৫ আগস্টের পর থেকে বাংলাদেশের পক্ষে দৃঢ়, সাহসী ও দেশপ্রেমভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্ষম কোনো কার্যকর সরকার বাস্তবে অনুপস্থিত। অনির্বাচিত ইউনুস সরকারের শাসন জনগণের ম্যান্ডেটহীন, রাজনৈতিক বৈধতাহীন এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় চরম ব্যর্থতার প্রতীক হয়ে উঠেছে। এই সরকার রাষ্ট্র পরিচালনা করছে না বরং ক্ষমতা আঁকড়ে রাখার রাজনীতির মাধ্যমে দেশকে ঠেলে দিচ্ছে গভীর অনিশ্চয়তা, অস্থিতিশীলতা ও সর্বনাশের দিকে।
রাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষার পরিবর্তে বর্তমান সরকার পরিণত হয়েছে দেশি-বিদেশি নানা শক্তিকে খুশি করার এক অদ্ভুত যন্ত্রে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রকে তুষ্ট করার মরিয়া প্রচেষ্টা, অন্যদিকে পাকিস্তানঘেঁষা সিদ্ধান্ত ও প্রভাবের অভিযোগ, আবার চীনকে সন্তুষ্ট করতে গিয়ে ভারতের ওপর নির্ভরশীলতা কমানোর অপরিকল্পিত ও ব্যর্থ প্রয়াস এই পরস্পরবিরোধী অবস্থান স্পষ্ট করে দেয়, সরকারের কোনো সুসংহত কূটনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি নেই। এর ফলাফল হিসেবে বাংলাদেশ আজ আন্তর্জাতিক পরিসরে বিশ্বাসযোগ্যতা হারাচ্ছে এবং এক গভীর কূটনৈতিক ব্যর্থতার মুখে দাঁড়িয়ে আছে।
অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এই সরকার আরও নগ্নভাবে সুবিধাবাদী ও দ্বিচারিতার পথ বেছে নিয়েছে। জামায়াত ও এনসিপিকে তুষ্ট করতে এক ধরনের নীতি, বিএনপিকে খুশি করতে আরেক ধরনের নীতি, আবার বিভিন্ন ইসলামিক দলকে সন্তুষ্ট রাখতে সীমাহীন তোষণ এই বিভ্রান্তিকর রাজনীতিতে রাষ্ট্রীয় আদর্শ ও নীতিগত দৃঢ়তা সম্পূর্ণভাবে বিলীন হয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এক সময় দেশ ছেড়ে পালিয়ে থাকা শীর্ষ সন্ত্রাসী, মৌলবাদী ও জঙ্গি শক্তিকে পুনর্বাসন ও সন্তুষ্ট রাখার চেষ্টায় সরকার ব্যস্ত, অথচ মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষের শক্তিকে পরিকল্পিতভাবে দুর্বল ও নিশ্চিহ্ন করার অপচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
জনগণের দুর্ভোগ এই সরকারের কাছে কোনো অগ্রাধিকার নয়। বিদেশে বাংলাদেশিদের প্রবেশ ক্রমাগত সীমিত হচ্ছে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ভাবমূর্তি নেমে গেছে তলানিতে। অর্থনীতি কার্যত ভেঙে পড়ার পথে দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি, কর্মসংস্থানের সংকট, মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত জনগোষ্ঠীর জীবন আজ চরম অনিশ্চয়তায়। যে বাংলাদেশ একসময় শক্তিশালী ও সম্ভাবনাময় অর্থনীতির পথে এগোচ্ছিল, তাকে আজ পরিকল্পিতভাবে দুর্বল ও পরনির্ভরশীল অর্থনীতিতে পরিণত করা হচ্ছে।
আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পূর্ণভাবে ভেঙে পড়েছে। রাজনৈতিক হত্যা, সংখ্যালঘু হত্যা, চাঁদা দিতে অস্বীকার করায় প্রকাশ্যে খুন, পরিকল্পিতভাবে কারাগারে হত্যা সবই এখন নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দখল, জমি ও বাড়ি দখল, প্রকাশ্যে পিটিয়ে হত্যা ও ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধ বেড়েই চলেছে। অথচ অপরাধীদের বিরুদ্ধে মামলা হয় না, গ্রেপ্তার কার্যত নিষিদ্ধের মতো অঘোষিত নীতি কার্যকর থাকে। অপরাধীরা আইনের ঊর্ধ্বে, আর সাধারণ নিরীহ জনগণ আইনের নির্মম শিকারে পরিণত হচ্ছে।
চিরুনি অভিযানের নামে মামলা ছাড়াই মানুষ আটক, ভুয়া ও মিথ্যা মামলায় হয়রানি এই সরকারের নিত্যদিনের চর্চা। দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ আজ এই অবৈধ শাসনের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ রোষানলের শিকার। আইন এখন ন্যায়বিচারের হাতিয়ার নয়, বরং শাসকের প্রতিহিংসা ও দমননীতির অস্ত্র।
এই সরকার প্রতিহিংসাপরায়ণ, অবৈধ ও সম্পূর্ণ অনির্বাচিত। লুটপাট, দখল ও ক্ষমতা আঁকড়ে রাখাই তাদের একমাত্র রাজনৈতিক এজেন্ডা। বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপিকে ক্ষমতার মসনদে বসাতে পাতানো নির্বাচনের নীলনকশা বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে। জনগণের অংশগ্রহণহীন, মতামতবিহীন সাজানো নির্বাচনের মাধ্যমে শীর্ষ দুর্নীতিবাজ, চাঁদাবাজ ও অপরাধীদের রাষ্ট্রক্ষমতায় বসানোর অপচেষ্টা গণতন্ত্রের কবর রচনার নামান্তর।
আজ বাংলাদেশ এক গভীর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নৈতিক সংকটে নিমজ্জিত। এই সংকট কোনো দুর্ঘটনা নয় এটি অনির্বাচিত ও ব্যর্থ শাসনের পরিকল্পিত পরিণতি। রাষ্ট্র পরিচালনায় যদি অবিলম্বে দেশপ্রেম, গণতন্ত্র, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও জনগণের স্বার্থকে পুনরায় কেন্দ্রে না আনা হয়, তবে এই বিপর্যয় আরও ভয়াবহ রূপ নেবে। ইতিহাস সাক্ষী থাকবে এই সর্বনাশের দায় এড়ানোর সুযোগ কারও থাকবে না।

