২০২৪ সালের জুলাই মাসে যে ঘটনাপ্রবাহ আমরা দেখলাম, তা শুধু একটি সরকার পরিবর্তনের গল্প নয়। এটি এমন একটি সময়ের সূচনা যেখানে নারীর অধিকার, শ্রমজীবী মানুষের ভবিষ্যৎ এবং দেশের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ সবকিছুই ঝুঁকির মুখে পড়েছে। নির্বাচিত সরকারকে ক্যু করে সরিয়ে দিয়ে যে শক্তিগুলো ক্ষমতায় এসেছে, তাদের এজেন্ডা স্পষ্ট হয়ে উঠছে প্রতিদিন। বিদেশি অর্থায়ন, সামরিক সমর্থন আর জঙ্গি সংগঠনের সহযোগিতায় গড়ে ওঠা এই অবৈধ ক্ষমতা কাঠামোর মূল লক্ষ্য হচ্ছে সমাজকে কয়েক দশক পেছনে নিয়ে যাওয়া।
জামায়াতে ইসলামী আর তাদের রাজনৈতিক মিত্রদের যে দৃষ্টিভঙ্গি, তা নারীকে মানুষ হিসেবে নয়, বরং একটি বস্তু হিসেবে দেখে। তাদের চোখে নারী শুধুমাত্র ঘরের চার দেয়ালে বন্দি থাকবে, সন্তান জন্ম দেবে আর পুরুষের সেবা করবে। শিক্ষা, চাকরি, স্বাধীনতা, নিজের মতামত প্রকাশের অধিকার, এসব তাদের কাছে অপ্রয়োজনীয় বিষয়। একটি মেয়ে আট কিংবা নয় বছর বয়সে বিয়ে হয়ে যাবে, সেই মেয়ের স্বপ্ন কী ছিল, সে কী হতে চেয়েছিল, সেসব প্রশ্নের কোনো মূল্য নেই তাদের কাছে।
এই চিন্তাধারার সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো এটি শ্রেণিবৈষম্যকে আরও গভীর করবে। যারা ধনী পরিবারের, যাদের বাবার সম্পদ আছে, তারা হয়তো কোনোমতে টিকে থাকবে। কিন্তু যে মেয়ে গার্মেন্টসে কাজ করে তার পরিবারের মুখে খাবার তুলে দেয়, যে মেয়ে পড়াশোনা করে নিজের আর পরিবারের ভবিষ্যৎ গড়তে চায়, যার বাবা নেই কিংবা প্রতিবন্ধী, তার কী হবে? তাকে হয় কোনো বয়স্ক পুরুষের চার নম্বর স্ত্রী হতে হবে, নয়তো সমাজের সবচেয়ে অবহেলিত অবস্থানে নিক্ষিপ্ত হতে হবে।
ইউনুস আর তার সহযোগীরা যে দেশ গড়তে চান, সেখানে নারীর হাতে টাকা থাকাটাই অপরাধ। একজন নারী নিজের আয়ে স্বাবলম্বী হবে, নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেবে, এটা তাদের সহ্য হয় না। তারা চান নারী সম্পূর্ণভাবে পুরুষের ওপর নির্ভরশীল থাকুক। কারণ নির্ভরশীল মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করা সহজ, তাদের মুখ বন্ধ রাখা সহজ।
এই পুরো পরিস্থিতির সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিক হলো কিছু নারী নিজেরাই এই ব্যবস্থাকে সমর্থন করছে। তারা যেন এক ধরনের মানসিক দাসত্ব থেকে বেরোতে পারছে না। ক্ষমতার ছোট্ট একটু স্বাদ পাওয়ার লোভে তারা নিজেদের লিঙ্গের মানুষদের অধিকার বিসর্জন দিতে রাজি। এই নারীরা হয়তো ভাবছেন তারা ব্যতিক্রম থাকবেন, তাদের ক্ষেত্রে নিয়ম ভিন্ন হবে। কিন্তু ইতিহাস বলে, স্বৈরাচারী ব্যবস্থায় কেউই নিরাপদ থাকে না। আজ যারা এই ব্যবস্থার পক্ষে কথা বলছেন, কাল তারাও একইভাবে শিকার হবেন।
জামায়াত আর বিএনপির রাজনীতি হচ্ছে বিভাজন আর ভয়ের রাজনীতি। তারা ইসলামকে একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে ক্ষমতা দখলের জন্য। প্রকৃত ইসলাম যে নারীকে সম্মান দেয়, শিক্ষার অধিকার দেয়, সম্পত্তির অধিকার দেয়, সেসব তারা মানে না। তারা শুধু সেই অংশগুলো তুলে ধরে যা তাদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য পূরণে কাজে লাগে।
