‘২৪ এর জুলাইয়ে রক্তের বন্যায় ভাসিয়ে যারা ক্ষমতা দখল করেছে, তাদের হাতে নির্বাচন হলে কী হবে তার নমুনা এখন চোখের সামনে দৃশ্যমান। প্রবাসীদের ভোটাধিকারের নামে যে তামাশা হচ্ছে, সেটা দেখে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে এই পুরো আয়োজনটাই কার জন্য।
সাত লাখ ছেষট্টি হাজার প্রবাসী নিবন্ধন করলেন। তাদের মধ্যে দুই লাখ একাশি হাজার মানুষ ব্যালটই পাননি। ছয় ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মাত্র এক লাখ ছেষট্টি হাজার ভোট এসে পৌঁছেছে দেশে। অথচ চার লাখ ছাপ্পান্ন হাজার মানুষ ভোট দিয়ে পোস্ট অফিসে জমা দিয়েছেন। মানে সাতষট্টি শতাংশ ভোট এখনো আকাশে-বাতাসে ঘুরছে, নির্বাচনের মাত্র ছয়দিন বাকি থাকতে।
ডিসেম্বরের সাত তারিখে যারা রেজিস্ট্রেশন করেছেন, তাদের ব্যালট জানুয়ারিতে ঢাকা এয়ারপোর্টে আটকে আছে। দুই মাস পেরিয়ে গেছে, ভোটের আগে মাত্র কয়েকদিন বাকি, কিন্তু ব্যালট এখনো হাতে পৌঁছায়নি। এটা কি শুধুই অদক্ষতা? নাকি ইচ্ছাকৃত?
মজার ব্যাপার হলো, বাহরাইনে জামায়াতের এক নেতার বাসা থেকে স্তূপ করে পোস্টাল ব্যালট পাওয়া গেল। নির্বাচন কমিশন বলল এটা নাকি স্বাভাবিক, একজনের কাছে অনেকের ব্যালট দেওয়া হয়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, জামায়াতের নেতার বাসায় কেন? যাদের সংগঠন দেশে নিষিদ্ধ ছিল, যারা যুদ্ধাপরাধী হিসেবে দণ্ডিত, তাদের হাতে এই ব্যালট তুলে দেওয়াটা কি কাকতালীয়?
ব্যালটের ডিজাইনেই ছিল কারচুপির আলামত। প্রথম লাইনে কোন দলগুলোকে রাখা হয়েছে, ভাঁজের জায়গায় কার প্রতীক পড়েছে, সেটা নিয়ে যখন প্রশ্ন উঠল, নির্বাচন কমিশন চুপ মেরে গেল। কোনো ব্যাখ্যা নেই, কোনো সংশোধন নেই।
মালয়েশিয়ায় চুরাশি হাজার মানুষ অনুমোদিত ভোটার। তাদের মধ্যে পঁয়তাল্লিশ হাজার ভোট দিয়েছেন। কিন্তু দেশে এসেছে মাত্র পনেরো হাজার। বাকি ত্রিশ হাজার ভোট কোথায়?
আরও মজা হলো, অনেকের ট্র্যাকিং সিস্টেমে দেখাচ্ছে ব্যালট ডেলিভার হয়েছে, কিন্তু তারা হাতে পাননি। পোস্ট অফিসে খোঁজ নিতে গেলে বলা হচ্ছে ব্যালট বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে কারণ ভোটারকে পাওয়া যায়নি। অথচ কাউকে ফোনও করা হয়নি। কার নির্দেশে এই ব্যালটগুলো ফেরত পাঠানো হলো? কারা ঠিক করল কাকে ভোট দিতে দেওয়া হবে আর কাকে না?
যুক্তরাজ্যে বত্রিশ হাজার মানুষ নিবন্ধিত। তাদের মধ্যে প্রায় বিশ হাজার ভোট দিয়েছেন। কিন্তু দেশে এসেছে মাত্র দেড় হাজার। মানে দশ ভাগের এক ভাগও না।
প্রবাসী ভোটার প্রকল্পের দলনেতা বলছেন চল্লিশ দিন সময় নিয়ে সব পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু উত্তর আমেরিকায় তুষারপাত, কোথাও পোস্টাল স্ট্রাইক, এসব কারণে নাকি ব্যালট পৌঁছায়নি। তাহলে প্রশ্ন হলো, এতো বড় একটা নির্বাচনের আয়োজন করতে গিয়ে এসব বিষয় আগে থেকে চিন্তা করা হয়নি কেন? নাকি আসলেই চিন্তা করার দরকার ছিল না, কারণ যা হওয়ার কথা তা তো ঠিকই হচ্ছে?
দেশের ভেতরেও যারা পোস্টাল ভোটের জন্য নিবন্ধিত হয়েছেন, তাদের পঞ্চান্ন শতাংশ ব্যালটই পাননি। সাত লাখ ষাট হাজার মানুষ নিবন্ধন করেছেন, কিন্তু ব্যালট হাতে পেয়েছেন মাত্র তিন লাখ বিয়াল্লিশ হাজার। বাকিদের ব্যালট গেল কোথায়?
নির্বাচন কমিশন বলছে পনেরো থেকে ত্রিশ দিনে ব্যালট আসা-যাওয়া শেষ হবে। কিন্তু যেসব দেশে বাংলাদেশের সরাসরি ফ্লাইট নেই, সেখান থেকে ভোট এখনো আসেনি। আর যেসব দেশে ফ্লাইট আছে, সেখান থেকেও ব্যালট হাজার হাজার সংখ্যায় আটকে আছে কোথাও না কোথাও।
এই যে শত শত কোটি টাকার আয়োজন, এই যে লক্ষ লক্ষ মানুষকে নিবন্ধন করিয়ে শেষ পর্যন্ত তাদের ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা, এটা কি শুধুই অব্যবস্থাপনা? নাকি এটাই ছিল পরিকল্পনা? যাদের ভোট দরকার তাদের ব্যালট ঠিকই পৌঁছেছে, আর যাদের ভোট অনাকাঙ্ক্ষিত তাদের ব্যালট হয় আসেইনি, নয়তো আটকে আছে কোথাও।
এই নির্বাচন আসলে কাদের জন্য সাজানো হয়েছে, সেটা এখন আর রহস্য নেই। যে সরকার নির্বাচিত জনগণের ভোটে ক্ষমতায় ছিল, তাকে রক্তের বন্যা বইয়ে সরিয়ে দিয়ে যারা বসেছে, তাদের হাতে কী আশা করা যায়? যে দল দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছে, যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে দাঁড়িয়েছে, তাদের জন্যই কি এই পুরো প্রবাসী ভোটের নাটক?
আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে নির্বাচন করার মানেই হলো দেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দলকে, যে দল টানা তিন মেয়াদে ক্ষমতায় ছিল, তাকে জোর করে সরিয়ে একটা একতরফা প্রতিযোগিতার আয়োজন করা। আর সেই প্রতিযোগিতায় যেন নির্দিষ্ট কিছু দল সুবিধা পায়, তার জন্য প্রবাসীদের ভোটের নামে এই পুরো খেলা।

