২০২৪ সালের জুলাইয়ে যা হয়েছে সেটা নিয়ে এখন যত সাফাই গাওয়া হোক, মূল ঘটনা হলো একটা সাজানো গোছানো ক্যু। নির্বাচিত সরকারকে সরাতে রাস্তায় নামানো হয়েছিল হাজার হাজার তরুণকে, তাদের অনেককেই খুন করা হয়েছে পরিকল্পিতভাবে, আর তারপর সেই রক্তকে পুঁজি করে ক্ষমতায় বসানো হয়েছে মুহাম্মদ ইউনুসকে। এই লোক যার পুরো ক্যারিয়ার গড়া গরিব মানুষের কাছে চড়া সুদে ঋণ দিয়ে। নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন দারিদ্র্য বিমোচনের নামে, কিন্তু বাস্তবে তার গ্রামীণ ব্যাংক দরিদ্র নারীদের ঋণের ফাঁদে আটকে রেখে মোটা মুনাফা কামিয়েছে। এখন এই ব্যক্তি বসে আছেন মুখ্য উপদেষ্টার চেয়ারে, আর তার মন্ত্রিসভায় জায়গা পেয়েছে জামায়াতে ইসলামী আর তাদের ভাবাদর্শিক মিত্ররা।
ফেব্রুয়ারিতে যে গণভোট হতে যাচ্ছে, সেটা গণতন্ত্রের চরমতম অবমাননা। হ্যাঁ বা না, এর বাইরে কোনো অপশন নেই। কিন্তু প্রশ্নটা কী সেটাই তো আসল কথা। আর সেই প্রশ্নের উত্তর যাই হোক, ফলাফল একটাই হবে। জামায়াতের রাজনৈতিক পুনর্বাসন আর তাদের মৌলবাদী এজেন্ডা বাস্তবায়নের সবুজ সংকেত। এটা নতুন কিছু নয়। ১৯৮৫ সালে এরশাদ যে গণভোট করেছিল, সেখানেও এই একই খেলা হয়েছিল। সব সরকারি অফিস, পুলিশ, প্রশাসন লাগিয়ে দিয়ে হ্যাঁ ভোট আদায় করা হয়েছিল। ফলাফল দেখানো হয়েছিল ৯৪ শতাংশ হ্যাঁ। কিন্তু সেই বৈধতা এরশাদকে বাঁচাতে পারেনি, জনগণ তাকে লাথি মেরে চেয়ার থেকে ফেলে দিয়েছে।
এবারের গণভোট আরো ভয়াবহ, কারণ এখানে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি ব্যবহার করা হচ্ছে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকেও। মসজিদের ইমামরা জুমার খুতবায় হ্যাঁ ভোটের পক্ষে বয়ান দিচ্ছেন। মাদ্রাসার শিক্ষকরা ছাত্রদের বলছেন এটা ইসলামের জন্য জরুরি। ব্যাংক ম্যানেজাররা ঋণগ্রহীতাদের ডেকে বুঝাচ্ছেন হ্যাঁ ভোট না দিলে পরবর্তী কিস্তিতে সমস্যা হতে পারে। স্কুলের শিক্ষকরা বাচ্চাদের হাতে লিফলেট ধরিয়ে দিচ্ছেন বাবা-মাকে দেওয়ার জন্য। সরকারি কর্মচারীদের বলা হচ্ছে তাদের এলাকায় হ্যাঁ ভোটের পক্ষে ক্যানভাসিং করতে, নইলে বদলি হবে অথবা আরো খারাপ কিছু।
এটা যে সম্পূর্ণ অবৈধ সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু যারা এই কাজ করছেন তাদের কাছে বৈধতার কোনো মূল্য নেই। তারা জানেন যে তারা একটা ভিত্তিহীন, অগণতান্ত্রিক সরকারের সেবা করছেন। কিন্তু তারা এটা করছেন হয় ভয়ে, নয়তো লোভে, নয়তো আদর্শিক কারণে। যারা জামায়াতের ভাবাদর্শে বিশ্বাসী, তারা তো মনেপ্রাণে চাইছেন এই গণভোট সফল হোক। কারণ তারা জানেন এটা তাদের বড় প্রকল্পের একটা ধাপ মাত্র।
