বাংলাদেশ–মিয়ানমার সীমান্ত পরিস্থিতি এখন আর কেবল একটি মানবিক বা কূটনৈতিক ইস্যু নয় এটি সরাসরি আঞ্চলিক নিরাপত্তার লাল সংকেত। মিয়ানমার সরকারের সাম্প্রতিক অভিযোগ, বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে তাদের সেনাবাহিনীর ওপর ড্রোন হামলা চালানো হচ্ছে, পরিস্থিতিকে এক নতুন ও বিপজ্জনক মাত্রায় নিয়ে গেছে। এই অভিযোগে মিয়ানমারের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন আরসা (ARSA)-র নাম উঠে আসা এবং কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পকে এর সঙ্গে সম্পৃক্ত করার চেষ্টা সব মিলিয়ে বাংলাদেশকে একটি সম্ভাব্য যুদ্ধঝুঁকির মুখে দাঁড় করিয়েছে।
এই অভিযোগ যদি আংশিকভাবেও সত্য হয়, তবে তা বাংলাদেশের জন্য কেবল কূটনৈতিক অস্বস্তি নয় এটি সরাসরি জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন। আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে কোনো রাষ্ট্রের ভূখণ্ড যদি প্রতিবেশী দেশের বিরুদ্ধে সশস্ত্র হামলার জন্য ব্যবহৃত হয়, তাহলে সেই রাষ্ট্র নিজেই পরোক্ষভাবে সংঘাতের অংশ হয়ে পড়ে। এটি এমন এক বাস্তবতা, যা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
ড্রোন ব্যবহারের অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও ভয়ংকর করে তুলেছে। আধুনিক যুদ্ধের ক্ষেত্রে ড্রোন মানে সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণা নয়, বরং ছায়াযুদ্ধের সূচনা যেখানে রাষ্ট্রের বদলে প্রক্সি শক্তি ব্যবহার করে সামরিক ও রাজনৈতিক বার্তা দেওয়া হয়। মিয়ানমারের ভাষ্য অনুযায়ী তুরস্কে নির্মিত কামিকাজে ড্রোনের প্রসঙ্গ এই সংকটকে আন্তর্জাতিক মাত্রাও দিচ্ছে, যেখানে অস্ত্রের উৎস, সীমান্ত নজরদারির ব্যর্থতা এবং গোয়েন্দা সক্ষমতা সবকিছুই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক হলো মিয়ানমার সেনাবাহিনীর প্রকাশ্য হুঁশিয়ারি। সীমান্ত অতিক্রম হলে বাংলাদেশে হামলার সম্ভাবনার কথা বলা মানে তারা সামরিক পদক্ষেপের নৈতিক ও কৌশলগত বৈধতা তৈরির পথে হাঁটছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এটি “প্রি-এম্পটিভ স্ট্রাইক”-এর যুক্তি দাঁড় করানোর প্রস্তুতি, যা যেকোনো মুহূর্তে বাস্তব সংঘাতে রূপ নিতে পারে।
বাংলাদেশের ঝুঁকি এখানে দ্বিমুখী। একদিকে, যদি বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী সত্যিই রোহিঙ্গা ক্যাম্প বা সীমান্ত অঞ্চলকে ব্যবহার করে থাকে, তবে বাংলাদেশ কার্যত একটি ছায়াযুদ্ধের মঞ্চে পরিণত হচ্ছে। অন্যদিকে, মিয়ানমারের সম্ভাব্য সামরিক প্রতিক্রিয়া সীমান্তেই সীমাবদ্ধ থাকবে এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। ইতিহাস বলে, সীমান্ত উত্তেজনা খুব দ্রুতই বিস্তৃত সংঘাতে রূপ নিতে পারে।
আরও উদ্বেগজনক হলো মিয়ানমারের অভিযোগ বাংলাদেশ থেকে নাকি বিচ্ছিন্নতাবাদীদের খাবারসহ বিভিন্ন লজিস্টিক সহায়তা যাচ্ছে। রাষ্ট্রীয়ভাবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করা হলেও, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এই বক্তব্যের প্রচার বাংলাদেশের কূটনৈতিক অবস্থান দুর্বল করে দিতে পারে। অনেক সময় প্রমাণের চেয়েও অভিযোগের ধারাবাহিকতা ও প্রচার বেশি ক্ষতিকর হয়ে ওঠে।
এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো বাংলাদেশ কি পরিস্থিতির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আছে? সীমান্ত নজরদারি, ড্রোন শনাক্তকরণ সক্ষমতা, ক্যাম্পভিত্তিক গোয়েন্দা তৎপরতা এবং নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর সমন্বয়—সবকিছুই এখন জরুরি ভিত্তিতে পুনর্মূল্যায়নের দাবি রাখে। মানবিক সংকটে সংবেদনশীলতা জরুরি, কিন্তু নিরাপত্তার প্রশ্নে কোনো শৈথিল্য আত্মঘাতী হতে পারে।
বাংলাদেশ কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর নিরাপদ আশ্রয়স্থল হতে পারে না, আবার কোনো প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সামরিক হুমকিকেও হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। এই সংকট অবহেলা করার সময় শেষ। কারণ যুদ্ধ সাধারণত হঠাৎ শুরু হয় না যুদ্ধ আসে অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগ এবং নীরব সামরিক প্রস্তুতির মধ্য দিয়ে।
আজ যদি দৃশ্যমান, কঠোর ও বিশ্বাসযোগ্য রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তবে আগামীকাল হয়তো সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগই থাকবে না। সীমান্তে যা ঘটছে, তা কেবল সীমান্তের বিষয় নয় এটি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যতের পরীক্ষা।

