দেশের বিদ্যুৎ খাত এখন যে ভয়াবহ সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে আছে, তার পুরো দায়ভার বর্তমান অবৈধ সরকারের ওপর বর্তায়। ‘২৪ এর জুলাইয়ের দাঙ্গা পরবর্তী যে অরাজক পরিস্থিতিতে নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে ক্ষমতা দখল করা হয়েছে, তার জের ধরে এখন দেশের প্রতিটি খাত ভেঙে পড়ছে। বিদ্যুৎ খাত তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ।
প্রায় তিরিশটি ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এখন বন্ধ হওয়ার দ্বারপ্রান্তে। কারণ একটাই, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড তাদের বকেয়া বিল পরিশোধ করছে না। মাসের পর মাস ধরে পাওনা আটকে রেখে এখন উল্টো তাদের ওপর জরিমানা চাপানো হচ্ছে। বিইআরসি সালিশ প্রক্রিয়া চলমান রাখার নির্দেশ দিয়েছে, অথচ বিপিডিবি সেই নির্দেশও মানছে না। এমন স্বেচ্ছাচারিতা আগে কখনো দেখা যায়নি।
যে সময়টায় দেশে বিদ্যুতের চাহিদা সবচেয়ে বেশি থাকে, ঠিক সেই রমজান আর সেচ মৌসুমের দোরগোড়ায় এসে এই সংকট তৈরি হয়েছে। বছরের এই সময়ে স্বাভাবিকের চেয়ে পাঁচ থেকে ছয় হাজার মেগাওয়াট বেশি বিদ্যুৎ লাগে। আবহাওয়াবিদরা আগেই বলে দিয়েছেন এবারের গ্রীষ্ম হবে রেকর্ড ভাঙা গরম। সেই গরমে যদি বিদ্যুৎ না থাকে, তাহলে সাধারণ মানুষের কী অবস্থা হবে, তা সহজেই অনুমেয়।
বিপিডিবির কর্মকর্তারা নিজেরাই স্বীকার করছেন যে আগামী গ্রীষ্মে বিদ্যুতের চাহিদা আঠারো হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত যেতে পারে। তাদের লক্ষ্য সতেরো হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন। কিন্তু বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো যদি বকেয়া না পেয়ে উৎপাদন কমিয়ে দেয় বা বন্ধ করে দেয়, তাহলে সেই লক্ষ্যও অধরা থেকে যাবে। ফলাফল হবে ব্যাপক লোডশেডিং, কৃষিতে বিপর্যয়, শিল্প-কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়া আর সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ।
এই সংকটের পেছনে রয়েছে চরম অব্যবস্থাপনা আর দায়িত্বজ্ঞানহীনতা। বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ছয় মাসেরও বেশি সময়ের বিল বকেয়া পড়ে আছে। এই টাকা না পেলে তারা জ্বালানি আমদানি করবে কীভাবে? ব্যাংকের ঋণের সুদ দেবে কীভাবে? চুক্তি অনুযায়ী তাদের পাওনা পরিশোধ না করে উল্টো তাদের ওপর দোষ চাপানো হচ্ছে।
আরও লজ্জাজনক বিষয় হলো দেশি আর বিদেশি বিদ্যুৎ উৎপাদকদের সাথে সম্পূর্ণ ভিন্ন আচরণ করা হচ্ছে। একই ধরনের চুক্তি, একই ধরনের পরিস্থিতি, অথচ বিদেশি কোম্পানিগুলোর ক্ষেত্রে জরিমানার বিধান প্রয়োগ করা হচ্ছে না। দেশি উদ্যোক্তারা যারা নিজেদের টাকা খাটিয়ে দেশের বিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগ করেছেন, তাদের সাথে করা হচ্ছে বৈষম্য। এটা কোন নীতি, কোন বিচার?
