২০২৪ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশের রাজপথে যা ঘটেছিল, তাকে কোনোভাবেই স্বতঃস্ফূর্ত ছাত্র আন্দোলন বলা যায় না। এটি ছিল একটি সুপরিকল্পিত রাষ্ট্রীয় অভ্যুত্থান, যার পেছনে কাজ করেছে আন্তর্জাতিক চক্র, মৌলবাদী জঙ্গি সংগঠন এবং দেশের ভেতরকার কিছু বিপথগামী শক্তি। নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে মুহাম্দ ইউনুস নামক একজন সুদখোর মহাজনকে ক্ষমতায় বসানোর এই নাটকটি কেবল সংবিধান লঙ্ঘন নয়, এটি বাংলাদেশ রাষ্ট্রের মূল ভিত্তিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করার একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ।
জুলাইয়ের দাঙ্গায় রাস্তায় নামা তরুণদের অধিকাংশই জানত না তারা কার হাতের পুতুল হয়ে নাচছে। তাদের সামনে রাখা হয়েছিল কোটা সংস্কারের মতো একটি আপাত ন্যায্য দাবি, কিন্তু পর্দার পেছনে চলছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন খেলা। এই খেলার নায়করা হলো জামায়াতে ইসলামী এবং বিএনপি, যারা গত পঞ্চাশ বছর ধরে বাংলাদেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক অর্জনকে নস্যাৎ করার চেষ্টা করে আসছে। জামায়াত, যে সংগঠন ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সাথে মিলে এ দেশের লাখো মানুষ হত্যা করেছে, নারী ধর্ষণ করেছে, বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করেছে, তারাই আজ সংস্কারের নামে ক্ষমতার অংশীদার। বিএনপি, যে দলটি জন্ম নিয়েছিল সেনানিবাসের বদ্ধ ঘরে, স্বৈরাচারী জিয়াউর রহমানের রক্তাক্ত হাতে, যাদের শাসনামলে দুর্নীতি আর সন্ত্রাস হয়ে উঠেছিল রাষ্ট্রীয় নীতি, তারাই এখন গণতন্ত্রের মুখোশ পরে বসে আছে।
জুলাইয়ের ঘটনাবলী যদি নিরপেক্ষভাবে বিশ্লেষণ করা যায়, তাহলে একটি বিষয় পরিষ্কার হয়ে যায়: এটি কোনো আকস্মিক বিস্ফোরণ ছিল না। প্রথমে কোটা সংস্কারের দাবি তোলা হলো, যা আপাতদৃষ্টিতে যুক্তিসঙ্গত মনে হতে পারে। কিন্তু যখন সরকার আলোচনায় বসতে চাইল, যখন আদালত এ নিয়ে রায় দিল, তখন হঠাৎ করেই সহিংসতা শুরু হলো। পুলিশ বক্স জ্বালানো, সরকারি সম্পদ ধ্বংস করা, নিরীহ মানুষ হত্যা করা, এসব কি কোনো শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের লক্ষণ? রাস্তায় যারা মলোটভ ছুঁড়ছিল, যারা পুলিশ সদস্যদের পিটিয়ে মারছিল, যারা পাবলিক প্রপার্টি জ্বালাচ্ছিল, তারা কি সত্যিই ছাত্র ছিল, নাকি প্রশিক্ষিত ক্যাডার?
মুহাম্মদ ইউনুস নামের এই ব্যক্তিটির কথা ধরা যাক। তিনি নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন বলে অনেকে তাকে একজন মহান মানুষ ভাবেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ইউনুস একজন সুদী মহাজন ছাড়া আর কিছু নন। গ্রামীণ ব্যাংকের নামে তিনি যা চালিয়েছেন, তা হলো দরিদ্র মানুষকে সুদের জালে আটকে ফেলার একটি সুপরিকল্পিত ব্যবসা। তথাকথিত ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচি বাংলাদেশের দরিদ্র নারীদের কীভাবে ঋণের চক্রে আটকে ফেলেছে, তা নিয়ে অসংখ্য গবেষণা রয়েছে। অনেক পরিবার এই ক্ষুদ্রঋণের জালে আটকে আজীবনের জন্য ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। ইউনুসের এই ব্যবসায়িক মডেল পশ্চিমা দেশগুলোর জন্য একটি আদর্শ উদাহরণ ছিল, কারণ এটি দেখিয়েছে যে দাতব্যের নামে কীভাবে মুনাফা করা যায়। তাই তাকে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়েছিল, কারণ তিনি পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে একটি মানবিক মুখোশ পরিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিলেন।
এই ইউনুসকেই আজ বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা বানানো হয়েছে, সংবিধানের কোনো ধার না ধরে। একটি গণতান্ত্রিক দেশে নির্বাচিত সরকারকে সরিয়ে একজন অনির্বাচিত ব্যক্তিকে ক্ষমতায় বসানো হলো। এটি কোনো সংস্কার নয়, এটি সামরিক অভ্যুত্থান। আর এই অভ্যুত্থানের পেছনে সামরিক বাহিনীর একাংশের সমর্থন ছিল, এটি এখন আর গোপন কিছু নয়। সেনাবাহিনী, যাদের কাজ দেশের সীমানা রক্ষা করা, তারা রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়লে যা হয়, তা বাংলাদেশ আগেও দেখেছে। জিয়াউর রহমান এবং হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সামরিক শাসনামলে দেশ কোথায় গিয়ে পৌঁছেছিল, তা আমরা ভুলে যাইনি।
