তারেক রহমান মনোরেলের কথা বলছেন। বারবার বলছেন। জোর গলায় বলছেন। কিন্তু কেন বলছেন, সেটা নিয়ে তার নিজেরও হয়তো পরিষ্কার কোনো ধারণা নেই। একজন রাজনৈতিক নেতা যখন কোনো বিষয়ে অবস্থান নেন, তখন ধরে নেওয়া হয় তিনি সেই বিষয়ে ন্যূনতম পড়াশোনা করেছেন, বিশেষজ্ঞদের সাথে কথা বলেছেন, দেশের বাস্তবতা বুঝেছেন। কিন্তু তারেক রহমানের মনোরেল প্রস্তাব শুনলে মনে হয় না তিনি এর কোনোটাই করেছেন। মনে হয় কেউ একজন তার কানে ফিসফিসিয়ে বলেছে, আর তিনি সেটা মাইক হাতে পেয়ে চিৎকার করে বলা শুরু করেছেন।
ঢাকা শহরের জন্য মনোরেল কতটা অনুপযুক্ত, সেটা একটু খোঁজখবর নিলেই বোঝা যায়। মেট্রোরেল যেখানে প্রতি ট্রিপে হাজার হাজার মানুষ বহন করতে পারে, মনোরেলের ক্ষমতা তার তুলনায় অনেক কম। ঢাকার মতো শহর, যেখানে প্রতিদিন লাখ লাখ মানুষ যাতায়াত করে, সেখানে মনোরেল বসানোর অর্থ হলো সমস্যার সমাধানের ভান করে আসলে সমস্যাকে টিকিয়ে রাখা। মেট্রোরেলের গতি ঘণ্টায় ৮০ থেকে ১০০ কিলোমিটার, সেখানে মনোরেলের গতি অনেক কম। স্টেশন থেকে স্টেশন যেতে সময় লাগে বেশি। ঢাকার মানুষের কাছে প্রতিটি মিনিট মূল্যবান, কারণ তাদের জীবন চলে সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে।
মনোরেলের রক্ষণাবেক্ষণ জটিল, ব্রেকডাউন হলে পুরো লাইন বন্ধ হয়ে যায়। সুইচিং সিস্টেম এতটাই জটিল যে একবার সমস্যা হলে সেটা সমাধান করতে অনেক সময় লাগে। ঢাকার মতো শহরে, যেখানে মানুষ রোজগারের জন্য প্রতিদিন এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে যায়, সেখানে এমন একটা সিস্টেম বসানোর অর্থ হলো তাদের জীবনকে আরও কঠিন করে তোলা।
অনেকে বলেন মনোরেল সস্তা। হ্যাঁ, কাগজে কলমে তাই মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে ঢাকা শহরের জন্য মনোরেল কোনো সাশ্রয়ী সমাধান নয়। মেট্রোরেল তুলনামূলক ব্যয়বহুল হলেও এটি দীর্ঘমেয়াদে টেকসই, এর ক্যাপাসিটি বেশি, এবং ঢাকার ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপ সামলানোর মতো শক্তিশালী।
ঢাকা এখনো বাড়ছে। আগামীতে আরও বেশি মানুষ এই শহরে আসবে। তখন আরও লাইন লাগবে, আরও সংযোগ লাগবে। মেট্রোরেলের ক্ষেত্রে নতুন লাইন যোগ করা, ইন্টারচেঞ্জ স্টেশন তৈরি করা তুলনামূলক সহজ। কিন্তু মনোরেলের ক্ষেত্রে এক লাইন থেকে আরেক লাইনে সংযোগ তৈরি করা জটিল, স্কেলআপ করা প্রায় অসম্ভব। তার মানে আজ যদি মনোরেল তৈরি করা হয়, কাল থেকেই সেটা অকেজো হয়ে যাবে।
ঢাকার বাস্তবতা হলো অত্যধিক জনসংখ্যা, পিক আওয়ারে ভয়াবহ চাপ, দীর্ঘ করিডোরে হাজার হাজার যাত্রীর চলাচল। এই পরিস্থিতিতে মনোরেল হবে একটা খেলনা প্রজেক্ট। এটি তৈরি করতে টাকা খরচ হবে, কিন্তু কার্যকর ফল পাওয়া যাবে না। মানুষ আশা করবে দ্রুত যাতায়াত ব্যবস্থা, কিন্তু পাবে একটা ধীরগতির, সীমিত ক্ষমতার যানবাহন।
তারেক রহমান যদি সত্যিই দেশের উন্নয়ন চান, তাহলে তাকে আরও সৎ এবং পড়ুয়া হতে হবে। এখন আর সেই সময় নেই যখন মানুষকে যা খুশি তাই বুঝিয়ে নিয়ে যাওয়া যেত। মানুষ এখন তথ্য পায়, তুলনা করে, বোঝে। ইশরাক রহমানও যেন মনোরেল ছাড়া ভাত খাবেন না এমন ভাব নিয়ে আছেন। কিন্তু তারা কি জানেন ঢাকার মানুষ কী চায়? তারা কি জানেন একটা কার্যকর গণপরিবহন ব্যবস্থা মানে কী?
