মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের ভোট আদায়ের মরিয়া হয়ে জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিক যে বক্তব্য দিচ্ছেন, তা নিছক রাজনৈতিক কৌশল নয়—এটি ইতিহাস বিকৃতির সচেতন ও বিপজ্জনক প্রচেষ্টা।
১৯৭১ সালে তারা যুদ্ধ করেছিলেন এই বক্তব্য আংশিক সত্য হলেও উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে গোপন রাখা হচ্ছে সেই যুদ্ধের প্রকৃত অবস্থান। বাস্তবতা হলো, সেই যুদ্ধ ছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর পক্ষে, বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিপক্ষে। আজ সেই ইতিহাসকে আড়াল করে “মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ”-এর দাবি তোলা জাতির স্মৃতির সঙ্গে প্রতারণার শামিল।
মুক্তিযুদ্ধ কোনো ব্যাখ্যার বিষয় নয়, এটি নথিভুক্ত ও প্রমাণিত ইতিহাস। রাজাকার, আলবদর ও আলশামস বাহিনীর ভূমিকা দেশি-বিদেশি দলিল, বিচারিক প্রক্রিয়া ও ইতিহাসচর্চায় প্রতিষ্ঠিত সত্য। সেই সত্য অস্বীকার করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী সাজার চেষ্টা কেবল রাজনৈতিক ভণ্ডামিই নয়, শহীদদের আত্মত্যাগকে অবমাননার নামান্তর।
এই ইতিহাস বিকৃতির পেছনে উদ্দেশ্য স্পষ্ট রাজনৈতিক বৈধতা পুনরুদ্ধার এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের ভোটারদের বিভ্রান্ত করা। যখন আদর্শিক সংকট ঘনীভূত হয়, তখন ইতিহাস পুনর্লিখনের চেষ্টা শুরু হয়—এটি রাজনীতির পুরোনো কৌশল। কিন্তু শব্দ বদলে ইতিহাস বদলানো যায় না। যারা স্বাধীনতার বিরোধিতা করে অস্ত্র ধরেছিল, তারা যতই ভাষার কারুকাজ করুক, তাদের অবস্থান বদলে যায় না।
উদ্বেগের বিষয় হলো এ ধরনের বক্তব্য প্রকাশ্যে উচ্চারিত হচ্ছে সমাজে যাচাইয়ের সংস্কৃতি দুর্বল হওয়ার সুযোগে। ইতিহাসচর্চা যখন শিথিল হয়, তখন মিথ্যা সাহস পায়। সম্পাদকীয়ভাবে তাই স্পষ্ট করে বলা জরুরি মুক্তিযুদ্ধকে অস্পষ্ট করা মতের স্বাধীনতা নয়, এটি জাতির ভিত্তিকে নড়বড়ে করার চেষ্টা।
রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা গণতন্ত্রের অংশ হতে পারে, কিন্তু ইতিহাস নিয়ে প্রতারণা গ্রহণযোগ্য নয়। সত্য চাপা দিয়ে সাময়িক লাভ সম্ভব হলেও, দীর্ঘমেয়াদে এই রাজনীতি নিজেই নিজের ভারে ভেঙে পড়ে। মুক্তিযুদ্ধের প্রশ্নে কোনো আপস নেই ছিল না, ভবিষ্যতেও থাকবে না।

