Thursday, January 15, 2026

নির্বাচনের নামে যে প্রহসনের মহড়া চলছে

২০০৮ সালের পর থেকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের জনসমর্থন ও গ্রহণযোগ্যতা যে কোনো দলের চেয়ে বেশি, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু এই সত্যকে মুছে ফেলার জন্য যে চক্রান্তের জাল বোনা হয়েছে, তার শেষ ধাপ হচ্ছে আওয়ামী লীগবিহীন একটি তথাকথিত নির্বাচন। এই নির্বাচন যদি সত্যিই হয়, তাহলে দুটো জিনিস নিশ্চিত। প্রথমত, বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে, কারণ প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তাদের সামনে কেউ নেই। দ্বিতীয়ত, জুলাইয়ের রক্তাক্ত ষড়যন্ত্রে যারা জড়িত ছিল, তাদের জন্য সংসদে আসন নিশ্চিত করা হবে, তারা যে ব্যানারেই দাঁড়াক না কেন। এটা আর যাই হোক, গণতন্ত্র নয়।

নির্বাচন সুষ্ঠু হবে এই আশাও ভুয়া। আওয়ামী লীগের চল্লিশ শতাংশ ভোটার তো ভোটকেন্দ্রে যাবেনই না। আরও অন্তত বিশ শতাংশ মানুষ, যারা রাজনীতি বোঝেন এবং এই প্রহসন চিনতে পারেন, তারাও ভোট দিতে যাবেন না। মানে শুরুতেই ষাট শতাংশ ভোটার বাদ। যারা অংশ নেবেন, তাদের মধ্যেও অনেকে বিভিন্ন কারণে কেন্দ্রে পৌঁছাতে পারবেন না। তবে হ্যাঁ, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষজন, আওয়ামী সমর্থক আর দরিদ্র মানুষদের জোর করে, হুমকি দিয়ে, নির্যাতন করে ভোটকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হবে। এই সব মিলিয়ে আসল ভোটার উপস্থিতি হবে সর্বোচ্চ ত্রিশ শতাংশ, যা বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে সবচেয়ে কম।

কিন্তু এই সত্য কেউ জানতে পারবে না। কারণ নির্বাচনে অংশ নেওয়া দলগুলো, প্রশাসন, সামরিক ও বেসামরিক বাহিনীর যোগসাজশে আগে থেকেই বিপুল পরিমাণ ভোট ঢুকিয়ে রাখা হবে। তারপর জনগণ আর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে দেখানোর জন্য ভোটকেন্দ্রে ভিড় জমানো হবে, আর ঘোষণা করা হবে সত্তর শতাংশের বেশি ভোট পড়েছে। সম্পূর্ণ মিথ্যা, সম্পূর্ণ প্রতারণা।

কোটা আন্দোলন থেকে শুরু হয়ে গণতন্ত্র ও সার্বজনীন ভোটাধিকারের নামে যে জুলাই ষড়যন্ত্র ঘটানো হলো, সেটা আসলে মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতাবিরোধী শক্তিদের পুনরুত্থান ছাড়া আর কিছু নয়। এই সত্য আরেকবার প্রমাণিত হবে যখন দেখা যাবে, আওয়ামী লীগ সুষ্ঠু নির্বাচন করে না বলে যারা চিৎকার করেছিল, তারাই বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে কলঙ্কজনক কারচুপির নির্বাচন করছে। রাতের অন্ধকারে, চোরের মতো, নির্বাচনের নামে জালিয়াতি করছে।

এখন একটা প্রচারণা চলছে জোরেশোরে। বলা হচ্ছে, জামায়াতের চেয়ে বিএনপি ভালো। এটা ইউনুস, আসিফ, সার্জিস, নাহিদ, মাহফুজ, ডাস্টবিন শফিক আর তাদের পঞ্চতান্ডবের পাঁচ আগস্ট পরবর্তী সুপরিকল্পিত ডিজাইনের অংশ। হ্যাঁ, জামায়াতের চেয়ে বিএনপি ভালো, এতে সন্দেহ নেই। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন, সেক্টর কমান্ডার ছিলেন। বিএনপিতে এখনও অনেক মুক্তিযোদ্ধা আছেন। অন্যদিকে জামায়াত মুক্তিযুদ্ধের সময় সরাসরি পাকিস্তানের পক্ষে ছিল, এখনও মনে প্রাণে তাই আছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই প্রচারণা কেন? জামায়াতের তো বাংলাদেশে দশ শতাংশ ভোটও নেই। নির্বাচনে তাদের জেতার কোনো সম্ভাবনাই নেই। তাহলে কেন আওয়ামী ভোটারদের জামায়েতকে আটকাতে বিএনপিকে ভোট দেওয়ার জন্য উৎসাহিত করা হচ্ছে?

