রানা প্রতাপ বৈরাগীর মাথায় সাতটা গুলি করা হয়েছিল। সাতটা। একজন মানুষকে মারতে সাতটা গুলির দরকার হয় না। এটা নিশ্চিত করার জন্য করা হয়, যাতে বেঁচে থাকার কোনো সম্ভাবনাই না থাকে। অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকের ছেলে, নিজে ব্যবসায়ী, কারো সাথে কোনো শত্রুতা নেই। কিন্তু তার অপরাধ ছিল একটাই। তিনি হিন্দু। আর এই একটা পরিচয়ই যথেষ্ট মুহাম্মদ ইউনুসের অবৈধ শাসনামলে মৃত্যুদণ্ড পাওয়ার জন্য।
খোকন চন্দ্র দাসকে শুধু কুপিয়ে মারা হয়নি। তার শরীরে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। পুলিশ বলছে ছিনতাইয়ের ঘটনা। তার বাবা যে প্রশ্ন তুলেছেন, সেটাই আসল প্রশ্ন। ছিনতাই করতে গেলে টাকা নিয়ে পালিয়ে যায় মানুষ। কিন্তু একজন মানুষকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারার পেছনে যে মানসিকতা লাগে, সেটা ছিনতাইকারীর থাকে না। সেটা থাকে ধর্মীয় উন্মাদদের, যারা একজন মানুষকে তার বিশ্বাসের জন্য শাস্তি দিতে চায়।
দিপু দাসকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে পিটিয়ে মেরে লাশ গাছের সাথে বেঁধে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। কী অবমাননা করেছিল সে? কেউ জানে না। কিন্তু অভিযোগটাই যথেষ্ট। এই একটা মামলার মধ্যেই পুরো ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়ে যায়। ধর্ম অবমাননার অভিযোগ এখন সংখ্যালঘু হত্যার লাইসেন্স হয়ে গেছে। আর এই লাইসেন্স দিয়েছে মুহাম্মদ ইউনুস আর তার পৃষ্ঠপোষক জামায়াতে ইসলামী।
পুলিশের সেই হাস্যকর রিপোর্ট দেখুন। ১৭৬৯টা ঘটনার মধ্যে ৯৮ শতাংশ নাকি রাজনৈতিক, সাম্প্রদায়িক নয়। মানে কী এর? মানে হলো, হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টানদের বাড়িঘরে আগুন দেওয়া, তাদের মন্দির ভাঙা, তাদের মেয়েদের ধর্ষণ করা, তাদের ব্যবসা লুট করা, এসব নাকি রাজনৈতিক কারণে হয়েছে। কোন রাজনীতি? আওয়ামী লীগের সাথে তো তাদের কোনো সম্পর্ক ছিল না বেশিরভাগের। তাহলে কেন তাদেরকে টার্গেট করা হলো?
উত্তরটা সহজ। কারণ তারা সংখ্যালঘু। কারণ তারা হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান। কারণ জামায়াতে ইসলামীর এজেন্ডায় এদের জায়গা নেই। কারণ যুদ্ধাপরাধীদের রাজনীতিতে সংখ্যালঘুরা শত্রু। ১৯৭১ সালে এরা যা করেছিল, ২০২৪ সালে এসে আবার সেই একই কাজ করছে। শুধু এবার তাদের হাতে রাষ্ট্রযন্ত্র আছে।
ইউনুস আর তার প্রেস উইং বলছে, এসব ঘটনা যাচাই না করেই বিবৃতি দেওয়া ঠিক না। মানে তারা চাইছে সুলতানা কামাল, খুশি কবীররা প্রতিটা হত্যাকাণ্ডের জায়গায় গিয়ে তদন্ত করুক। কিন্তু পুলিশ কী করছে? যেই পুলিশের কাজ তদন্ত করা, তারা বসে বসে সার্টিফিকেট দিচ্ছে যে এসব সাম্প্রদায়িক ঘটনা না। নরসিংদীতে মনি চক্রবর্তীকে খুন করা হলো। পুলিশ বলল ব্যবসায়িক শত্রুতা। কিন্তু তার পরিবার তো বলছে এমন কোনো শত্রুতা ছিল না। তাহলে কার কথা বিশ্বাস করব? যে পুলিশ ইউনুসের নির্দেশে চলে, তাদের কথা? নাকি যে পরিবার মৃতের সবচেয়ে কাছের মানুষ, তাদের কথা?
