বাংলাদেশের রাজনীতি কি আজ আর অভ্যন্তরীণ কোনো বিষয়? নাকি এটি পরিণত হয়েছে আন্তর্জাতিক শক্তির কৌশলগত দাবার বোর্ডে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘুঁটিতে? সজীব ওয়াজেদ জয়ের সাম্প্রতিক বক্তব্য এই প্রশ্নকে আর এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ রাখে না। তাঁর বিশ্লেষণ সরাসরি ইঙ্গিত করে—বাংলাদেশ আজ কেবল একটি রাজনৈতিক সংকটে নয়, বরং একটি পরিকল্পিত ভূরাজনৈতিক প্রকল্পের মাঝখানে দাঁড়িয়ে।
কলকাতায় একটি বই প্রকাশনা অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে জয় যে চিত্র তুলে ধরেছেন, তা কোনো আবেগী বক্তৃতা নয়; এটি দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা বাস্তবতার একটি নির্মম পাঠ।
গণআন্দোলন থেকে সহিংসতা: পুরনো স্ক্রিপ্ট, নতুন মাঠ— কোটা সংস্কার আন্দোলন ছিল যৌক্তিক—এ নিয়ে দ্বিমত নেই। কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস বলে, প্রতিটি ন্যায্য আন্দোলনই দুর্বল রাষ্ট্রে রূপান্তরের জন্য সবচেয়ে কার্যকর প্রবেশদ্বার। শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, এমনকি আরব বসন্ত—সব ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, গণআন্দোলনের পেছনে ঢুকে পড়ে সশস্ত্র গোষ্ঠী ও বিদেশি স্বার্থ।
জয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, বাংলাদেশেও ঘটেছে ঠিক সেটাই। আন্দোলনের ভেতরে ঢুকে পড়ে ইসলামপন্থী ও জঙ্গি নেটওয়ার্ক। থানায় হামলা, অস্ত্র লুট, সহিংসতা—এসব কোনো ‘স্বতঃস্ফূর্ত জনরোষ’ নয়; এগুলো রাষ্ট্র ভাঙার পরীক্ষিত কৌশল।
অনির্বাচিত সরকার ও সন্ত্রাসীদের মুক্তি: কাকতালীয় নয়; গত দেড় বছরে একটি অনির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় থেকে যে প্রথম কাজটি করেছে, তা হলো দণ্ডপ্রাপ্ত জঙ্গিদের মুক্তি। হলি আর্টিজান হামলা, ব্লগার হত্যা, কূটনৈতিক হত্যাকাণ্ড—এই ইতিহাস কি এত দ্রুত ভুলে যাওয়ার মতো?
বিশ্ব রাজনীতিতে একটি সাধারণ নিয়ম আছে: যে সরকার সন্ত্রাসীদের মুক্তি দেয়, সে সরকার সন্ত্রাসীদের ওপরই দাঁড়িয়ে থাকে। এই সরকারও ব্যতিক্রম নয়। ‘মব জাস্টিস’-কে বৈধতা দেওয়া, বিচারকদের ভয় দেখানো, সংবাদমাধ্যম পুড়িয়ে দেওয়া—এসব কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এগুলো একটি ইসলামপন্থী শাসন কাঠামোর লক্ষণ।
নির্বাচন নয়, এটি একটি নিয়ন্ত্রিত নাটক; আওয়ামী লীগসহ সব প্রগতিশীল শক্তিকে কার্যত নিষিদ্ধ করে যে নির্বাচন আয়োজন করা হচ্ছে, সেটি নির্বাচন নয়—এটি একটি ম্যানেজড ট্রানজিশন। মাঠে রাখা হয়েছে মাত্র দুই শক্তি: বিএনপি ও জামায়াত।