কারণটা পরিষ্কার। বিএনপি ক্ষমতায় এলে লাভবান হবে সুবিধাবাদী মধ্যপন্থী সুশীল, দুর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদ আর ব্যবসায়ী, পাশ পরিবর্তনকারী শিল্পী, সাহিত্যিক, মিডিয়াকর্মী, লেখক আর সাংবাদিকরা। যেহেতু দশ শতাংশ ক্ষমতায় থাকবে জামায়াত, তাই কালো টাকা সাদা করার মতো দেশে ঢোকার কিংবা দেশের ভেতরে মাথা তুলে ধান্দাবাজি করার সুযোগ তৈরি হবে। এই প্রচারণার সুবিধাভোগীরা এটা জানে এবং বিএনপির ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের শাসনামলে তারা এই সুবিধা ভোগ করেছে। জামায়াত এলে কী হবে তা তারা জানে না, অনিশ্চয়তা আছে। কিন্তু বিএনপি মানেই তাদের আখের গোছানোর নিশ্চয়তা।

যারা মনে করেন জামায়াত এলে দেশ উগ্র ইসলামপন্থীদের স্বর্গ হবে, কিন্তু বিএনপি এলে হবে না, তারা স্বপ্নের জগতে বাস করছেন। দেশে উগ্র ইসলামপন্থীদের যে উত্থান গত পাঁচ মাসে দেখলাম, সেটা কি আওয়ামী লীগের পনেরো বছরের শাসনামলে শিকড় গাড়েনি? আওয়ামী লীগ যেখানে এই র‍্যাডিকাল, জঙ্গিদের উত্থান ঠেকাতে পারেনি, সেখানে বিএনপি সেটা পারবে ভাবার কী কারণ আছে? আদৌ তাদের সেই ইচ্ছা আছে কি না সেটাই তো প্রশ্ন।

এখন প্রশ্ন আসতে পারে, বিএনপিও খারাপ, জামায়াতও খারাপ, তাহলে আমরা কী করব? সারাজীবন কি আওয়ামী লীগকেই ভোট দেব? এই প্রশ্নের উত্তর হ্যাঁ বলতে পারলে ভালো হতো, কিন্তু গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় তার সুযোগ নেই। আওয়ামী লীগ টানা পনেরো বছর ক্ষমতায় ছিল। একটি গণতান্ত্রিক দেশে শুধুমাত্র একটি দল আজীবন শাসন করতে পারে না। তাই দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, কোনো না কোনো সময় বিএনপিকে ক্ষমতায় আসতেই হতো। বিএনপির শাসন মূলত দুঃশাসন, এটা আমরা দেখেছি। উন্নয়ন ও রাষ্ট্র পরিচালনায় তারা অত্যন্ত অদক্ষ। তবু শেখ হাসিনা বাংলাদেশের যে কাঠামোগত উন্নয়ন করে গেছেন, তার ভিত্তিতে একটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি ক্ষমতায় এলে দেশের জন্য তেমন ক্ষতিকর হতো না।