বরিশাল ইলেকট্রিক পাওয়ার কোম্পানির ঘটনা এই দ্বৈতনীতির প্রকৃষ্ট উদাহরণ। প্রথমে তাদের থেকে জরিমানা কেটে নেওয়া হলো। পরে ভিন্ন আইনি মতামত এলে সেই টাকা ফেরত দেওয়া হলো। কিন্তু একই ধরনের চুক্তির আওতায় থাকা অন্যান্য কেন্দ্রগুলোর ক্ষেত্রে জরিমানা বহাল রাখা হয়েছে। এমন স্ববিরোধী সিদ্ধান্ত আইনের চোখে অগ্রহণযোগ্য।
বেসরকারি বিদ্যুৎ খাতে প্রায় দশ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ হয়েছে। ষাটটিরও বেশি বিদ্যুৎকেন্দ্র নয় হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতা নিয়ে দেশের বিদ্যুৎ নিরাপত্তায় অবদান রাখছে। এই বিশাল বিনিয়োগকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। যে উদ্যোক্তারা নিজেদের সর্বস্ব দিয়ে দেশের সেবা করছেন, তাদের সাথে এমন আচরণ করলে ভবিষ্যতে কে আর এদেশে বিনিয়োগ করতে আসবে?
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান বলছেন জরিমানা কর্তনে দেশি-বিদেশি বলে কিছু নেই। কিন্তু মাঠের বাস্তবতা সম্পূর্ণ উল্টো। বিদেশি বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলোকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ তীব্র হচ্ছে। এই বৈষম্য যদি চলতে থাকে, তাহলে দেশি উদ্যোক্তারা ভেঙে পড়বেন। আর তাতে ক্ষতি হবে দেশেরই।
যে সরকার বৈধতা নিয়েই প্রশ্নবিদ্ধ, তারা এখন দেশের জীবনরেখা বিদ্যুৎ খাতকেও ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, বকেয়া না পেলে তারা উৎপাদন চালাতে পারবে না। গ্যাস সংকট থাকায় গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রও বাড়তি চালানো যাবে না। তাহলে বিদ্যুৎ আসবে কোথা থেকে?
সাধারণ মানুষ এখন দুই দিক থেকে চাপে আছে। একদিকে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে গেছে আকাশছোঁয়া। অন্যদিকে মৌলিক সেবা পাওয়াও অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে। আগামী গ্রীষ্মে রেকর্ড ভাঙা গরমে যদি ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং হতে থাকে, তাহলে মানুষ কী করবে? কৃষকরা যদি সেচের পানি না পায়, তাহলে ফসল কীভাবে হবে? কারখানাগুলো যদি উৎপাদন কমিয়ে দিতে বাধ্য হয়, তাহলে অর্থনীতি কীভাবে চলবে?
ইউনুসের নেতৃত্বাধীন এই অসংবিধানিক সরকার দেশের সংকট সমাধানে সম্পূর্ণ ব্যর্থ। তারা ক্ষমতায় এসেছে অস্ত্রের জোরে, জনগণের ভোটে নয়। তাই জনগণের দুর্ভোগের প্রতি তাদের কোনো দায়বদ্ধতাও নেই। বিদ্যুৎ খাতের এই সংকট তারই প্রমাণ। চুক্তি ভাঙা হচ্ছে, নিয়ম লঙ্ঘন করা হচ্ছে, বৈষম্য করা হচ্ছে, অথচ কোনো জবাবদিহিতা নেই।
এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ খুবই সহজ। বকেয়া পরিশোধ করতে হবে, চুক্তির শর্ত মানতে হবে, আর সবার সাথে সমান আচরণ করতে হবে। কিন্তু যে সরকার নিজেই অবৈধভাবে ক্ষমতায় আছে, তাদের কাছে বৈধতা আর ন্যায়বিচার আশা করা বৃথা। ফলে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে অন্ধকারের দিকে। আক্ষরিক অর্থেই অন্ধকার, কারণ বিদ্যুৎ থাকবে না।
আগামী কয়েক মাসে যদি বিদ্যুৎ সংকট তীব্র আকার ধারণ করে, তার পুরো দায় এই অবৈধ সরকারের। যে সরকার দেশের মানুষের ভোট চায়নি, তারা মানুষের সেবাও করবে না, এটাই স্বাভাবিক। জুলাইয়ের দাঙ্গা দিয়ে যে অরাজকতার সূচনা হয়েছিল, বিদ্যুৎ সংকট তারই ধারাবাহিকতা। দেশবাসী এখন ভুগবে তাদের অদূরদর্শিতা আর অযোগ্যতার মাশুল দিয়ে।

