বিএনপির সরকার ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল এই সময়কালকে কেউ কেউ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বাংলাদেশের “স্বর্ণযুগ” হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করছেন। কিন্তু ইতিহাস ও পরিসংখ্যান বলছে ভিন্ন কথা। এই পাঁচ বছর ছিল দুর্নীতি, জঙ্গিবাদ, রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা এবং গণতন্ত্র ধ্বংসের এক ভয়াবহ অধ্যায়।
এই সময়েই বাংলাদেশ টানা পাঁচবার বিশ্বে দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন হয়। এটি কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য নয়; বরং ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (TIB)–এর প্রকাশিত রিপোর্ট। বিস্ময়ের বিষয় হলো, সে সময় বিএনপির ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত গণমাধ্যম প্রথম আলো নিজেই এই প্রতিবেদন গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করেছিল। ‘হাওয়া ভবন’ পরিণত হয় রাষ্ট্রের অঘোষিত ক্ষমতাকেন্দ্রে—যেখানে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান নয়, বরং পরিবারকেন্দ্রিক প্রভাব ও দুর্নীতিই রাষ্ট্র পরিচালনার নিয়ামক হয়ে ওঠে।
বিদ্যুৎ খাতে চরম অব্যবস্থাপনা ছিল সাধারণ বাস্তবতা। পাঁচ বছরে মাত্র ১০৮ মেগাওয়াটের একটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করা হয়। মোট উৎপাদন ক্ষমতা ছিল প্রায় ৪২০০ মেগাওয়াট, যার ফলে দেশজুড়ে ৮–১০ ঘণ্টা লোডশেডিং নিত্যদিনের ঘটনা ছিল। উন্নয়নের বদলে ‘খাম্বা’ দুর্নীতি তখন রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার প্রতীকে পরিণত হয়।
এই সরকারেই যুদ্ধাপরাধী নিজামী ও মুজাহিদ পূর্ণ মন্ত্রীর মর্যাদা পায়। এর মাধ্যমে রাষ্ট্রীয়ভাবে মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে প্রশ্রয় দেওয়া হয়, যার সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষত বাংলাদেশ আজও বহন করছে।
২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে বিরোধী রাজনৈতিক নেতৃত্ব নিশ্চিহ্ন করার সবচেয়ে নৃশংস রাষ্ট্রীয় ষড়যন্ত্র। শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে চালানো এই হামলায় ২৪ জন নিহত এবং ৫০০-এর বেশি মানুষ আহত হন। প্রকৃত অপরাধীদের আড়াল করতে দেশবাসী দেখেছে কুখ্যাত “জজ মিয়া নাটক”, যা বিচার ব্যবস্থাকে উপহাসে পরিণত করেছিল।
রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটে এই সময়েই। বাংলা ভাইয়ের মতো জঙ্গিরা প্রকাশ্যে তৎপরতা চালায়, আর ২০০৫ সালে ৬৩ জেলায় একযোগে ৫০০ স্থানে বোমা বিস্ফোরণ ঘটে। এর ফলে বাংলাদেশ বিশ্বদরবারে পরিচিত হয় একটি জঙ্গি রাষ্ট্র হিসেবে—যা দেশের ভাবমূর্তিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
চট্টগ্রামে ধরা পড়ে দশ ট্রাক অবৈধ অস্ত্রের চালান, যা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার ভয়াবহ দুর্বলতা ও রাজনৈতিক প্রভাবের স্পষ্ট প্রমাণ দেয়।
সামাজিক ও অর্থনৈতিক সূচকেও চিত্র ছিল হতাশাজনক। দারিদ্র্যের হার- প্রায় ৪২ শতাংশ; মাথাপিছু আয়- মাত্র ৫৯৯ মার্কিন ডলার।
সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন পৌঁছে যায় চরমে। ১৪ বছরের কিশোরী পূর্ণিমা শিলের গ্যাং রেপের ঘটনা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বাংলাদেশকে চরমভাবে লজ্জিত করে এবং সংখ্যালঘু নিরাপত্তার করুণ বাস্তবতা তুলে ধরে।
এসব ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন অভিযোগ নয়, কোনো রাজনৈতিক মতামতও নয়—সবই নথিভুক্ত, প্রমাণিত এবং ইতিহাসের অংশ। তাই এই সময়কে “স্বর্ণযুগ” হিসেবে আখ্যা দেওয়া মানে ইতিহাসের সঙ্গে প্রতারণা করা।
এর বিপরীতে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ও সামাজিক সূচকে দৃশ্যমান অগ্রগতি অর্জন করে।
মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি পেয়ে ২৮২৪ মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়। দারিদ্র্যের হার ৪১ শতাংশ থেকে কমে ১৮ শতাংশে নেমে আসে। অতিদরিদ্রের হার ২৫.৬ শতাংশ থেকে ৫.৬ শতাংশে নামিয়ে আনা সম্ভব হয়।
এই পরিসংখ্যানই প্রমাণ করে—উন্নয়ন ও রাষ্ট্রনায়কত্ব অর্জিত হয় কার্যকর নেতৃত্ব, জবাবদিহি ও জনগণের জীবনমান উন্নয়নের মাধ্যমে, ইতিহাস বিকৃতি বা ব্যর্থতার অধ্যায় ঢেকে নয়।
২০০১–২০০৬ সময়কালকে “স্বর্ণযুগ” বানানোর চেষ্টা কেবল একটি রাজনৈতিক অপপ্রচার যার উদ্দেশ্য ইতিহাস মুছে ফেলা, সত্য আড়াল করা এবং জনগণের স্মৃতিকে বিভ্রান্ত করা।