কিন্তু ২০২৪ সালের পাঁচ আগস্টের ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারের নয়, বাংলাদেশেরই পতন হয়েছে। ওই সময় আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা কিছুটা কমে গিয়েছিল, এটা সত্য। এই অবস্থায় সকল দলের অংশগ্রহণে একটি নির্বাচন হলে বিএনপি হয়তো জিতত। সেটা তাদের দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির জন্য অত্যন্ত ভালো হতো। প্রায় উনিশ বছর ক্ষমতার বাইরে থাকার পর, যখন প্রায় কিছু না করেই বিএনপি দেশের দ্বিতীয় জনপ্রিয় দল, তখন তারা কেন আওয়ামী লীগবিহীন একটি প্রহসনের নির্বাচনে অংশ নিয়ে ক্ষমতায় আসতে চাইছে, সেটা বোঝা অসম্ভব। সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন না করতে পারার মাশুল আওয়ামী লীগকে একটি বিশাল ষড়যন্ত্রের মধ্য দিয়ে দিতে হচ্ছে, এটা কি বিএনপি দেখছে না? আওয়ামী লীগ ছাড়া নির্বাচনে অংশ নিয়ে তারা হয়তো চার-পাঁচ বছর রাষ্ট্র চালাতে পারবে, কিন্তু আসন্ন অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বিপর্যয়ের কথা মাথায় রেখে কেন তারা এমন একটি সাজানো খেলায় নামছে, সেটা বিস্ময়কর। এটা প্রমাণ করে উনিশ বছর ক্ষমতার বাইরে থেকে বিএনপিও রাজনৈতিক দূরদর্শিতা হারিয়ে ফেলেছে। না হলে তারা আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে এনে, সেই নির্বাচনে জিতে সংসদে যাওয়ার সাহস দেখাতে পারত।

আসল ব্যাপার হলো, শেখ হাসিনাকে দেশের বাইরে পাঠিয়ে, খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে এবং বিএনপিকে জনপ্রিয়তার শীর্ষে থাকা অবস্থায়ও প্রহসনের নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় পাঠিয়ে একটি গোষ্ঠী ২০০৬ সালের মাইনাস টু ফর্মুলা বাস্তবায়নের পথে এগোচ্ছে। জুলাই ষড়যন্ত্রের যে চক্র নেতৃত্ব দিয়েছে, তারা মূলত বাংলাদেশের শীর্ষ দুটি রাজনৈতিক দলকে অকার্যকর করে কোনো অগণতান্ত্রিক শক্তিকে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষমতায় বসিয়ে আঞ্চলিক প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করতে চায়। এটা যদি অন্তত সুশীল সমাজ বুঝতে না পারে, তাহলে বাংলাদেশের জন্য আরও ভয়াবহ সময় অপেক্ষা করছে।

জামায়াতের চেয়ে বিএনপি ভালো, এই প্রোপাগান্ডায় পা না দিয়ে সবার উচিত আওয়ামী লীগসহ সকল দলের অংশগ্রহণে সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবি তোলা। যে প্রচারণায় মানুষ এখন সামিল হচ্ছে, তার আসল উদ্দেশ্য হলো মানুষকে বোঝানো যে আওয়ামী লীগ ছাড়াও বাংলাদেশ চলতে পারে। কিন্তু এটা সম্পূর্ণ মিথ্যা। সরকারে হোক বা বিরোধী দলে, আওয়ামী লীগ ছাড়া বাংলাদেশ চলতে পারে না। জোর করে নির্বাচন করা যায়, কিন্তু সেটা গ্রহণযোগ্য হবে না, টেকসই হবে না।

বাংলাদেশের জন্ম হয়েছে আওয়ামী লীগের হাত ধরে। মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার ঘোষণার আলোকে এই দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় একটি সার্বজনীন, অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। বিদেশি রাষ্ট্রের টাকায়, ইসলামি জঙ্গি সংগঠনের সহায়তায় আর সামরিক বাহিনীর সমর্থনে জুলাই মাসে দেশজুড়ে দাঙ্গা বাঁধিয়ে নির্বাচিত সরকারকে ক্যু করে ফেলে দেওয়া সুদি মহাজন ইউনুস আর তার সহযোগী বিএনপি-জামায়াত যে নির্বাচনের আয়োজন করছে, সেটা শুধু প্রহসনই নয়, বাংলাদেশের অস্তিত্বের প্রতি হুমকি।

২০০৮ সালের পর থেকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের জনসমর্থন ও গ্রহণযোগ্যতা যে কোনো দলের চেয়ে বেশি, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু এই সত্যকে মুছে ফেলার জন্য যে চক্রান্তের জাল বোনা হয়েছে, তার শেষ ধাপ হচ্ছে আওয়ামী লীগবিহীন একটি তথাকথিত নির্বাচন। এই নির্বাচন যদি সত্যিই হয়, তাহলে দুটো জিনিস নিশ্চিত। প্রথমত, বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে, কারণ প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তাদের সামনে কেউ নেই। দ্বিতীয়ত, জুলাইয়ের রক্তাক্ত ষড়যন্ত্রে যারা জড়িত ছিল, তাদের জন্য সংসদে আসন নিশ্চিত করা হবে, তারা যে ব্যানারেই দাঁড়াক না কেন। এটা আর যাই হোক, গণতন্ত্র নয়।