দেশের গার্মেন্টস সেক্টরে লক্ষ লক্ষ নারী কাজ করে। তারা শুধু নিজেদের নয়, তাদের পরিবারেরও একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্য অনেক ক্ষেত্রে। এই নারীদের কর্মসংস্থান বন্ধ করে দেওয়া মানে কোটি কোটি মানুষকে দারিদ্র্যের মধ্যে ঠেলে দেওয়া। কিন্তু জামায়াতের কাছে এসব হিসাবের কোনো মূল্য নেই। তারা চায় নারীরা ঘরে বসে থাকুক, পুরুষের দয়ার ওপর নির্ভরশীল থাকুক।
সামরিক বাহিনীর যে অংশ এই অবৈধ ক্ষমতা দখলে সহায়তা করেছে, তারা আসলে দেশের ভবিষ্যৎকে বন্ধক রেখে দিয়েছে। একটি দেশ যখন তার অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে পেছনে ফেলে রাখে, সেই দেশ কখনো এগিয়ে যেতে পারে না। উন্নত প্রতিটি দেশের দিকে তাকালে দেখা যাবে সেখানে নারী-পুরুষ সমানভাবে দেশ গড়ার কাজে অংশ নিচ্ছে। কিন্তু আমাদের এখানে যারা ক্ষমতায় আছে, তারা আসলে উন্নয়ন চায় না, তারা চায় নিয়ন্ত্রণ।
বিদেশি অর্থায়নের কথা যখন আসে, তখন প্রশ্ন জাগে কারা এই অর্থ দিচ্ছে এবং কেন। কোনো দেশ বা সংস্থা বিনা স্বার্থে কাউকে সাহায্য করে না। তারা নিশ্চয়ই কিছু চায়। হয়তো তারা চায় আমাদের দেশ দুর্বল থাকুক, বিভক্ত থাকুক, যাতে তারা নিজেদের স্বার্থ হাসিল করতে পারে। আর জামায়াত-বিএনপি সেই বিদেশি স্বার্থের হাতিয়ার হিসেবে কাজ করছে।
এই পরিস্থিতি শুধু নারীদের জন্যই হুমকি নয়, পুরো দেশের জন্য হুমকি। যখন একটি সমাজ তার মেয়েদের শিক্ষিত হতে দেয় না, কাজ করতে দেয় না, নিজের মতামত প্রকাশ করতে দেয় না, তখন সেই সমাজ আসলে নিজেকেই দুর্বল করে। প্রতিটি মেয়ে যে স্কুলে যেতে পারছে না, সে একজন সম্ভাব্য ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, শিক্ষক বা উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ হারাচ্ছে। এই ক্ষতি পূরণ করা সম্ভব নয়।
যারা মনে করেন জামায়াত ক্ষমতায় এলে শুধু নারীদের সমস্যা হবে, তারা ভুল করছেন। স্বৈরাচারী শাসন সবার জন্যই খারাপ। আজ যারা মনে করছেন তারা নিরাপদ আছেন, কাল তারাও টার্গেট হতে পারেন। কারণ এই ধরনের ব্যবস্থায় ক্ষমতাসীনদের কোনো জবাবদিহিতা থাকে না।
এই মুহূর্তে দেশের যে অবস্থা, তাতে অনেকেই হতাশ হয়ে পড়ছেন। কেউ কেউ দেশ ছেড়ে যাওয়ার চিন্তা করছেন। এটা বোঝা যায়, কারণ মানুষ নিজের আর পরিবারের নিরাপত্তা চায়। কিন্তু এটাও সত্য যে সবার পক্ষে দেশ ছাড়া সম্ভব নয়, বেশিরভাগ মানুষকে এখানেই থেকে যেতে হবে। আর যারা থাকবেন, তাদের জীবন কেমন হবে সেটা নির্ভর করছে এখন কী ঘটছে তার ওপর।
জামায়াতের সমর্থক নারীদের দেখলে সত্যিই অবাক লাগে। তারা কীভাবে নিজেদের অধিকার হরণের পক্ষে কথা বলতে পারেন? হয়তো তারা মনে করেন ধর্মের নামে যা কিছু বলা হচ্ছে তা সঠিক। কিন্তু তারা ভুলে যাচ্ছেন যে ধর্মকে ব্যবহার করে শোষণ করা হয়েছে হাজার বছর ধরে। প্রকৃত ধর্ম কখনো মানুষকে অত্যাচার করতে শেখায় না, অধিকার কেড়ে নিতে শেখায় না।
এই পুরো পরিস্থিতি একটা বড় পরীক্ষা আমাদের সামনে হাজির করেছে। আমরা কি এমন একটা দেশ হতে চাই যেখানে অর্ধেক জনগোষ্ঠী শুধু ঘরের মধ্যে আটকে থাকবে? যেখানে একটা মেয়ে তার স্বপ্ন দেখতে পারবে না? যেখানে শ্রমজীবী মানুষদের কাজ করার অধিকার কেড়ে নেওয়া হবে? যদি এই প্রশ্নগুলোর উত্তর না হয়, তাহলে আমাদের ভাবতে হবে আমরা কোন পথে যাচ্ছি।