এটি গণতন্ত্রের প্রতিযোগিতা নয়; এটি ঠিক করার প্রক্রিয়া—কে থাকবে সামনে, কে থাকবে নিয়ন্ত্রণে।
তারেক রহমান ও ওয়াশিংটনের হিসাব: জয়ের অভিযোগের সবচেয়ে বিস্ফোরক অংশটি এখানেই। তাঁর যুক্তি পরিষ্কার—তারেক রহমানের বিরুদ্ধে দুর্নীতির প্রমাণ যুক্তরাষ্ট্রের হাতে আছে বলেই তাকে অভিযুক্ত করা হচ্ছে না। কারণ অভিযুক্ত প্রধানমন্ত্রী নয়, নিয়ন্ত্রিত প্রধানমন্ত্রীই বেশি কার্যকর।
ইতিহাসে এর উদাহরণ নতুন নয়। লাতিন আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা—যেখানেই দুর্বল রাষ্ট্র তৈরি করা হয়েছে, সেখানেই এমন ‘হুকের ওপর ঝুলে থাকা’ নেতা বসানো হয়েছে। একটি ফোনকলেই যাকে মনে করিয়ে দেওয়া যায়—ক্ষমতা কার হাতে।
গণভোটের প্রশ্নে বিএনপির হঠাৎ ইউ-টার্ন এই বাস্তবতাকেই ইঙ্গিত করে। যে গণভোট সংবিধানবিরোধী, আদালত কর্তৃক অবৈধ ঘোষিত—সেই গণভোটে হঠাৎ ‘হ্যাঁ’ বলা কেবল রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি ভূরাজনৈতিক আনুগত্যের প্রকাশ।
পোস্টাল ব্যালট: অদৃশ্য কারচুপির প্রযুক্তি— পোস্টাল ভোট কেন? কারণ এটি সবচেয়ে নিরাপদ কারচুপির মাধ্যম। ক্যামেরা নেই, সাংবাদিক নেই, পর্যবেক্ষক নেই। সংখ্যা আসবে নির্বাচন কমিশন থেকে—আর বিশ্ব তা বিশ্বাস করবে। মধ্যপ্রাচ্যে দলবদ্ধভাবে ব্যালট পূরণের ভিডিও ছড়িয়ে পড়া কোনো গুজব নয়; এটি একটি সতর্ক সংকেত।
জামায়াতের লাভ, অঞ্চলের ক্ষতি: আওয়ামী লীগ অনুপস্থিত মানেই জামায়াতের রাজনৈতিক লাভ। তাদের ভোট ব্যাংক বাড়েনি, কিন্তু ক্ষমতার দরজা খুলে গেছে। শরিয়া রাষ্ট্রের স্বপ্ন, সংখ্যালঘু নির্যাতন, জঙ্গি পুনর্বাসন—সবই আবার বাস্তব সম্ভাবনা।
ভারতের জন্য এর অর্থ কী?: উত্তর-পূর্ব সীমান্তে অস্থিরতা, পাকিস্তানি প্রভাবের প্রত্যাবর্তন, আন্তর্জাতিক জঙ্গি নেটওয়ার্কের নিরাপদ আশ্রয়।
শেষ সুযোগের সতর্কতা: এই লেখা কোনো দলীয় প্রচার নয়; এটি একটি নিরাপত্তা সতর্কবার্তা। ইতিহাস বলে—বাংলাদেশ যখন স্থিতিশীল ছিল, তখনই দক্ষিণ এশিয়া নিরাপদ ছিল। আর সেই স্থিতিশীলতার সময়কাল ছিল একটাই।
আজ যদি এই নির্বাচনকে ‘স্বাভাবিক’ বলে মেনে নেওয়া হয়, তবে আগামী ৫–১০ বছর দক্ষিণ এশিয়া কাটাবে অনিশ্চয়তার আগুনে।
প্রশ্নটি তাই আর রাজনৈতিক নয়, এটি কৌশলগত— একটি দুর্বল, নিয়ন্ত্রিত ও উগ্রবাদ-আশ্রিত বাংলাদেশ কি দক্ষিণ এশিয়াকে নিরাপদ রাখতে পারে? উত্তরটা অস্বস্তিকর হলেও স্পষ্ট।