জামায়াতে ইসলামীর মূল লক্ষ্য সবসময়ই ছিল বাংলাদেশে শরীয়াহ আইন প্রতিষ্ঠা করা। তারা ১৯৭১ সালে এদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল ঠিক এই কারণে যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছিল অসাম্প্রদায়িক, ধর্মনিরপেক্ষ। তারা চেয়েছিল পাকিস্তানের সাথে থাকতে, কারণ পাকিস্তান ছিল একটা ইসলামি রাষ্ট্র। সেই পরিকল্পনা ব্যর্থ হওয়ার পর তারা বাংলাদেশের ভেতর থেকেই কাজ করে যাচ্ছে একই লক্ষ্য অর্জনের জন্য। জিয়াউর রহমান তাদের পুনর্বাসিত করেছিলেন, এরশাদ তাদের শক্তিশালী করেছিলেন, খালেদা জিয়া তাদের জোট সরকারে নিয়েছিলেন। প্রতিটা ধাপে তারা আরেকটু সামনে এগিয়েছে।
এখন ইউনুস তাদের হাতে তুলে দিয়েছেন পুরো রাষ্ট্রযন্ত্র। শিক্ষা মন্ত্রণালয়, ধর্ম মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, এসব জায়গায় বসানো হয়েছে হয় জামায়াত ঘনিষ্ঠ লোক, নয়তো তাদের মতাদর্শে বিশ্বাসী মানুষ। পুলিশ, প্রশাসন, গোয়েন্দা সংস্থা থেকে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে যারা জামায়াত বিরোধী, বসানো হচ্ছে তাদের লোক। বিচার বিভাগে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে যারা শরীয়াহ আইনের পক্ষে কথা বলেন তাদের। পাঠ্যপুস্তক থেকে বাদ দেওয়া হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, যুক্ত করা হচ্ছে জামায়াত নেতাদের জীবনী।
গণভোট হলো এই পুরো প্রক্রিয়ার একটা গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। হ্যাঁ ভোট যদি পাওয়া যায় (আর সেটা যে পাওয়া যাবে সেটা নিশ্চিত, কারণ পুরো রাষ্ট্রযন্ত্র সেই কাজেই লাগানো হয়েছে), তাহলে বলা হবে জনগণ রায় দিয়েছে। তারপর সেই রায়ের ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধন করা হবে। ধর্মনিরপেক্ষতা শব্দটা মুছে ফেলা হবে, ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম করার পাশাপাশি সব আইন শরীয়াহ অনুযায়ী হতে হবে এমন বিধান যুক্ত করা হবে।
আদালতে বিচারকদের পাশে বসানো হবে মৌলভীরা যারা ফতোয়া দেবেন। নারীদের জন্য তৈরি হবে নতুন নিয়মকানুন, তারা কী পরবেন, কোথায় যাবেন, কার সাথে কথা বলবেন, সব নিয়ন্ত্রণ করা হবে। সংখ্যালঘুদের ওপর আরোপ করা হবে জিজিয়া কর, তাদের উপাসনালয় ধ্বংস করা হবে জোর করে। ব্লাসফেমি আইন করা হবে, যার ভিত্তিতে যে কাউকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া যাবে।
এগুলো কি কোনো কল্পনা? মোটেই না। পাকিস্তান দেখুন। সেখানে জিয়াউল হক শরীয়াহ আইন চালু করার পর কী হয়েছে। আহমদিয়া সম্প্রদায়কে অমুসলিম ঘোষণা করা হয়েছে, খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের ওপর চলছে অত্যাচার, নারীরা পথেঘাটে নিরাপদ নন, ব্লাসফেমি আইনে হাজার হাজার মানুষকে জেলে পুরে রাখা হয়েছে, অনেককে মব লিঞ্চিং করা হয়েছে।
আফগানিস্তান দেখুন। তালেবান যখন ক্ষমতায় ছিল, মেয়েদের স্কুলে যাওয়া বন্ধ ছিল, সঙ্গীত নিষিদ্ধ ছিল, টেলিভিশন নিষিদ্ধ ছিল, পুরুষদের দাড়ি রাখতে হতো, নারীদের বোরকা পরতে হতো। এখন আবার তারা ক্ষমতায় এসেছে আর সেই একই কাজ শুরু করেছে। ইয়েমেন দেখুন, হুথিরা যে এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে সেখানে চলছে কঠোর শরীয়াহ। সিরিয়ায় আইসিস যখন ছিল, তারা প্রকাশ্যে মানুষ জবাই করতো, নারীদের দাস বানাতো।
