চট্টগ্রামের জঙ্গল সলিমপুরে সন্ত্রাসীদের গুলিতে র্যাব কর্মকর্তা নিহতের ঘটনা এবং জামালপুরে র্যাব সদস্যের স্ত্রীকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনা দেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতিকে উসকে দিয়েছে। ৫ই আগস্ট পরবর্তী সময়ে চলমান এই অরাজক পরিস্থিতি এবং প্রশাসনের পক্ষপাতদুষ্ট আচরণের মুখে ১২ ফেব্রুয়ারি ঘোষিত জাতীয় নির্বাচনের সুষ্ঠুতা নিয়ে জনমনে গভীর সংশয় তৈরি হয়েছে।
সোমবার (১৯ জানুয়ারি) বিকেলে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরের ছিন্নমূল এলাকায় সন্ত্রাসীদের সাথে সংঘর্ষে র্যাবের ডিএডি পদমর্যাদার কর্মকর্তা মোতালেব নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আরও বেশ কয়েকজন র্যাব সদস্য আহত হয়েছেন এবং অন্তত ৩ জন সদস্য দুর্বৃত্তদের হাতে জিম্মি রয়েছেন বলে জানা গেছে। চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) সিরাজুল ইসলাম ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। সরকারি বাহিনীর ওপর এমন সশস্ত্র হামলা রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাঠামোর ভঙ্গুর অবস্থাকেই প্রকাশ করছে।
আইনশৃঙ্খলার এই অবনতি কেবল মাঠ পর্যায়ে নয়, পৌঁছে গেছে খোদ বাহিনীর সদস্যদের অন্দরমহলেও। এর আগে জামালপুরের সরিষাবাড়ীতে র্যাব-২ এ কর্মরত মহর উদ্দিনের স্ত্রী লিপি খাতুনকে নিজ ঘরে ঢুকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। দেশের নিরাপত্তায় নিয়োজিত একজন সদস্যের পরিবার যখন নিজ ঘরে নিরাপদ নয়, তখন সাধারণ নাগরিকের নিরাপত্তা আজ খাদের কিনারায়।
বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে যে গণবিস্ফোরণের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করা হয়েছিল, তার পরবর্তী ফল হিসেবে দেশ আজ এক দীর্ঘস্থায়ী বিশৃঙ্খলার কবলে। প্রতিদিনের হত্যা, চুরি, ডাকাতি ও অপহরণের ঘটনা প্রমাণ করছে যে, সেই সময়কার আন্দোলন ও ক্ষমতা পরিবর্তনের নেপথ্যে থাকা শক্তিগুলো একটি স্থিতিশীল রাষ্ট্র গঠনে ব্যর্থ হয়েছে। সাধারণ মানুষকে উসকানি দিয়ে রাস্তায় নামানোর মাধ্যমে যে ক্ষমতা দখল হয়েছিল, তার চূড়ান্ত পরিণতি কি এই নৈরাজ্য—এমন প্রশ্ন হয়তো এখন অনেক সাধারণ মানুষের মনে।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। রাজনৈতিক ঐকমত্য ছাড়াই ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা এবং প্রশাসনের ওপর নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বলয়ের প্রভাব সরকারকে বির্তকিত করেছে।
নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে উদ্বেগের প্রধান কারণগুলো হলো:
গণহারে মনোনয়ন বাতিল: দেশজুড়ে প্রায় এক-চতুর্থাংশ মনোনয়ন তুচ্ছ কারণে বাতিল করা হয়েছে, যা বিরোধী শক্তিকে মাঠ থেকে সরিয়ে দেওয়ার কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে।
পক্ষপাতিত্ব: নির্দিষ্ট কিছু প্রার্থীর ক্ষেত্রে নিয়ম শিথিলের অভিযোগ প্রশাসনের ‘নিরপেক্ষ’ চরিত্রকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
নিরাপত্তাহীনতা: যেখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারাই নিরাপদ নন, সেখানে সাধারণ ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে একটি উৎসবমুখর নির্বাচন অনুষ্ঠান অসম্ভব বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
মানবাধিকার সংস্থা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানের এই ত্রুটিপূর্ণ ও নিরাপত্তাহীন পরিবেশে নির্বাচন আয়োজন গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের বদলে রাজনৈতিক সংকটকে আরও ঘনীভূত করবে। এমন পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের অংশগ্রহণ কেবল একটি প্রশ্নবিদ্ধ প্রক্রিয়াকে বৈধতা দেওয়ার শামিল হবে।
দেশের এই অস্থিতিশীল পরিবেশে র্যাব কর্মকর্তাদের ওপর হামলা এবং প্রশাসনের পক্ষপাতমূলক আচরণ প্রমাণ করছে যে, বর্তমান কাঠামোর অধীনে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজন প্রায় অসম্ভব।

