গোলাম পরওয়ার সাহেব যখন ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে বলেন যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিজেই রাজাকার ইস্যু মীমাংসা করে গেছেন, তখন মনে হয় ইতিহাসের সাথে এমন নির্লজ্জ প্রতারণা আর কখনো দেখা যায়নি। একজন সেক্রেটারি জেনারেল যখন জাতীয় টেলিভিশনে দাঁড়িয়ে পাঁচটি বাক্য বলেন এবং পাঁচটিই যখন সুপরিকল্পিত মিথ্যা হয়, তখন বুঝতে হবে এটা নিছক অজ্ঞতা নয়, এটা সুচিন্তিত ইতিহাস বিকৃতির অপচেষ্টা।
ত্রিদেশীয় চুক্তির কথা বলে তিনি যে গল্পটা ফাঁদতে চেয়েছেন, সেটা আসলে ইতিহাসের কোথাও নেই। ১৯৭৩ সালের ২৮ আগস্ট যে চুক্তিটি ভারত, পাকিস্তান আর বাংলাদেশের মধ্যে হয়েছিল, সেটা ছিল তিন দেশে আটক যুদ্ধবন্দী আর বেসামরিক কর্মকর্তাদের প্রত্যাবাসন নিয়ে। সেখানে রাজাকারদের দায়মুক্তির কোনো প্রসঙ্গই ছিল না। পরওয়ার সাহেব হয়তো ভেবেছেন মানুষ এতটাই অজ্ঞ যে যেকোনো চুক্তির নাম বললেই তারা বিশ্বাস করে ফেলবে।
এই চুক্তির আওতায় এক লাখ একুশ হাজার ছয়শত পঁচানব্বই জন বাঙালি পাকিস্তান থেকে ফিরে এসেছিল। এক লাখ আট হাজার সাতশত চুয়াল্লিশ জন অবাঙালি বাংলাদেশ থেকে পাকিস্তানে গিয়েছিল। ভারত ছয় হাজার পাঁচশত পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দি ছেড়ে দিয়েছিল। কিন্তু কোথাও, কোনো লাইনে, কোনো প্যারাগ্রাফে রাজাকারদের ক্ষমা বা দায়মুক্তির কথা ছিল না। পরওয়ার সাহেব কি এই নথিটা আদৌ পড়েছেন, নাকি শুধু মানুষকে বোকা বানানোর জন্য একটা আন্তর্জাতিক চুক্তির নাম ভাঙিয়ে নিজেদের অপরাধীদের বাঁচানোর চেষ্টা করছেন?
আসলে তিনি হয়তো ১৯৭৩ সালের ৩০ নভেম্বরের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার সাথে এই ত্রিদেশীয় চুক্তিকে গুলিয়ে ফেলেছেন। কিন্তু সেই ক্ষমা ঘোষণাটাও ছিল অত্যন্ত সীমিত এবং শর্তসাপেক্ষ। যারা দালাল আইনে গ্রেফতার হয়েছিল, তাদের মধ্যে যারা হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগের মতো জঘন্য অপরাধে জড়িত ছিল না, শুধুমাত্র তাদেরকেই ক্ষমা করা হয়েছিল।
ক্ষমা ঘোষণার পঞ্চম ধারায় পরিষ্কার করে বলা ছিল কারা ক্ষমার যোগ্য নয়। যারা হত্যা করেছে, হত্যার চেষ্টা করেছে, ধর্ষণ করেছে, আগুন বা বিস্ফোরক দিয়ে ক্ষতি করেছে, বাড়িঘর জ্বালিয়েছে, জলযানের ক্ষতি করেছে কিংবা এসব কাজে উৎসাহ দিয়েছে, তারা কোনোভাবেই ক্ষমার যোগ্য ছিল না। এই ঘোষণার পরেও প্রায় এগারো হাজার যুদ্ধাপরাধী কারাগারে বন্দী ছিল। তাহলে পরওয়ার সাহেব কোন মুখে বলেন যে বঙ্গবন্ধু সব রাজাকারকে ছেড়ে দিয়েছিলেন?