বাংলাদেশও এই পথেই যাচ্ছে। জামায়াত আর তাদের সহযোগী জঙ্গি সংগঠনগুলো বছরের পর বছর ধরে তৈরি করে রেখেছে মাঠপর্যায়ে একটা শক্তিশালী নেটওয়ার্ক। মাদ্রাসাগুলোতে তারা তৈরি করেছে হাজার হাজার তরুণ যারা জিহাদে বিশ্বাস করে। জুলাইয়ের দাঙ্গায় সেই তরুণরাই রাস্তায় নেমেছিল, হিন্দু মন্দির ভাঙছিল, আওয়ামী লীগ নেতাদের বাড়িতে আগুন দিচ্ছিল, পুলিশ আর সাধারণ মানুষকে খুন করছিল। সামরিক বাহিনী নীরব থেকেছে, কারণ তাদের একটা অংশও জামায়াতের সাথে আদর্শিকভাবে একমত। আর বিদেশি শক্তি অর্থ দিয়েছে, কারণ তারা চায় বাংলাদেশ একটা অস্থিতিশীল রাষ্ট্র হয়ে থাকুক, ভারতের জন্য হুমকি হয়ে থাকুক, চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোডের জন্য একটা সমস্যা হয়ে থাকুক।
এখন হ্যাঁ না ভোটের মাধ্যমে এই পুরো প্রকল্পকে জনগণের রায়ের মোড়কে মুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ব্যবহার করে, ভয়ভীতি দেখিয়ে, প্রলোভন দিয়ে আদায় করা হ্যাঁ ভোটকে বলা হবে গণরায়। কিন্তু যে ভোটে মানুষের প্রকৃত পছন্দ প্রকাশের কোনো সুযোগ নেই, যেখানে শুধু একটা প্রশ্ন আর দুটো উত্তর, যেখানে পুরো সরকারি মেশিনারি একটা নির্দিষ্ট উত্তরের পক্ষে কাজ করছে, সেটাকে কীভাবে গণতান্ত্রিক বলা যায়? এটা তো প্রহসন ছাড়া কিছু না।
আর এই প্রহসনের পেছনে যে বুদ্ধি কাজ করছে, সেটা ইউনুসের নয়। ইউনুস তো একজন ফ্রন্টম্যান মাত্র, যার কাজ হলো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে একটা গ্রহণযোগ্য মুখ দেখানো। আসল কলকাঠি নাড়ছে জামায়াত আর তাদের মধ্যপ্রাচ্যের পৃষ্ঠপোষকরা। কাতার, তুরস্ক, মালয়েশিয়া এসব দেশ থেকে আসছে অর্থ আর আদর্শিক সমর্থন। পাকিস্তানের আইএসআই দিচ্ছে কৌশলগত পরামর্শ আর মাঠপর্যায়ে সহায়তা। আর পশ্চিমা দেশগুলো, যারা নিজেদের গণতন্ত্রের রক্ষক বলে দাবি করে, তারা চুপচাপ দেখছে, কারণ তাদের ভূরাজনৈতিক স্বার্থ এতে পূরণ হচ্ছে।
বাংলাদেশ এখন একটা মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। হয় দেশটা থাকবে একটা গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র, যেখানে সব ধর্মের মানুষ সমান অধিকার পাবে, নারী-পুরুষ সবাই স্বাধীনভাবে বাঁচতে পারবে, মুক্ত চিন্তার চর্চা হবে। নয়তো দেশটা পরিণত হবে আরেকটা পাকিস্তান, আফগানিস্তান, সিরিয়া, ইয়েমেনে। যেখানে মৌলবাদীরা সব নিয়ন্ত্রণ করবে, সহিংসতা হবে নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা, সংখ্যালঘুরা হবে নির্যাতিত, নারীরা হবে বন্দি, আর যুবকরা হয় জঙ্গি হবে নয়তো দেশ ছেড়ে পালাবে।
এই গণভোট সেই পথেরই একটা ধাপ। আর যারা এই গণভোটে হ্যাঁ বলবেন, তারা জেনে হোক বা না জেনে হোক, ভোট দিচ্ছেন কুখ্যাত শরীয়াহ আইনের পক্ষে, ভোট দিচ্ছেন মৌলবাদের পক্ষে, ভোট দিচ্ছেন বাংলাদেশের ধ্বংসের পক্ষে।

