারকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন এবারের নির্বাচন শুধু ব্যালটের নয়, হতে পারে “বারুদের যুদ্ধ”।
অস্ত্রের পাহাড়ে রাজনীতির নতুন খেলা
রাজশাহীতে অভিযান চালিয়ে উদ্ধার করা হয়েছে আগ্নেয়াস্ত্র, ধারালো অস্ত্র ও বিপুল গুলি। চট্টগ্রামের পাহাড়ি এলাকায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানেও এমন কিছু গোপন স্থাপনা পাওয়া গেছে, যেগুলোকে অনেকদিন ধরেই “প্রশিক্ষণ কেন্দ্র” হিসেবে সন্দেহ করা হচ্ছিল। ঢাকায়ও বিভিন্ন রাজনৈতিক কার্যালয়, ছাত্রনেতা ও মধ্যম পর্যায়ের নেতাদের বাসা থেকে অস্ত্র উদ্ধারের খবর মিলছে একের পর এক।
এই ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন নয়। বরং এগুলো এক সুসংগঠিত পরিকল্পনারই অংশ—যেখানে গণতন্ত্রের মাঠে লড়াই নয়, প্রস্তুতি চলছে অস্ত্রের জোরে প্রভাব বিস্তারের।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, নিষিদ্ধ থাকলেও জামায়াত ও ছাত্রশিবির নেপথ্যে থেকে তাদের সংগঠন পুনর্গঠনের চেষ্টায় আছে। আর এনসিপি নামের নতুন শক্তি সেই পুরনো ছায়াতলে এসে রাজনৈতিক ময়দানে নতুন মুখোশে আত্মপ্রকাশ করছে। লক্ষ্য একটাই—ভয় সৃষ্টি, বিশৃঙ্খলা ছড়ানো, আর ভোটের পরিবর্তে গুলির ভাষায় প্রভাব বিস্তার করা।
ভোটের মাঠে ভয়ের রাজনীতি
জামাত শিবির এনসিপি ও কয়েকটি জঙ্গী সংগঠন মিলে বিএনপির প্রায় ৭০ জন প্রার্থীর বিরুদ্ধে হামলার পরিকল্পনার খবর এখন রাজনীতির অন্দরে আলোচনার কেন্দ্রে। অনেক এলাকায় প্রার্থীদের জনসংযোগে বাধা, প্রচার অফিসে হামলা, এমনকি “প্রার্থী হত্যার মিশন” চালুর কথাও শোনা যাচ্ছে।
এই আতঙ্ক শুধু প্রার্থী নয়, সাধারণ ভোটারদের মাঝেও ভয় ছড়াচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি এক ধরনের “মনস্তাত্ত্বিক সন্ত্রাস” বা Psychological Terror—যার উদ্দেশ্য একটাই: ভোটের মাঠে জনগণকে ভয় দেখিয়ে দূরে রাখা। যখন প্রার্থী নিরাপদ নয়, তখন ভোটারও নিরাপদ থাকে না। ফলে গণতন্ত্র কাগজে টিকে থাকলেও বাস্তবে অস্ত্রধারীদের হাতে বন্দি হয়ে পড়ে।
রাষ্ট্রের ভূমিকা ও নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশের সংবিধান নাগরিক নিরাপত্তাকে রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব বলে ঘোষণা দিয়েছে। কিন্তু যখন একই রাষ্ট্রে অবৈধ অস্ত্রধারীরা পুলিশের চেয়েও শক্তিশালী হয়ে ওঠে, তখন সেই দায়িত্ব প্রশ্নবিদ্ধ হয়। নির্বাচন কমিশন এখন কেবল নির্বাচনের সময়সূচি ঘোষণার প্রতিষ্ঠান নয় এটি হয়ে উঠেছে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার একটি কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এখনই প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট নিরাপত্তা ব্লুপ্রিন্ট, যেখানে সেনা, পুলিশ, র্যাব ও গোয়েন্দা সংস্থার যৌথ তৎপরতায় প্রতিটি অঞ্চলে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করতে হবে। গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজকেও সামনে আসতে হবে এই বিষয়ে সচেতনতা গড়ে তুলতে। কারণ, নীরবতা মানেই সহায়তা।
গণতন্ত্রের চূড়ান্ত পরীক্ষা
বাংলাদেশের মানুষ যুদ্ধ করে স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছে—তারা ভয় পায় না। কিন্তু যখন গণতন্ত্র দুর্বল হয়, তখন অন্ধকার শক্তি সুযোগ নেয়। ইতিহাস সাক্ষী—প্রতি রাজনৈতিক সংকটের পেছনে লুকিয়ে থাকে কোনো না কোনো সশস্ত্র ষড়যন্ত্র।
আজকের বাস্তবতা তাই এক চূড়ান্ত পরীক্ষা। গণতন্ত্র কি বন্দুকের মুখে টিকতে পারবে? রাষ্ট্র কি সাহসী হয়ে সেই অন্ধ শক্তির মুখোশ খুলবে? নাকি আমরা সবাই নীরবে দেখবো ভোটের মাঠকে যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হতে?
শেষ কথা: ভয় নয়, আস্থা ফিরিয়ে আনুন, অস্ত্রের জোরে ক্ষমতা টিকে না এটি ইতিহাসের কঠিন শিক্ষা। যারা আজ গোপনে অস্ত্র মজুদ করছে, তারা শুধু রাষ্ট্র নয়, নিজেদের ভবিষ্যৎও ধ্বংস করছে।
নির্বাচন কোনো যুদ্ধ নয়; এটি জনগণের আস্থা ও আশা প্রকাশের উৎসব। এই উৎসবকে রক্তে রাঙানো মানে জাতির প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা। এখন সময় এসেছে ভয় নয়, আস্থা ফিরিয়ে আনার। গণতন্ত্রের জয় তখনই সম্ভব, যখন জনগণ নির্ভয়ে ভোট দিতে পারে বন্দুকের নয়, ব্যালটের শক্তিতে।