আরও মজার ব্যাপার হলো, যারা অনুপস্থিত ছিল বা পালিয়ে ছিল, তাদের জন্য শর্ত ছিল তাদের আত্মসমর্পণ করতে হবে এবং আবেদন করতে হবে ক্ষমার জন্য। এবং তাদের বিরুদ্ধে যদি ওই সব গুরুতর অপরাধের অভিযোগ থাকে, তাহলে তারা ক্ষমা পাবে না। এতটুকু শর্তসাপেক্ষ ক্ষমাকে গোলাম পরওয়ার সাহেব সাধারণ দায়মুক্তি বলে চালিয়ে দিতে চাইছেন।
সবচেয়ে বড় মিথ্যাটা হলো দালাল আইন তুলে নেওয়ার প্রসঙ্গে। বঙ্গবন্ধু কখনোই দালাল আইন বাতিল করেননি। ১৯৭৫ সালের ৩১ডিসেম্বর রাতে জিয়াউর রহমানের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে রাষ্ট্রপতি সাদাত মোহাম্মদ সায়েমের অধ্যাদেশের মাধ্যমে পুরো দালাল আইন বাতিল করা হয়েছিল। এই অধ্যাদেশেই সকল যুদ্ধাপরাধীদের দায়মুক্তি ঘোষণা করা হয়। পরওয়ার সাহেব কি জিয়াউর রহমানের এই কাজের কৃতিত্ব বঙ্গবন্ধুকে দিতে চাইছেন?
যে মানুষটা তাঁর নিজের জীবন বাজি রেখে বাংলাদেশকে স্বাধীন করেছেন, যাঁর ডাকে লাখো মানুষ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, যিনি পাকিস্তানের কারাগারে ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়েও মাথা নত করেননি, সেই মানুষটাকে আজ দায়ী করা হচ্ছে যুদ্ধাপরাধীদের ছেড়ে দেওয়ার জন্য। এর চেয়ে বড় ইতিহাস বিকৃতি আর কী হতে পারে?
জামায়াতে ইসলামী এই দেশে একাত্তরে যা করেছিল, তার দায় থেকে বাঁচার জন্য এখন ইতিহাস নতুন করে লিখতে চাইছে। তারা চায় নতুন প্রজন্ম ভুলে যাক কারা এই দেশের মানুষ হত্যা করেছিল, কারা বুদ্ধিজীবীদের চোখ বেঁধে নিয়ে গিয়ে হত্যা করেছিল, কারা বাঙালি নারীদের ধর্ষণ করেছিল। তারা চায় মানুষ বিশ্বাস করুক যে বঙ্গবন্ধু নিজেই নাকি এসব অপরাধীদের মাফ করে দিয়েছিলেন।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে যা ঘটেছে, সেটা ছিল একটা সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র। বিদেশি অর্থ, ইসলামি জঙ্গি সংগঠনের সহায়তা আর সামরিক বাহিনীর একাংশের মদদে দেশজুড়ে দাঙ্গা বাঁধিয়ে একটা নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করা হয়েছে। মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে যে অবৈধ ব্যবস্থাটা এখন চলছে, সেটা আসলে জামায়াতের পুরোনো এজেন্ডা বাস্তবায়নের একটা সুযোগমাত্র।
এখন তারা শুধু ক্ষমতা দখলেই সন্তুষ্ট নয়, তারা চায় ইতিহাসও দখল করতে। তারা চায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে মুছে ফেলতে, যুদ্ধাপরাধীদের নায়ক বানাতে আর মুক্তিযোদ্ধাদের খলনায়ক বানাতে। গোলাম পরওয়ারের এই বক্তব্য সেই একই অপচেষ্টার অংশ।
কিন্তু সত্য এত সহজে মুছে যায় না। আর্কাইভে জমা নথিপত্র, আদালতের রায়, আন্তর্জাতিক দলিল, মুক্তিযোদ্ধাদের সাক্ষ্য, বধ্যভূমির নীরব সাক্ষ্য, এসবকিছু মিথ্যার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে আছে। যতই চেষ্টা করুক না কেন জামায়াত, তারা ইতিহাস বদলাতে পারবে না।
