বাংলাদেশের প্রকাশনা জগতের যে চরিত্র গত দেড় বছরে প্রকাশ পেয়েছে, তা দেখে বিস্মিত না হয়ে উপায় নেই। একদিকে সারাদিন ‘বয়কট ইন্ডিয়া’ স্লোগান, ভারতবিরোধী বিষোদগার, অন্যদিকে লুকিয়ে লুকিয়ে কোলকাতা বইমেলায় স্টল নেওয়ার জন্য আকুতি। এই যে দ্বৈত চরিত্র, এই যে মুখে এক কথা আর কাজে সম্পূর্ণ উল্টো আচরণ, এটাই বাংলাদেশের একটা বড় অংশের সংস্কৃতিকর্মীদের আসল পরিচয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কোলকাতা বইমেলার আয়োজক সংস্থা ‘পাবলিশার্স অ্যান্ড বুকসেলার্স গিল্ড’ এবার বাংলাদেশের প্রকাশকদের অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ করে দিয়েছে। অবাক হওয়ার কিছু নেই। যে দেশের প্রকাশকরা নিজেদের মেলায় ভারতীয় বই প্রবেশ করতে দেয় না, ভারতীয় প্রকাশকদের আমন্ত্রণ জানানোর কথা তো দূরের কথা, তাদের কাছ থেকে সৌজন্যতা আশা করা বোকামি। একতরফা ব্যবসা কোনোদিন টেকে না। একুশে বইমেলায় যদি কোলকাতার বই নিষিদ্ধ থাকে, তাহলে কোলকাতা বইমেলায় বাংলাদেশি প্রকাশকরা কী মুখ দেখিয়ে যাবে?
প্রতিবছর বাংলাদেশের প্রকাশকরা কোলকাতা গিয়ে কোটি কোটি টাকার বই বিক্রি করে আসতেন। সেই একই প্রকাশকরা নিজেদের দেশে একুশে বইমেলায় ভারতীয় বইয়ের ওপর চড়া শুল্ক বসিয়ে রাখেন, মেলায় ভারতীয় প্রকাশকদের অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ করে রাখেন। এটা তো সুস্পষ্ট ভণ্ডামি, দ্বিচারিতা। নিজে অন্যের বাড়িতে খেতে যাবেন, কিন্তু নিজের বাড়িতে ডাকবেন না, এমন অসভ্যতা আর কোথায় আছে?
কিছু তথাকথিত প্রগতিশীল লেখক বলেন, একুশে বইমেলা নাকি আমাদের আবেগের জায়গা, তাই সেখানে শুধু দেশীয় প্রকাশকদের বই থাকবে। কী হাস্যকর যুক্তি! একুশ তো ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি, বাংলা ভাষার জন্য আন্দোলন। তাহলে বাংলা ভাষার যে অভিন্ন ঐতিহ্য দুই বাংলা জুড়ে বিস্তৃত, সেই ঐতিহ্যকে সামনে রেখে দুই বাংলার প্রকাশকদের মিলনমেলা হতে পারত না? মুক্তিযুদ্ধে ভারত সহযোগিতা করেছিল, সেই ইতিহাস তো মুছে ফেলা যায় না। অথচ স্বাধীনতার পরে চিত্তরঞ্জন সাহা যে মেলা শুরু করেছিলেন, সেই মেলাকে এখন আবেগের নামে সংকীর্ণতার প্রতীক বানিয়ে ফেলা হয়েছে।
আসল কথাটা হলো, আহমদ ছফার মতো কিছু লেখকের পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্যের প্রতি ঈর্ষা থেকে এই বিদ্বেষ তৈরি হয়েছিল। বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীদের একটা অংশ কখনো মেনে নিতে পারেনি যে কোলকাতার সাহিত্য ও বুদ্ধিবৃত্তিক জগতে একটা উচ্চতা আছে। এই হীনম্মন্যতা থেকেই ভারতীয় বই নিষিদ্ধ করার নীতি এসেছে। কিন্তু একই সঙ্গে নির্লজ্জভাবে তারা কোলকাতায় গিয়ে বই বিক্রি করে আসতেন। এই দ্বিমুখী আচরণ কোনো সভ্য সমাজে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