দেখুন তো সংখ্যা। ৫ আগস্টের একদিনেই ১৪৫২টা ঘটনা। একটা দিনে। এটা কাকতালীয় হতে পারে না। এটা সুপরিকল্পিত। শেখ হাসিনা সরকার পড়ে যাওয়ার সাথে সাথে যেন একটা সংকেত দেওয়া হলো। আর সেই সংকেতের অর্থ ছিল পরিষ্কার। এখন সংখ্যালঘুদের উপর যা ইচ্ছা করা যাবে। কেউ বাধা দেবে না। পুলিশ বাধা দেবে না, প্রশাসন বাধা দেবে না, সরকার বাধা দেবে না। কারণ সরকারই তো চায় এটা।
জামায়াত আর তার সহযোগীরা যে বিদেশি টাকায় কাজ করছে, এটা এখন আর গোপন কিছু না। জুলাই মাসের দাঙ্গাগুলো কীভাবে এত সংগঠিত হলো? কীভাবে একসাথে সারাদেশে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ল? কারা এত অস্ত্র যোগান দিল? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজলে একটা জিনিস পরিষ্কার হয়। এটা কোনো স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন ছিল না। এটা ছিল একটা সুপরিকল্পিত অভ্যুত্থান। আর সামরিক বাহিনীর সমর্থন ছাড়া এই অভ্যুত্থান সম্ভব ছিল না।
এখন ইউনুস বসে আছেন অবৈধভাবে ক্ষমতায়। তার কোনো নির্বাচনী বৈধতা নেই। তিনি জনগণের ভোটে আসেননি। তিনি এসেছেন সামরিক সমর্থন আর জামায়াতের রাজনৈতিক শক্তিতে। আর বিনিময়ে জামায়াত যা চায়, তাকে সেটা দিতে হচ্ছে। জামায়াত চায় সংখ্যালঘুদের নিশ্চিহ্ন করতে। চায় বাংলাদেশকে একটা ধর্মীয় রাষ্ট্রে পরিণত করতে। চায় ১৯৭১ সালের পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে।
ভারত সরকার যেটা বলেছে, সেটা একদম সঠিক। এই ঘটনাগুলোকে ব্যক্তিগত শত্রুতা, ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব বলে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে শুধুমাত্র আসল অপরাধীদের রক্ষা করতে। যারা এই হত্যাকাণ্ডগুলো চালাচ্ছে, তারা জানে তাদের কিছু হবে না। কারণ যে সরকার ক্ষমতায় আছে, সেই সরকারই তো তাদের পৃষ্ঠপোষক।
একমাসে আটজন খুন। পুলিশের হিসাবে ১৭৬৯টা ঘটনা। ঐক্য পরিষদের হিসাবে আরো বেশি। কিন্তু আসল সংখ্যা হয়তো আরো ভয়াবহ। কারণ অনেক ঘটনা রিপোর্টই হয় না। যখন একটা পরিবার দেখে পুলিশ তাদের কথা শুনবে না, যখন তারা দেখে সরকার তাদের রক্ষা করবে না, তখন তারা চুপ করে থাকে। তারা শুধু নিজেদের বাঁচানোর চেষ্টা করে।
নির্বাচন এগিয়ে আসছে। আর ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশে প্রতিটা নির্বাচনের আগে সংখ্যালঘুদের উপর হামলা বাড়ে। কারণটা পরিষ্কার। সংখ্যালঘুরা সাধারণত ধর্মনিরপেক্ষ দলগুলোকে ভোট দেয়। তাদের ভয় দেখিয়ে, তাদের উপর হামলা চালিয়ে ভোটকেন্দ্রে যেতে বাধা দেওয়া হয়। এবার সেই কৌশল আরো নৃশংস হয়ে উঠেছে। কারণ এবার হামলাকারীরা জানে তাদের পেছনে রাষ্ট্রশক্তি আছে।
৩২ জন বিশিষ্ট নাগরিক বিবৃতি দিয়েছেন। তারা সরকারকে ব্যর্থ বলেছেন। কিন্তু ব্যর্থতা আর ইচ্ছাকৃত নিষ্ক্রিয়তার মধ্যে পার্থক্য আছে। ইউনুস সরকার ব্যর্থ হচ্ছে না। তারা ইচ্ছা করেই কিছু করছে না। কারণ এই সহিংসতা তাদের রাজনৈতিক এজেন্ডার অংশ। জামায়াত যেহেতু তাদের মূল শক্তি, তাই জামায়াতের এজেন্ডাই হয়ে উঠেছে সরকারের এজেন্ডা।