জুলাইয়ের দাঙ্গার পেছনে বিদেশি অর্থায়ন এবং ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত অসংখ্য। এটি বিশ্বাস করা কঠিন যে হঠাৎ করে একসাথে সারাদেশে এত সংগঠিত সহিংসতা শুরু হতে পারে, কোনো পরিকল্পনা ছাড়া। যে সমস্ত অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে, যে পরিমাণ ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছে, তার পেছনে বিশাল অর্থের যোগান ছিল। এই অর্থ এসেছে কোথা থেকে? কোন শক্তি চায় বাংলাদেশ অস্থিতিশীল হোক? কোন দেশের স্বার্থে বাংলাদেশের একটি স্থিতিশীল, নির্বাচিত সরকারকে সরিয়ে দেওয়া প্রয়োজন ছিল? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজলে অনেক অস্বস্তিকর সত্য বেরিয়ে আসবে।
জামায়াতে ইসলামী এবং বিএনপি এই ষড়যন্ত্রের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী। জামায়াত, যারা ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ সৃষ্টির বিরোধিতা করেছিল, যারা পাকিস্তানের পক্ষে যুদ্ধ করেছিল, তারা এখন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অংশীদার। তারা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে বসে পাঠ্যপুস্তক থেকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস মুছে ফেলার চেষ্টা করছে। তারা সংস্কৃতিতে আঘাত করছে, বাঙালি পরিচয়কে দুর্বল করার চেষ্টা করছে। কারণ তারা জানে, একটি জাতিকে ধ্বংস করতে হলে প্রথমে তার ইতিহাস এবং সংস্কৃতিকে ধ্বংস করতে হয়। বিএনপি, যারা দুর্নীতিতে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছিল, যাদের শাসনামলে দেশ তলাবিহীন ঝুড়িতে পরিণত হয়েছিল, তারা আজ সংস্কারের কথা বলছে। এর চেয়ে বড় রসিকতা আর কী হতে পারে?
জুলাইয়ের পর থেকে বাংলাদেশে যা ঘটছে, তা একটি পরিকল্পিত রাষ্ট্র ধ্বংসের প্রক্রিয়া। প্রথমে আক্রমণ করা হয়েছে জাতীয় প্রতীকগুলোর ওপর। ক্রিকেট, যা বাংলাদেশের একটি বড় অহংকার, সেখানে হামলা করা হচ্ছে। শাকিব আল হাসান, যিনি দেশের সবচেয়ে সফল ক্রিকেটার, তাকে দেশদ্রোহী বলা হচ্ছে। কারণ? তিনি আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য ছিলেন। এই যুক্তিতে তো দেশের কোটি কোটি মানুষ, যারা আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়েছিল, তাদের সবাইকে দেশদ্রোহী বলা যায়। মিরপুরের শেরে বাংলা স্টেডিয়াম, যেখানে বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের অসংখ্য গৌরবময় মুহূর্ত তৈরি হয়েছে, সেই স্টেডিয়ামের নাম পরিবর্তন করার দাবি তোলা হচ্ছে। এসবের উদ্দেশ্য একটাই: জাতীয় আত্মবিশ্বাস এবং গর্বকে ধ্বংস করা।
শিক্ষা ব্যবস্থায় আক্রমণ করা হচ্ছে। ইতিহাস বইয়ে বঙ্গবন্ধুর নাম কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে, মুক্তিযুদ্ধের ভূমিকা খাটো করা হচ্ছে। কারণ তারা জানে, নতুন প্রজন্ম যদি তাদের ইতিহাস না জানে, তাহলে তাদের সহজেই বিভ্রান্ত করা যায়। সংস্কৃতিতে আক্রমণ করা হচ্ছে। বাংলা নববর্ষ পালন, পহেলা বৈশাখ, এসব উৎসবকে হিন্দুয়ানি বলে প্রচার করা হচ্ছে। মূর্তি ভাঙা হচ্ছে, স্মৃতিসৌধে হামলা করা হচ্ছে। এসবই একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ, যার লক্ষ্য বাংলাদেশকে একটি সাম্প্রদায়িক, অসহিষ্ণু, পশ্চাৎপদ রাষ্ট্রে পরিণত করা।
যে তরুণরা জুলাইয়ে রাস্তায় নেমেছিল, তাদের অনেকেই হয়তো সত্যিকারের সংস্কার চেয়েছিল। কিন্তু তাদের ব্যবহার করা হয়েছে। তাদের সামনে একটি স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল, কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। আজ যারা ক্ষমতায় বসেছে, তারা কোনো সংস্কার করছে না। তারা প্রতিহিংসা চরিতার্থ করছে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের গ্রেফতার করা হচ্ছে, নির্যাতন করা হচ্ছে, জেলে ঢোকানো হচ্ছে। আদালত ব্যবহার করা হচ্ছে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। যে সমস্ত সাংবাদিক বা বুদ্ধিজীবী এই অবৈধ সরকারের সমালোচনা করছেন, তাদের ওপর হামলা হচ্ছে। এটি কোনো গণতন্ত্র নয়, এটি ফ্যাসিবাদ।
বাংলাদেশ একটি রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন দেশ। ১৯৭১ সালে ত্রিশ লাখ শহীদের রক্ত এবং দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে এই দেশ স্বাধীন হয়েছে। সেই স্বাধীনতার মূল শত্রু ছিল পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী এবং তাদের এদেশীয় দোসর জামায়াত, রাজাকার, আলবদর, আল শামস বাহিনী। আজ সেই একই শক্তি আবার ক্ষমতায় ফিরে এসেছে। তারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে মুছে ফেলতে চায়, বাংলাদেশকে পাকিস্তানের মতো একটি ধর্মীয় মৌলবাদী রাষ্ট্রে পরিণত করতে চায়। পাকিস্তান ১৯৪৭ সালে ধর্মের নামে জন্ম নিয়েছিল, কিন্তু আজ সেই দেশে কী অবস্থা? সন্ত্রাস, মৌলবাদ, অর্থনৈতিক দুর্দশা, সামরিক শাসন। বাংলাদেশকেও কি সেদিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে?