এবার কোলকাতা বইমেলা কর্তৃপক্ষ জানিয়ে দিয়েছে, বাংলাদেশি প্রকাশকরা সরাসরি অংশগ্রহণ করতে না পারলেও বাংলাদেশি বই স্টলে থাকতে পারবে। মানে কী? বই কি এবার হুন্ডি হয়ে যাবে? ঢাকা না দিল্লি ঠিক করতে না পারা যে উগ্র জাতীয়তাবাদী জুলাই সন্ত্রাসীরা দেশ চালাচ্ছে, তারা কি বই চোরাচালান করতে দেবে? যেখানে তারা ভারতের সঙ্গে সব ধরনের সম্পর্ক ছিন্ন করার হুমকি দিচ্ছে, সেখানে কোলকাতায় বই পাঠানো মানে তো প্রকাশকদের জন্য আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হবে।
২০২৪ সালের জুলাই মাসে দেশ জুড়ে যে দাঙ্গা বাঁধানো হয়েছিল, তার পেছনে কারা ছিল তা এখন আর গোপন নেই। বিদেশি অর্থায়ন, ইসলামিক জঙ্গি সংগঠনের সহায়তা, আর সামরিক বাহিনীর একাংশের সমর্থন নিয়ে একটা নির্বাচিত সরকারকে ক্যু করে উৎখাত করা হয়েছে। এই ষড়যন্ত্রের মূল নায়ক মুহাম্মদ ইউনূস আর তার সহযোগী জামায়াত-শিবির। এরা এখন ক্ষমতায় বসে দেশটাকে মধ্যযুগে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করছে।
ইউনূস একজন সুদী মহাজন। মাইক্রোক্রেডিটের নামে গরিব মানুষের কাছ থেকে যে সুদ আদায় করেছেন তিনি, তা ব্যাংকের চেয়েও বেশি। নোবেল পুরস্কার পেয়ে তিনি নিজেকে একজন সাধু হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছেন, কিন্তু আসলে তিনি একজন ব্যবসায়ী যিনি দরিদ্রদের দুর্দশাকে পুঁজি করে নিজের সাম্রাজ্য গড়েছেন। এখন তিনি অবৈধভাবে ক্ষমতায় বসে আছেন। কোনো নির্বাচন নেই, কোনো গণতান্ত্রিক বৈধতা নেই। শুধু সামরিক বাহিনীর ছত্রছায়ায় চলছে তার শাসন।
আর তার পাশে আছে জামায়াত-শিবির। এই সংগঠনটি মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল, পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সঙ্গে হাত মিলিয়ে গণহত্যায় অংশ নিয়েছিল। যুদ্ধাপরাধীদের এই দল এখন ক্ষমতার অংশীদার। এরা দেশে ইসলামি শাসন প্রতিষ্ঠা করতে চায়। এদের কাছে বই মানে কোরআন শরিফ ছাড়া আর কিছু নয়। বাকি সব বই তাদের কাছে অর্থহীন, এমনকি বিপজ্জনক।
একুশে বইমেলা নিয়ে এখন যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে, তা এই কারণে। রমজান মাসে মেলা হওয়ায় ধর্মান্ধ মুসলমানরা বই কিনবে না বলে প্রকাশকরা আগে থেকেই হতাশ। গত বছরও মবের ভয়ে মেলা ফ্লপ হয়ে গিয়েছিল। মননশীল ও সৃজনশীল বইয়ের জন্য এখন আর কোনো জায়গা নেই। যারা ক্ষমতায় আছে, তারা বখতিয়ার খিলজির রুহানী সন্তান। বই পড়া বা বই লেখা তাদের কাছে কোনো মূল্যবান কাজ নয়। তারা চায় অন্ধ আনুগত্য, প্রশ্নহীন আত্মসমর্পণ।