বজেন্দ্র বিশ্বাস নামের আনসার সদস্যকে তার সহকর্মী গুলি করে মেরেছে। কেন? কোনো ঝগড়া হয়নি। কোনো তর্ক হয়নি। হঠাৎ করেই উরুতে বন্দুক ঠেকিয়ে গুলি করে দিল। এটা কেমন ঘটনা? এটা কি আদৌ বিশ্বাসযোগ্য? নাকি এখানেও কোনো ধর্মীয় উন্মাদনা কাজ করেছে? একজন মুসলিম আনসার সদস্যের মনে হয়তো ধারণা জন্মেছে যে হিন্দু সহকর্মীকে মেরে ফেলা তার ধর্মীয় দায়িত্ব।
জয় মহাপাত্রকে একটা দোকানে ডেকে নিয়ে মারধর করা হয়েছে। তারপর তার মুখে বিষ ঢেলে দেওয়া হয়েছে। কল্পনা করুন একজন মানুষকে জোর করে বিষ খাওয়ানো হচ্ছে। এর জন্য কতটা ঘৃণা লাগে? কতটা বিদ্বেষ লাগে? এই বিদ্বেষ তৈরি হয়েছে কীভাবে? এটা তৈরি হয়েছে দীর্ঘদিনের সাম্প্রদায়িক বিষবাক্যে, যেটা জামায়াত আর তার সহযোগী সংগঠনগুলো ছড়াচ্ছে।
মিঠুন সরকারকে চোর সন্দেহে ধাওয়া করা হলো। প্রাণ বাঁচাতে জলাশয়ে ঝাঁপ দিলেন। ডুবে মারা গেলেন। এখন প্রশ্ন হলো, তিনি আসলে চোর ছিলেন কিনা। নাকি শুধু হিন্দু বলেই তাকে চোর বানানো হলো? কারণ এই দেশে এখন হিন্দু মানেই সন্দেহভাজন। হিন্দু মানেই ভারতের দালাল। হিন্দু মানেই দেশের শত্রু। এই ন্যারেটিভ তৈরি করা হয়েছে পরিকল্পিতভাবে।
অমৃত মণ্ডলকে চাঁদাবাজির অভিযোগে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে। পুলিশ বলছে সে সন্ত্রাসী ছিল। কিন্তু প্রমাণ কোথায়? কোনো মামলা ছিল? কোনো অভিযোগ ছিল? নাকি হিন্দু বলেই তার বিরুদ্ধে এই অভিযোগ আনা হলো? এখন তো যেকোনো হিন্দুকে মারতে চাইলে বলে দিলেই হয় যে সে চাঁদাবাজ, সে সন্ত্রাসী। আর পুলিশ সেই অভিযোগ মেনে নেবে।
শরৎ চক্রবর্তীকে বাড়ির ফটকেই কুপিয়ে মারা হয়েছে। তার স্ত্রী বলছেন কারো সাথে কোনো বিরোধ ছিল না। কিন্তু পুলিশ খুঁজছে ব্যক্তিগত শত্রুতা। কেন? কারণ সাম্প্রদায়িক হত্যা স্বীকার করলে তো আন্তর্জাতিক চাপ আসবে। তখন ইউনুস সরকারকে জবাবদিহি করতে হবে। তাই সহজ পথ হলো এগুলোকে সাধারণ অপরাধ বানিয়ে দেওয়া।
ডিসেম্বর মাসে ৫১টা সহিংস ঘটনা। জানুয়ারিতে আরো বেড়েছে। এই সংখ্যা বাড়তেই থাকবে। কারণ যতদিন ইউনুস আর তার জামায়াত মিত্ররা ক্ষমতায় থাকবে, ততদিন সংখ্যালঘুরা নিরাপদ থাকবে না। এটা এখন আর আশঙ্কা নয়, এটা বাস্তবতা।
যুদ্ধাপরাধীরা এখন মন্ত্রী। যারা ১৯৭১ সালে হত্যা করেছে, ধর্ষণ করেছে, লুটপাট করেছে, তারা এখন দেশ চালাচ্ছে। এটা হতে পারে কীভাবে? একটা দেশ কীভাবে এতটা নিচে নামতে পারে যে যুদ্ধাপরাধীরাই সেই দেশের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ করে? উত্তর হলো, যখন সামরিক অভ্যুত্থান হয়, যখন গণতন্ত্র খুন হয়, তখন এসবই সম্ভব হয়।
মুহাম্মদ ইউনুস গরিবদের ব্যাংকার হিসেবে খ্যাতি পেয়েছিলেন। নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন। কিন্তু এখন তার পরিচয় হবে একজন অবৈধ শাসক হিসেবে, যার আমলে সংখ্যালঘু নিধন চলেছে। ইতিহাস তাকে মনে রাখবে সেই মানুষ হিসেবে যে ক্ষমতার লোভে যুদ্ধাপরাধীদের সাথে হাত মিলিয়েছিল। যে নিজের উচ্চাভিলাষের জন্য সংখ্যালঘুদের রক্তে হাত রাঙিয়েছিল।
প্রশ্ন হলো এর শেষ কোথায়? কতজনকে আরো মরতে হবে? কতগুলো বাড়ি আরো পুড়বে? কতগুলো মন্দির আরো ভাঙা হবে? কতজন নারীকে আরো ধর্ষণ করা হবে? উত্তর হলো, যতদিন এই অবৈধ সরকার ক্ষমতায় থাকবে, ততদিন এই সহিংসতা চলবে। কারণ এই সহিংসতা এই সরকারের অস্তিত্বের অংশ। জামায়াত ছাড়া ইউনুস ক্ষমতায় থাকতে পারবে না। আর জামায়াতের রসদ হচ্ছে সংখ্যালঘুদের রক্ত।

