বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাত এক সময় উন্নয়নের প্রতীক হিসেবে পরিচিত ছিল। শেখ হাসিনার সরকারের আমলে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি, জাতীয় গ্রিডের সম্প্রসারণ, শতভাগ বিদ্যুতায়নের ঘোষণা এবং শিল্পকারখানায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ এসব ছিল বাস্তব ও দৃশ্যমান অর্জন। লোডশেডিং ছিল নিয়ন্ত্রিত, শিল্প উৎপাদন ছিল সচল এবং অর্থনীতির চাকা ঘুরছিল স্বাভাবিক গতিতে। বিদ্যুৎ খাত নিয়ে তখন বিতর্ক থাকলেও তা কখনোই জাতীয় অর্থনীতির জন্য হুমকিতে পরিণত হয়নি।
কিন্তু রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিদ্যুৎ খাত দ্রুতই সংকটের অন্ধকারে প্রবেশ করে। ইউনুস সরকারের আমলে অব্যবস্থাপনা, নীতিগত অদূরদর্শিতা ও জবাবদিহির অভাবে এই খাত এখন ভয়াবহ আর্থিক বিপর্যয়ের মুখে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো শীত মৌসুমে, যখন বিদ্যুতের চাহিদা কম থাকার কথা, তখনও দেশজুড়ে লোডশেডিং। এটি কোনো সাময়িক সমস্যা নয় এটি ব্যর্থ শাসনের স্পষ্ট প্রতিফলন।
সরকারি হিসাবই এই ব্যর্থতার বড় প্রমাণ। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) ২০২৪-২৫ অর্থবছরে নিট লোকসান দাঁড়িয়েছে ১৭ হাজার ২১ কোটি টাকা, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ৯৪ শতাংশ বেশি। এত বড় লোকসান কোনো বৈশ্বিক পরিস্থিতির ফল নয় এটি মূলত ভুল পরিকল্পনা ও দুর্বল সিদ্ধান্তের পরিণতি।
সরকার বিদ্যুৎ খাত সংস্কারের কথা বললেও বাস্তবে তার প্রতিফলন নেই। সরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো বসিয়ে রেখে ব্যয়বহুল বেসরকারি আইপিপি থেকে বিদ্যুৎ কেনার প্রবণতা আরও বেড়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে শুধু আইপিপি থেকে বিদ্যুৎ কিনতেই ব্যয় হয়েছে ৭২ হাজার ৭১ কোটি টাকা। ফলে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৪ টাকা ৪৫ পয়সা যা সাধারণ মানুষের জন্য সরাসরি বোঝা।
বিদ্যুৎ খাতে লোকসান ঢাকতে সরকার দিয়েছে বিপুল ভর্তুকি। এক অর্থবছরেই এই ভর্তুকির পরিমাণ ৩৮ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে কিছু হিসাবে যা প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা। প্রশ্ন হলো, জনগণের করের টাকা কি অনির্দিষ্টকাল ধরে এই ব্যর্থতা ঢাকতেই ব্যয় হবে?
অথচ আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের দাম বর্তমানে নিম্নমুখী। তারপরও বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় কমছে না। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সঞ্চালন ও বিতরণ খাতে ১০ শতাংশের বেশি সিস্টেম লস, যা অপচয়, চুরি ও দুর্বল ব্যবস্থাপনার ইঙ্গিত দেয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদ্যুৎ খাতের মূল সমস্যা কাঠামোগত। বিপিডিবির একক মনোপলি, ক্যাপাসিটি চার্জের বোঝা এবং অপ্রয়োজনীয় চুক্তি পুনর্মূল্যায়ন ছাড়া এই খাতকে টেকসই করা সম্ভব নয়। কিন্তু সরকার এখনো সেই কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন মানে শুধু মেগাওয়াট বাড়ানো নয় এটি রাজনৈতিক সদিচ্ছা, দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহির প্রশ্ন। সেই জবাবদিহি না থাকলে বিদ্যুৎ খাত উন্নয়নের আড়ালে আর্থিক বিপর্যয় আরও গভীর হবে আর তার মূল্য গুনতে হবে সাধারণ মানুষকেই।