তবে আমাদেরকেও সচেতন থাকতে হবে। আমাদের তরুণ প্রজন্মকে সঠিক ইতিহাস জানাতে হবে। তাদের জানাতে হবে ত্রিদেশীয় চুক্তিতে আসলে কী ছিল আর কী ছিল না। তাদের জানাতে হবে বঙ্গবন্ধু আসলে কাদের ক্ষমা করেছিলেন আর কাদের করেননি। তাদের জানাতে হবে কে দালাল আইন বাতিল করেছিল। তাদের জানাতে হবে একাত্তরে কারা এদেশের মানুষের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরেছিল।
ইউনূস সাহেব যে সরকার চালাচ্ছেন, সেখানে জামায়াতের লোকজন গুরুত্বপূর্ণ পদে বসে আছে। তারা এখন দেশের প্রশাসন, শিক্ষা ব্যবস্থা, আইন শৃঙ্খলা বাহিনী, সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে। এবং তারা সেই নিয়ন্ত্রণ ব্যবহার করে তাদের নিজেদের ইতিহাস লিখতে চাইছে।
একজন মাইক্রোক্রেডিটের ব্যবসায়ী যিনি সুদের কারবার করে গরিব মানুষদের আরও গরিব করেছেন, তিনি আজ দেশ চালাচ্ছেন অবৈধভাবে। আর তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে আছে যুদ্ধাপরাধীদের দল। এর চেয়ে বড় পরিহাস আর কী হতে পারে একটা স্বাধীন দেশের জন্য? যে দেশ লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে স্বাধীন হয়েছিল, সেই দেশে আজ যুদ্ধাপরাধীদের রাজনৈতিক সংগঠন ক্ষমতার অংশীদার।
গোলাম পরওয়ার যখন এই মিথ্যাগুলো বলছেন, তখন তিনি শুধু শেখ মুজিবুর রহমানকেই অপমান করছেন না, তিনি অপমান করছেন সেই তিরিশ লাখ শহীদকে যারা এই দেশের জন্য প্রাণ দিয়েছিল। তিনি অপমান করছেন সেই লাখো মা-বোনকে যারা পাকিস্তানি হানাদার আর তাদের এদেশীয় দোসরদের হাতে নির্যাতিত হয়েছিল। তিনি অপমান করছেন সেই সব মুক্তিযোদ্ধাকে যারা জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেছিল।
ইতিহাসের সত্যটা হলো, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষমা করেননি। তিনি শুধু ছোটখাটো অপরাধে জড়িত কিছু মানুষকে মুক্তি দিয়েছিলেন যাতে দেশে জাতীয় পুনর্মিলন হতে পারে। কিন্তু যারা খুন, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগের মতো জঘন্য অপরাধ করেছিল, তাদের কখনোই ছাড় দেননি। বরং তাদের বিচারের ব্যবস্থা করেছিলেন। দালাল আইন বাতিল করে যুদ্ধাপরাধীদের মুক্তি দিয়েছিল জিয়াউর রহমান।
এই সত্যগুলো জানা থাকলেই জামায়াতের মিথ্যাচার ধরা পড়ে যায়। তাই তাদের ভয় শিক্ষিত, সচেতন মানুষকে। তাই তারা শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, ইতিহাসের বই বদলাতে চায়, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা মুছে ফেলতে চায়।
বাংলাদেশের মানুষ একবার ১৯৭১ সালে জামায়াত আর তাদের প্রভুদের পরাজিত করেছে। সেই পরাজয়ের গ্লানি তারা আজও ভুলতে পারেনি। তাই তারা এখন ক্ষমতার জোরে ইতিহাস বদলাতে চায়। কিন্তু ইতিহাস বদলানো যায় না, শুধু বিকৃত করার চেষ্টা করা যায়। আর সেই বিকৃতি দীর্ঘস্থায়ী হয় না।
এই দেশের মানুষের স্মৃতি থেকে একাত্তর মুছে যাবে না। মুছে যাবে না শহীদদের নাম, বধ্যভূমির ইতিহাস, নির্যাতিত নারীদের আর্তনাদ। আর মুছে যাবে না কারা এই অপরাধগুলো করেছিল। গোলাম পরওয়ার যতই মিথ্যা বলুন না কেন, সত্য তার জায়গায় থাকবে। কারণ সত্যের মৃত্যু নেই।