এই যে কোলকাতা বইমেলার ঘটনা, এটা শুধু একটা বইমেলা থেকে বাদ পড়ার ঘটনা নয়। এটা আসলে আমাদের জাতীয় চরিত্রের একটা নগ্ন প্রকাশ। আমরা মুখে এক কথা বলি, কাজে করি উল্টো। আমরা ভারতবিরোধী বক্তব্য দিই, কিন্তু ভারতের সঙ্গে ব্যবসা করতে চাই। আমরা প্রগতিশীলতার কথা বলি, কিন্তু মৌলবাদীদের সঙ্গে আপস করি। আমরা স্বাধীনতার কথা বলি, কিন্তু ক্যু করে আসা অবৈধ সরকারকে মেনে নিই।
ইউনূস আর তার দোসররা যে অবৈধ ক্ষমতা দখল করেছে, তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার সাহস আমাদের বুদ্ধিজীবীদের নেই। বরং তারা নীরব থেকে এই অবৈধতাকে বৈধতা দিচ্ছেন। সংস্কৃতিকর্মীরা যারা এতদিন গণতন্ত্র, মুক্তচিন্তা, মানবাধিকারের কথা বলতেন, তারা এখন চুপচাপ। কারণ তারা জানেন, কথা বললে মব তাদের ছাড়বে না। জামায়াতের ক্যাডাররা তাদের টুঁটি চেপে ধরবে। এই ভয়েই তারা নীরব, আপসকামী।
কোলকাতা বইমেলার এই নিষেধাজ্ঞা আসলে আমাদের কাছে একটা আয়না ধরে দিয়েছে। আমরা দেখতে পাচ্ছি আমাদের আসল চেহারা। সেই চেহারা সুন্দর নয়, গর্ব করার মতো নয়। বরং লজ্জায় মাথা নত হয়ে যায়। যে দেশ একসময় মুক্তিযুদ্ধ করে স্বাধীনতা অর্জন করেছিল, যে দেশে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দের জন্ম, সেই দেশ আজ বইয়ের শত্রুদের হাতে বন্দি।
বাংলাদেশের প্রকাশকরা এখন যদি কোলকাতা বইমেলায় না যেতে পারেন, তাহলে তাতে দুঃখের কিছু নেই। বরং এটা একটা সুযোগ। সুযোগ নিজেদের প্রতি সৎ হওয়ার, নিজেদের ভণ্ডামি থেকে বেরিয়ে আসার। যদি তারা সত্যিই ভারতবিরোধী হন, তাহলে কোলকাতায় বই বিক্রি করার চেষ্টা করবেন না। আর যদি বই বিক্রি করতে চান, তাহলে নিজেদের মেলায় ভারতীয় প্রকাশকদের আমন্ত্রণ জানান। এই দুইয়ের মধ্যে একটা বেছে নিতে হবে। দুটো একসঙ্গে চলতে পারে না।
কিন্তু আমাদের প্রকাশকরা হয়তো এই সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন না। কারণ তারা জানেন, এখন যারা ক্ষমতায় আছে, তারা তাদের উপর চাপ দেবে। ইউনূস আর জামায়াত-শিবির চায় না বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে কোনো সাংস্কৃতিক সেতু থাকুক। তারা চায় সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নতা। কারণ বিচ্ছিন্নতার মধ্যেই তারা তাদের মৌলবাদী এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে পারবে। বই যদি দুই দেশের মানুষকে কাছে নিয়ে আসে, চিন্তা ও মননে ঐক্য তৈরি করে, তাহলে তাদের বিভাজনের রাজনীতি ব্যর্থ হয়ে যাবে।
