জুলাই মাসে রক্তগঙ্গা বইয়ে যখন নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করা হলো, তখন থেকেই পরিষ্কার ছিল – এই ক্যু’র আসল টার্গেট শুধু সরকার নয়, আওয়ামী লীগ এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সবাইকে শেষ করে দেওয়া। ইউনূস আর তার প্রভুদের পরিকল্পনা ছিল সুদূরপ্রসারী। ক্ষমতা দখলের পরপরই কারাগার ব্যবস্থাপনায় যাদের বসানো হয়েছে, তাদের তালিকা দেখলে বোঝা যায় – জেলখানাগুলোকে বানানো হয়েছে নির্মূল অভিযানের কসাইখানা।
আইজি প্রিজন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোতাহার – চট্টগ্রাম কলেজে শিবির নেতা ছিলেন। একজন ছাত্র শিবির ক্যাডার এখন পুরো কারাগার ব্যবস্থার মাথায়। এ্যাডিশনাল আইজি জাহাঙ্গীর কবির – বিএনপির লোক, খালেদা জিয়ার সময়ে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের জেল সুপার ছিলেন। মানে যারা আওয়ামী লীগকে ঘৃণা করে, যাদের রাজনীতিই দাঁড়িয়ে আছে মুক্তিযুদ্ধবিরোধিতার ওপর, তাদের হাতেই তুলে দেওয়া হয়েছে জেলবন্দি আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের জীবন-মরণের চাবি।
ডিআইজি টিপু সুলতান – গোপালগঞ্জের লোক হয়েও জামায়াতের সাথে সক্রিয়। কী নিদারুণ বিড়ম্বনা! বঙ্গবন্ধুর জন্মভূমির একজন মানুষ তার খুনিদের মতাদর্শের লোক হয়ে বসে আছে কারাগারের উঁচু পদে। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার সুরাইয়া আক্তার – জামায়াত-শিবিরের সক্রিয় সদস্য। এই মহিলাই দায়িত্বে আছেন রাজনৈতিক বন্দিদের ওপর সবচেয়ে বেশি নির্যাতন চালানোর। কাশিমপুর হাই সিকিউরিটিতে আবদুল্লাহ আল মামুন – ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবির করতেন। মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগারে কাওয়ালিন নাহার – জামায়াত-শিবির।
প্রতিটা গুরুত্বপূর্ণ জেলখানায়, প্রতিটা সিনিয়র পদে বসানো হয়েছে হয় বিএনপির লোক, নয়তো জামায়াত-শিবিরের ক্যাডার। গাজীপুর জেলার জেল সুপার রফিকুল কাদের – বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন আহমেদের আপন ভাগ্নে জামাই। কুমিল্লায় হালিমা খাতুন – জামায়াত পন্থী। ময়মনসিংহে আমিরুল ইসলাম – ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবির করেছেন। চট্টগ্রামে ইকবাল হোসেন, সিলেটে নাহিদা পারভীন, যশোরে নূরশেদ আহমেদ – সবাই জামায়াত পন্থী। ফেনীতে আব্দুল জলিল, চুয়াডাঙ্গায় আসাদুর রহমান, টাঙ্গাইলে শহিদুল ইসলাম – সবাই সক্রিয় জামায়াত।
এই নিয়োগের প্যাটার্ন দেখে কি মনে হয় এটা সাধারণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত? একদমই না। এটা একটা সুপরিকল্পিত ব্যবস্থা, যেখানে জেলখানাগুলোকে বানানো হয়েছে আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের ধ্বংস করার কারখানা। যারা একাত্তরে পাকিস্তানি বাহিনীর দোসর ছিল, যাদের হাত রক্তে রাঙানো, যারা বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর জিয়াউর রহমানের ছত্রছায়ায় রাজনীতিতে ফিরে এসেছিল, সেই জামায়াত-শিবিরের লোকদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষদের নির্যাতনের দায়িত্ব।
ইউনূস আর তার প্রভু বিদেশি শক্তিগুলো জানে, শুধু ক্ষমতা দখল করলেই হবে না। যতদিন আওয়ামী লীগ থাকবে, যতদিন মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবাহী মানুষ বেঁচে থাকবে, ততদিন তাদের অবৈধ শাসন টিকবে না। তাই জেলখানায় চলছে পরিকল্পিত নির্মূল অভিযান। হাসিনা সরকারের আমলে জামায়াত নেতারা যুদ্ধাপরাধের বিচারে ফাঁসি পেয়েছিল। আজ সেই প্রতিশোধ নেওয়া হচ্ছে জেলবন্দি আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের ওপর। আর সেই প্রতিশোধের দায়িত্ব পেয়েছে জামায়াত-বিএনপির ক্যাডাররা।
বাংলাদেশ যে দেশ তৈরি হয়েছিল আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে, যে দেশের জন্য ত্রিশ লাখ মানুষ প্রাণ দিয়েছিল, সেই দেশে আজ সেই দলের মানুষদের জেলখানায় মেরে ফেলা হচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধ যাদের সবচেয়ে বড় পরাজয়, একাত্তর যাদের সবচেয়ে বড় গ্লানি, তারাই আজ জেলখানায় বসে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষদের ওপর অত্যাচার চালাচ্ছে। এটা কোনো দুর্ঘটনা নয়, এটা ইচ্ছাকৃত। এটা একটা প্রকল্প – বাংলাদেশকে পাকিস্তানে ফিরিয়ে নেওয়ার প্রকল্প।

