বাংলাদেশের নির্বাচন ঘিরে বরাবরই বিতর্ক, শঙ্কা ও অবিশ্বাসের আবহ বিরাজ করে। কিন্তু আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে ঘিরে যে পরিকল্পনার অভিযোগ উঠছে, তা শুধু প্রশাসনিক প্রভাব নয়—বরং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা কাঠামোকেই নির্বাচনী ফলাফল প্রভাবিত করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের এক ভয়ংকর রূপরেখা নির্দেশ করে।
অভিযোগ উঠেছে—সশস্ত্র বাহিনী, প্রশাসন ও পুলিশকে নানা নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা দায়িত্বে ব্যস্ত রেখে নির্বাচনের মাঠের “মূল খেলা” পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে আনসার ও ভিডিপি বাহিনীর ওপর। প্রায় সাড়ে ৫ লাখ সদস্য, যারা ভোটকেন্দ্র পাহারা ও ব্যালট বাক্স সুরক্ষার দায়িত্বে থাকবে—তাদের ভূমিকাই নাকি এই নির্বাচনের ফল নির্ধারণে কেন্দ্রীয় ফ্যাক্টর হিসেবে বিবেচিত।
বিতর্কিত নিয়োগ ও রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ : ৫ আগস্টের পর নিয়োগপ্রাপ্ত মহাপরিচালক আবদুল মোতালেব সাজ্জাদ মাহমুদের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ—প্রায় ৩৩০০ ছাত্র শিবির ও হিযবুত তাহরীর সংশ্লিষ্ট কর্মীকে আনসারে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বিপুল অর্থের বিনিময়ে আরও প্রায় ৩০০০ ব্যাটালিয়ন আনসার নিয়োগের কথাও বলা হচ্ছে।
এই নতুন নিয়োগপ্রাপ্তদেরই নির্বাচনী দায়িত্বে মোতায়েনের পরিকল্পনা—যা নির্বাচনের নিরপেক্ষতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করছে।
AVMIS সফটওয়্যার: মনিটরিং না নিয়ন্ত্রণ?
নির্বাচনের দিন আনসার সদস্যদের কার্যক্রম মনিটরিং করা হবে AVMIS সফটওয়্যারের মাধ্যমে—এটি আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা। কিন্তু অভিযোগ বলছে, এই সফটওয়্যার ব্যবহার করে কেন্দ্রভিত্তিক সরাসরি নির্দেশনা দেওয়া, এমনকি গোপন বার্তা পাঠিয়ে ভোটগ্রহণে বাধা সৃষ্টি বা জটিলতা তৈরির সুযোগ রাখা হয়েছে।
প্রায় ১ লাখ সাধারণ আনসার ও ৬৭ লাখ প্রশিক্ষিত ভিডিপি সদস্যের ডাটাবেইস থেকে ৫ লাখ ৫৭ হাজার সদস্যকে নির্বাচনী দায়িত্বের জন্য রেজিস্ট্রেশন করানো হয়েছে—এদের রাজনৈতিক আনুগত্য নিয়েও প্রশ্ন তোলা হচ্ছে।
‘কোড নেম’ নির্দেশনা ও ভোট প্রভাবের অভিযোগ
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ—নির্বাচনে নির্দিষ্ট প্রতীকে সিল মারার জন্য কোড নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, যার কথিত কোড নেম: “Breakfast, Move Fast.” এছাড়া আনসার-ভিডিপি সদস্যদের পরিবারের ভোট বাধ্যতামূলক করা, প্রত্যেককে অন্তত ৫টি ভোট নিশ্চিত করার নির্দেশ—এমন অভিযোগ নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করে।
অস্ত্র ক্রয়: নিরাপত্তা নাকি ভীতি?
গোপন টেন্ডারের মাধ্যমে তুরস্কের দুটি কোম্পানি থেকে ৩২,০০০ সেমি-অটোমেটিক শটগান (Hatsan Escort Magnum 20 GA) ক্রয়ের অভিযোগও উঠেছে। নির্বাচনী দায়িত্বে থাকা ব্যাটালিয়ন আনসারদের হাতে এই অস্ত্র দেওয়ার পরিকল্পনা—ভোটারদের নিরাপত্তা দেবে, নাকি ভীতির পরিবেশ তৈরি করবে—সেই প্রশ্ন এখন আলোচনায়।
নেতৃত্ব নিয়ে রাজনৈতিক প্রশ্ন
মহাপরিচালকের ছাত্রজীবনের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা, জামায়াত ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ, এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ডেপুটেশন আদেশের বাইরে তিন সেনা কর্মকর্তাকে নিয়োগ—এসব বিষয় প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, উচ্চপর্যায়ের নীতিনির্ধারণী মহলের নীরব সমর্থনও এতে জড়িত।
অতীত ঘটনা ও অভ্যন্তরীণ শুদ্ধি অভিযান
২০২৪ সালের ১২ আগস্ট দায়িত্ব নেওয়ার পর, ২৫ আগস্ট সচিবালয়ে আনসার সদস্যদের ওপর হামলার ঘটনার প্রেক্ষাপটে—একাংশ সদস্যকে রাজনৈতিক ট্যাগ দিয়ে চাকরিচ্যুত করার অভিযোগ রয়েছে। সমালোচকদের মতে, এটি ছিল বাহিনীর ভেতর রাজনৈতিক পুনর্গঠনের অংশ।
সার্বিক বিশ্লেষণ: নির্বাচন নাকি প্রজেক্ট?
সব অভিযোগ যদি সত্য প্রমাণিত হয়, তবে এটি কেবল প্রশাসনিক প্রভাব নয়—বরং নির্বাচনী অবকাঠামোকে পরিকল্পিতভাবে পুনর্গঠন করে ফলাফল প্রভাবিত করার এক সুসংগঠিত প্রকল্প।
ভোটকেন্দ্র পাহারা, ব্যালট নিরাপত্তা, মাঠপর্যায়ের নিয়ন্ত্রণ—সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তরগুলো যদি প্রশ্নবিদ্ধ আনুগত্যের হাতে ন্যস্ত হয়, তবে নির্বাচনের বৈধতা নিয়েই জনমনে গভীর সংশয় তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক।
গণতন্ত্রের শক্তি শুধু ভোটে নয়—ভোটের বিশ্বাসযোগ্যতায়। আর সেই বিশ্বাস যদি নিরাপত্তার পোশাকের আড়ালে প্রকৌশলীভাবে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়, তবে নির্বাচন থাকে—গণরায় হারিয়ে যায়।

