দীর্ঘ লড়াই আর ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশের ইতিহাসের পাতাগুলো কি তবে বদলে যেতে শুরু করেছে? ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে দেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক আবহে এমন এক পরিবর্তনের সুর বাজছে, যা মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের মানুষের মনে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জামায়াতে ইসলামীকে রাজনৈতিকভাবে তোষণ এবং একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিতদের পুনর্বাসন করছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, ২০২৪ সালের পটপরিবর্তনের পর থেকেই সুকৌশলে যুদ্ধাপরাধীদের মুক্তি এবং জাতীয় রাজনীতিতে তাদের সক্রিয় করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। গত বছর মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত জামায়াত নেতা এটিএম আজহারুল ইসলামের কারামুক্তির পর এবার সেই তালিকায় যুক্ত হতে যাচ্ছেন আরেক দণ্ডিত আসামি আবুল কালাম আজাদ, যিনি দীর্ঘদিন পলাতক থাকার পর সম্প্রতি ট্রাইব্যুনালে আত্মসমর্পণ করেছেন।
উল্লেখ্য, ২০১৩ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আবুল কালাম আজাদের অনুপস্থিতিতেই তাকে তিনটি অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড এবং চারটি অভিযোগে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করেন। দীর্ঘ এক যুগ পর তার এই হঠাৎ আত্মসমর্পণ এবং তাকে কেন্দ্র করে সরকারের শিথিল অবস্থান নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
অন্যদিকে, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত এটিএম আজহারুল ইসলামকে কারাগার থেকে মুক্তি দেওয়ার পর তিনি আসন্ন নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানা গেছে। এটিএম আজহারের বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালে রংপুরে ১ হাজার ২০০ মানুষকে হত্যা, কারমাইকেল কলেজের অধ্যাপকদের অপহরণ ও হত্যা এবং রংপুর টাউন হলে ‘ধর্ষণ ক্যাম্প’ পরিচালনার মতো ভয়াবহ অপরাধের প্রমাণ মিলেছিল। আদালত তাকে তিনটি অভিযোগে মৃত্যুদণ্ডসহ ২৫ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করেছিলেন।
বর্তমানে দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের পর থেকেই সারা দেশে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিস্তম্ভ ভাঙচুর এবং বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অবমাননার ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। অভিযোগ উঠেছে যে, একাত্তরের বিরোধী শক্তি জামায়াত-শিবির এখন পরিকল্পিতভাবে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও স্মৃতিচিহ্ন নিশ্চিহ্ন করতে তৎপর হয়ে উঠেছে। আর এই ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের পেছনে অন্তর্বর্তী সরকারের নিশ্চুপ সমর্থন রয়েছে বলে মনে করছেন বিশিষ্টজনরা। দেশের বিভিন্ন স্থানে মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর হামলা ও স্থাপনা ধ্বংসের ঘটনাগুলো জাতীয় সংহতির জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ‘জুলাই অভ্যুত্থান’ পরবর্তী সময়ে ক্ষমতাসীন মহল থেকে ইতিহাস পুনর্লিখনের যে চেষ্টা চালানো হচ্ছে, তা মূলত মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে বিপন্ন করার একটি নীল নকশা। বিশেষ করে যুদ্ধাপরাধীদের পুনর্বাসন এবং জামায়াতকে রাজনৈতিক সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে দেশকে নতুন এক সংকটের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। মানবাধিকার কর্মী ও সচেতন নাগরিক সমাজের আশঙ্কা, বর্তমান সরকারের এই বিতর্কিত পদক্ষেপগুলো দেশের দীর্ঘদিনের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও জাতীয় সমৃদ্ধিকে স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।