জুলাইয়ের দাঙ্গার পর থেকে বাংলাদেশের অর্থনীতি ধ্বংস হচ্ছে। বিনিয়োগ বন্ধ হয়ে গেছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা দেশ থেকে পালাচ্ছে। গার্মেন্টস সেক্টর, যা দেশের অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি, সেখানে অর্ডার কমছে। কারণ বিশ্ব বাজারে বাংলাদেশ এখন একটি অস্থিতিশীল দেশ হিসেবে চিহ্নিত। পর্যটন শিল্প ধ্বংস হয়েছে। রিজার্ভ কমছে। টাকার মান পড়ে যাচ্ছে। দ্রব্যমূল্য বাড়ছে। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার খরচ বেড়ে গেছে। কিন্তু যারা ক্ষমতায় বসে আছে, তারা এসব নিয়ে মাথা ঘামায় না। তারা ব্যস্ত আছে রাজনৈতিক প্রতিশোধ নিতে এবং নিজেদের আখের গোছাতে।
বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন বেড়েছে। হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের মানুষেরা এখন ভয়ে আছে। তাদের বাড়িঘর, মন্দির, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা হচ্ছে। সংবিধানে সমান অধিকারের কথা লেখা থাকলেও, বাস্তবে তারা দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হয়ে পড়ছে। এটিও পরিকল্পিত। কারণ একটি ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র গঠন করতে হলে সংখ্যালঘুদের দমন করতে হয়।
এখন প্রশ্ন হলো, এই পরিস্থিতি থেকে বাংলাদেশ কীভাবে বেরিয়ে আসবে? উত্তর সহজ নয়। একবার একটি দেশের প্রতিষ্ঠানগুলো ভেঙে ফেলা হলে, তা পুনর্নির্মাণ করতে অনেক সময় লাগে। একবার মানুষের মধ্যে বিভাজন তৈরি হলে, তা দূর করা কঠিন। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ আগেও অনেক কঠিন সময় পার করেছে। তারা ১৯৭১ সালে যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছে। তারা ১৯৯০ সালে স্বৈরাচার এরশাদকে উৎখাত করেছে। তারা এবারও পারবে।
বর্তমানে যে অবৈধ সরকার ক্ষমতায় আছে, তারা জানে যে তাদের ভিত্তি দুর্বল। তাই তারা যত দ্রুত সম্ভব নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করছে। তারা প্রশাসনে, সেনাবাহিনীতে, বিচার বিভাগে তাদের লোক বসাচ্ছে। তারা নির্বাচন না দিয়ে যতদিন সম্ভব ক্ষমতায় থাকতে চায়। কারণ তারা জানে, যদি নির্বাচন হয়, তাহলে তাদের পরাজয় অবধারিত। সাধারণ মানুষ এই অবৈধ সরকারকে মেনে নেয়নি। তারা এখন চুপ থাকলেও, ভেতরে ভেতরে ক্ষোভ জমছে।
ইউনুস এবং তার সহযোগীরা, যারা নিজেদের সংস্কারক বলে দাবি করছেন, তারা আসলে দেশকে আরও পিছিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। তারা যে সমস্ত কমিশন গঠন করেছেন, তার অধিকাংশই অকার্যকর এবং সময়ক্ষেপণের কৌশল মাত্র। তাদের কোনো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেই, আছে কেবল ক্ষমতায় টিকে থাকার চেষ্টা। তারা জাতিসংঘ, পশ্চিমা দেশগুলোর সমর্থনের ওপর নির্ভর করছেন। কিন্তু আন্তর্জাতিক সমর্থন কখনো দীর্ঘস্থায়ী হয় না। এখন না হলেও, অতি শীঘ্রই তাদেরও মুখোমুখি হতে হবে বাস্তবতার।

