দেশের কৃষি এখন এক ভয়াবহ দ্বৈত সংকটের মুখে—একদিকে সার, অন্যদিকে সেচ। সরকারের ভাষ্যে সবকিছু নিয়ন্ত্রণে, কিন্তু মাঠের বাস্তবতা বলছে সম্পূর্ণ ভিন্ন গল্প। এই বৈপরীত্য আজ আর শুধু উদ্বেগের নয়, বরং সরাসরি ক্ষোভের কারণ। কারণ, কাগজে-কলমে সাফল্যের গল্প লিখে কৃষকের জমিতে ফসল ফলানো যায় না—এটি বাস্তবতা, যা সরকার ইচ্ছাকৃতভাবে উপেক্ষা করছে।
ইরি-বোরো মৌসুম—দেশের খাদ্য উৎপাদনের প্রধান ভরকেন্দ্র— চলমান এই সময়ে কৃষকরা সবচেয়ে বেশি নির্ভর করেন সার ও সেচের ওপর। অথচ ঠিক এই সময়েই সার বাজারে কৃত্রিম সংকট, লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি এবং সেচের জন্য জ্বালানি সংকট একযোগে আঘাত হেনেছে।
সরকার বলছে, পর্যাপ্ত মজুত আছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে— যদি মজুতই থাকে, তাহলে কৃষক বেশি দামে সার কিনতে বাধ্য হচ্ছে কেন? কেন প্রকাশ্যে ডিলাররা সিন্ডিকেট গড়ে বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে, আর প্রশাসন নির্বিকার দর্শকের ভূমিকা পালন করছে?
সম্প্রতি জাতীয় পত্রিকাগুলোতে প্রকাশিত একাধিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে— কৃষকরা নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে ইউরিয়া ও ডিএপি কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। কোথাও কোথাও রাতভর লাইনে দাঁড়িয়েও সার পাচ্ছেন না। উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি জেলায় কৃষকরা অভিযোগ করেছেন, ডিলাররা গোপনে মজুত রেখে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে। অথচ এসব অভিযোগের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো অভিযান বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা দৃশ্যমান নয়। এতে স্পষ্ট হয়ে উঠছে— এই সিন্ডিকেট চক্র কেবল সক্রিয়ই নয়, বরং পরোক্ষভাবে প্রশ্রয়প্রাপ্ত।
এই প্রশ্নগুলোর কোনো জবাব সরকারের কাছে নেই। বরং মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধকে সামনে এনে একটি দায় এড়ানোর সংস্কৃতি গড়ে তোলা হচ্ছে। নিঃসন্দেহে বৈশ্বিক পরিস্থিতির প্রভাব রয়েছে, কিন্তু সেই বাস্তবতাকে ঢাল বানিয়ে অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা ও অদক্ষতাকে আড়াল করার চেষ্টা—এটি সরাসরি দায়িত্বহীনতার পরিচয়।
কৃষকের ভাষ্য আরও নির্মম—ডিজেল নেই, সেচ নেই, সময়মতো পানি নেই। কোনো কোনো এলাকায় পাম্প মালিকরা তেল না পেয়ে সেচ বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছেন। আবার কোথাও ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে সামান্য জ্বালানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে। জাতীয় দৈনিকগুলোর প্রতিবেদনে এসেছে—কিছু অঞ্চলে জমি শুকিয়ে ফেটে যাচ্ছে, কারণ সেচ দিতে না পেরে কৃষকরা চাষাবাদই বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছেন। এই অবস্থাকে যদি সরকার “সংকট নয়” বলে চালিয়ে দেয়, তাহলে তা কেবল অদক্ষতা নয়—এটি বাস্তবতা অস্বীকারের এক বিপজ্জনক ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রবণতা।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, একদিকে সরকার বলছে পর্যাপ্ত সার মজুত আছে, অন্যদিকে জ্বালানি রেশনিংয়ের অজুহাতে রাষ্ট্রায়ত্ত সার কারখানার উৎপাদন বন্ধ করা হচ্ছে। শাহজালাল সার কারখানার উৎপাদন বন্ধের সিদ্ধান্ত প্রমাণ করে—সরকার নিজেরাই জানে সামনে বড় ধরনের জ্বালানি ও সার সংকট অপেক্ষা করছে। তাহলে প্রশ্ন ওঠে—এই পূর্বাভাস থাকা সত্ত্বেও আগাম প্রস্তুতি কোথায় ছিল? নাকি ইচ্ছাকৃতভাবে পরিস্থিতিকে এই পর্যায়ে যেতে দেওয়া হয়েছে, যাতে সিন্ডিকেটগুলো মুনাফা লুটতে পারে?