হাতের মোবাইলে এআই আছে, ইন্টারনেট আছে। একটু খোঁজখবর নিলেই এসব তথ্য পাওয়া যায়। কিন্তু দুঃখের বিষয়, তারা সেটুকু পরিশ্রমও করেন না। আসল উদ্দেশ্য যে মনোরেল বানানো নয়, সেটা বোঝা যায়। আসল উদ্দেশ্য হলো ক্ষমতায় গিয়ে বড় বড় প্রকল্প হাতে নেওয়া, আর সেই প্রকল্পের আড়ালে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করা।
২০২৪ সালের জুলাই মাসে দেশজুড়ে যে দাঙ্গা বাঁধানো হয়েছিল, যে অস্থিরতা সৃষ্টি করা হয়েছিল, সেটা নিছক কোনো গণআন্দোলন ছিল না। বিদেশি টাকা, ইসলামি জঙ্গি সংগঠনের সহায়তা আর সামরিক বাহিনীর সমর্থনে একটা নির্বাচিত সরকারকে ক্যু করে ফেলা হয়েছিল। এবং সেই অবৈধ ক্ষমতা দখলের পেছনে তারেক রহমান এবং তার দল বিএনপির ভূমিকা ছিল সুস্পষ্ট।
তারেক রহমান এখন মনোরেলের কথা বলছেন কারণ শেখ হাসিনা মেট্রোরেল, এক্সপ্রেসওয়ে, টানেল, পদ্মা সেতু তৈরি করেছেন। তাই মেট্রোরেলের বিরোধিতা করতেই হবে। এটাই তাদের একমাত্র রাজনৈতিক এজেন্ডা। শুধুমাত্র বিরোধিতার জন্য বিরোধিতা। কোনো যুক্তি নেই, কোনো পরিকল্পনা নেই, শুধু বিপরীত অবস্থান নেওয়া। এই কারণেই মনোরেলের মতো একটা সৌখিন, অনুপযুক্ত পদ্ধতিকে তারা মেট্রোরেলের বিকল্প বলে চালিয়ে দিতে চাইছেন।
একজন মানুষকে কতটা অজ্ঞ আর অদক্ষ হতে হয় যে তিনি দেশের প্রকৃত চাহিদা না বুঝে শুধুমাত্র রাজনৈতিক ফায়দা লোটার জন্য এমন সব প্রস্তাব নিয়ে আসেন? ইলেকশনের আগে তো কিছু একটা বলতেই হবে, তাই যা খুশি তাই বলে যাচ্ছেন এই ইন্টার ফেল গবেট। দেশের উন্নয়ন নিয়ে কোনো চিন্তা নেই, আছে শুধু ক্ষমতার লোভ।
তারেক রহমান এবং তার সহযোগীরা যদি সত্যিই দেশের মানুষের কল্যাণ চান, তাহলে তাদের উচিত বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা নিয়ে আসা। ঢাকার মানুষের প্রকৃত সমস্যা বুঝে, বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে, দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা করে পরিকল্পনা করা। কিন্তু তাদের কাছ থেকে সেটা আশা করা বৃথা, কারণ তাদের লক্ষ্য উন্নয়ন নয়, লক্ষ্য শুধুমাত্র ক্ষমতা দখল।
মনোরেল প্রস্তাব তাই শুধু একটা অদক্ষ রাজনৈতিক চালই নয়, এটা দেশের মানুষের সাথে প্রতারণাও বটে। যারা প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থাকেন, যাদের জীবন চলে সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে, তাদের কাছে এমন একটা অকার্যকর সমাধান দেওয়ার অর্থ হলো তাদের দুর্ভোগকে আরও দীর্ঘায়িত করা। আর এটাই হয়তো তারেক রহমান এবং তার দলের আসল উদ্দেশ্য, কারণ জনগণের দুর্ভোগই তাদের রাজনীতির খোরাক।