এই ষড়যন্ত্র বুঝতে পারার মতো বুদ্ধি আমাদের বুদ্ধিজীবীদের আছে। কিন্তু সাহস নেই। তারা জানেন, ক্যু করে আসা এই সরকারের বিরুদ্ধে কথা বললে পরিণতি কী হতে পারে। তাই তারা চুপচাপ থাকেন, মাথা নিচু করে রাখেন। আর এই নীরবতাই অবৈধ ক্ষমতাকে বৈধতা দেয়।
বাংলাদেশে এখন যা চলছে, তা গণতন্ত্র নয়, স্বৈরতন্ত্র। একটা নির্বাচিত সরকারকে জোর করে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। ইউনূস একজন অনির্বাচিত শাসক যিনি ক্ষমতায় এসেছেন রাস্তার দাঙ্গা আর সামরিক চাপের মাধ্যমে। এটা কোনো বিপ্লব ছিল না, ছিল একটা সুপরিকল্পিত ক্যু। আর এই ক্যুর পেছনে ছিল বিদেশি শক্তির অর্থ, জঙ্গি সংগঠনের সহিংসতা, আর সামরিক বাহিনীর একাংশের ষড়যন্ত্র।
এখন দেশে যা চলছে, তা ভয়াবহ। মুক্তচিন্তা, মুক্তমত প্রকাশ, সৃজনশীলতা, সব কিছুই এখন বিপন্ন। বইমেলা হবে কিনা, তা নিয়ে সন্দেহ। হলেও সেখানে কী ধরনের বই থাকবে, তা নিয়ে আতঙ্ক। কারণ যারা ক্ষমতায় আছে, তারা শুধু একটা বই চেনে। বাকি সব বই তাদের কাছে অপ্রয়োজনীয়, এমনকি শত্রু।
বাংলাদেশের সংস্কৃতিকর্মীরা, লেখকরা, প্রকাশকরা এখন একটা ভীষণ কঠিन সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। তাদের সামনে দুটো পথ। হয় তারা এই অবৈধ ক্ষমতার কাছে মাথা নত করে আপস করবেন, নয়তো সাহস করে সত্য বলবেন। কিন্তু আপাতত মনে হচ্ছে তাদের বেশিরভাগই প্রথম পথটা বেছে নিয়েছেন। কারণ বেঁচে থাকা জরুরি, নিরাপত্তা জরুরি। নীতি আর আদর্শের দাম তো পেট ভরায় না।
কোলকাতা বইমেলার এই ঘটনা একটা সংকেত। সংকেত এই যে, অবৈধ ক্ষমতা দখল আর সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদের যে বিষ এখন বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়ছে, তার পরিণতি শুধু রাজনীতিতে নয়, সংস্কৃতিতেও দেখা যাচ্ছে। বই যদি দুই দেশের সীমানা পেরিয়ে মানুষের কাছে পৌঁছতে না পারে, তাহলে সেই সীমানা আরও শক্ত হয়ে যায়, আরও উঁচু হয়ে যায়। আর সেই সীমানার দুপাশে থাকা মানুষগুলো পরস্পর থেকে আরও দূরে সরে যায়। এটাই চায় ইউনূস আর জামায়াত। এটাই চায় যারা মৌলবাদী শাসন প্রতিষ্ঠা করতে চায়।
বাংলাদেশের বইপ্রেমী মানুষ, লেখক, প্রকাশক, সবাই এখন বুঝতে পারছেন যে তাদের স্বাধীনতা, তাদের সৃজনশীলতা এখন হুমকির মুখে। কিন্তু সেই হুমকির বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর শক্তি তাদের আছে কিনা, সেটাই এখন দেখার বিষয়। কোলকাতা বইমেলা হয়তো তাদের জন্য বন্ধ হয়ে গেছে, কিন্তু একুশে বইমেলা যদি ভয়, মব, আর সেন্সরশিপের জায়গায় পরিণত হয়, তাহলে বাংলা ভাষা আর বাংলা সাহিত্যের জন্য এটা হবে এক অপূরণীয় ক্ষতি।