বাংলাদেশের কৃষি ব্যবস্থার একটি বড় দুর্বলতা হলো আমদানি নির্ভরতা। সার উৎপাদনের জন্য গ্যাস দরকার, আর সেই গ্যাসও বহুলাংশে আমদানিনির্ভর। বছরের পর বছর এই নির্ভরতা কমানোর কথা বলা হলেও বাস্তবে কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। বিকল্প উৎস, নিজস্ব উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি, জ্বালানি নিরাপত্তা—সবই কাগুজে পরিকল্পনায় সীমাবদ্ধ থেকেছে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে—অতীতে কি কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি? বাস্তবতা হলো, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আমলে কৃষি খাতকে টেকসই করার জন্য কিছু দূরদর্শী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। কৃষিতে ভর্তুকি বৃদ্ধি, সার সরবরাহ ব্যবস্থার ডিজিটাল নজরদারি, সেচ ব্যবস্থায় বিদ্যুৎ ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ, এবং সার কারখানা আধুনিকায়নের পরিকল্পনা—এসবই ছিল দীর্ঘমেয়াদি খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অংশ। বিশেষ করে কৃষকদের জন্য প্রণোদনা প্যাকেজ ও সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা অনেক ক্ষেত্রে উৎপাদন বাড়াতে সহায়ক হয়েছিল।
কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় সেই ধারাবাহিকতা বজায় রাখা তো দূরের কথা, বরং নীতিগত শৈথিল্য ও সমন্বয়হীনতার কারণে পূর্বের অর্জনগুলোও ঝুঁকির মুখে পড়েছে। পরিকল্পনার অভাব, তদারকির দুর্বলতা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার ঘাটতি আজকের সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে।
ফলাফল এখন স্পষ্ট—একটি বৈশ্বিক সংকট সরাসরি দেশের কৃষি খাতে ধাক্কা দিচ্ছে, আর সরকার পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার পরিবর্তে আশ্বাসের বন্যা বইয়ে দিচ্ছে। অথচ কৃষকের জন্য আশ্বাস নয়, প্রয়োজন সময়মতো সার, সেচ ও ন্যায্যমূল্য।
সবচেয়ে বড় আশঙ্কার জায়গা হলো খাদ্য নিরাপত্তা। দেশের বোরো আবাদ প্রায় ৬০ শতাংশ ডিজেলচালিত সেচের ওপর নির্ভরশীল। এই সেচ যদি ব্যাহত হয়, উৎপাদন কমবে—এটাই স্বাভাবিক অর্থনীতি। আর উৎপাদন কমে গেলে তার সরাসরি প্রভাব পড়বে খাদ্যদ্রব্যের দামে, যা শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জীবনে নতুন করে চাপ তৈরি করবে।
এই পরিস্থিতিতে সরকারের দায়িত্ব ছিল তিনটি স্পষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া —
• প্রথমত, সার বাজারে কঠোর নজরদারি ও সিন্ডিকেট ভাঙা।
• দ্বিতীয়ত, কৃষি সেচে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজনে ভর্তুকি বাড়ানো।
• তৃতীয়ত, বিকল্প আমদানি উৎস ও অভ্যন্তরীণ উৎপাদন দ্রুত সক্রিয় করা।
কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, এসবের কোনোটিই কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। বরং সিদ্ধান্তহীনতা, প্রশাসনিক উদাসীনতা এবং সিন্ডিকেটকে অঘোষিত প্রশ্রয় দেওয়ার সংস্কৃতি পুরো পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
রাষ্ট্র পরিচালনায় সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা তখনই স্পষ্ট হয়, যখন সংকট আসার আগেই তা মোকাবিলার সক্ষমতা তৈরি করা যায় না। আজকের সার ও সেচ সংকট সেই অদূরদর্শিতা, অব্যবস্থাপনা এবং দায় এড়ানোর রাজনীতিরই সরাসরি ফল।
অতএব, এখনো সময় আছে বাস্তবতা স্বীকার করার। মাঠের কৃষকের কণ্ঠস্বরকে গুরুত্ব দেওয়ার। শুধু বিবৃতি নয়, দৃশ্যমান ও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার। নইলে এই সংকট কেবল কৃষকের ক্ষতিতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না—এটি রূপ নেবে একটি গভীর খাদ্য ও অর্থনৈতিক সংকটে, যার দায় কোনোভাবেই আর এড়ানো যাবে না।