নির্বাচন সুষ্ঠু হবে এই আশাও ভুয়া। আওয়ামী লীগের চল্লিশ শতাংশ ভোটার তো ভোটকেন্দ্রে যাবেনই না। আরও অন্তত বিশ শতাংশ মানুষ, যারা রাজনীতি বোঝেন এবং এই প্রহসন চিনতে পারেন, তারাও ভোট দিতে যাবেন না। মানে শুরুতেই ষাট শতাংশ ভোটার বাদ। যারা অংশ নেবেন, তাদের মধ্যেও অনেকে বিভিন্ন কারণে কেন্দ্রে পৌঁছাতে পারবেন না। তবে হ্যাঁ, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষজন, আওয়ামী সমর্থক আর দরিদ্র মানুষদের জোর করে, হুমকি দিয়ে, নির্যাতন করে ভোটকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হবে। এই সব মিলিয়ে আসল ভোটার উপস্থিতি হবে সর্বোচ্চ ত্রিশ শতাংশ, যা বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে সবচেয়ে কম।

কিন্তু এই সত্য কেউ জানতে পারবে না। কারণ নির্বাচনে অংশ নেওয়া দলগুলো, প্রশাসন, সামরিক ও বেসামরিক বাহিনীর যোগসাজশে আগে থেকেই বিপুল পরিমাণ ভোট ঢুকিয়ে রাখা হবে। তারপর জনগণ আর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে দেখানোর জন্য ভোটকেন্দ্রে ভিড় জমানো হবে, আর ঘোষণা করা হবে সত্তর শতাংশের বেশি ভোট পড়েছে। সম্পূর্ণ মিথ্যা, সম্পূর্ণ প্রতারণা।

কোটা আন্দোলন থেকে শুরু হয়ে গণতন্ত্র ও সার্বজনীন ভোটাধিকারের নামে যে জুলাই ষড়যন্ত্র ঘটানো হলো, সেটা আসলে মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতাবিরোধী শক্তিদের পুনরুত্থান ছাড়া আর কিছু নয়। এই সত্য আরেকবার প্রমাণিত হবে যখন দেখা যাবে, আওয়ামী লীগ সুষ্ঠু নির্বাচন করে না বলে যারা চিৎকার করেছিল, তারাই বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে কলঙ্কজনক কারচুপির নির্বাচন করছে। রাতের অন্ধকারে, চোরের মতো, নির্বাচনের নামে জালিয়াতি করছে।

এখন একটা প্রচারণা চলছে জোরেশোরে। বলা হচ্ছে, জামায়াতের চেয়ে বিএনপি ভালো। এটা ইউনুস, আসিফ, সার্জিস, নাহিদ, মাহফুজ, ডাস্টবিন শফিক আর তাদের পঞ্চতান্ডবের পাঁচ আগস্ট পরবর্তী সুপরিকল্পিত ডিজাইনের অংশ। হ্যাঁ, জামায়াতের চেয়ে বিএনপি ভালো, এতে সন্দেহ নেই। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন, সেক্টর কমান্ডার ছিলেন। বিএনপিতে এখনও অনেক মুক্তিযোদ্ধা আছেন। অন্যদিকে জামায়াত মুক্তিযুদ্ধের সময় সরাসরি পাকিস্তানের পক্ষে ছিল, এখনও মনে প্রাণে তাই আছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই প্রচারণা কেন? জামায়াতের তো বাংলাদেশে দশ শতাংশ ভোটও নেই। নির্বাচনে তাদের জেতার কোনো সম্ভাবনাই নেই। তাহলে কেন আওয়ামী ভোটারদের জামায়েতকে আটকাতে বিএনপিকে ভোট দেওয়ার জন্য উৎসাহিত করা হচ্ছে?

কারণটা পরিষ্কার। বিএনপি ক্ষমতায় এলে লাভবান হবে সুবিধাবাদী মধ্যপন্থী সুশীল, দুর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদ আর ব্যবসায়ী, পাশ পরিবর্তনকারী শিল্পী, সাহিত্যিক, মিডিয়াকর্মী, লেখক আর সাংবাদিকরা। যেহেতু দশ শতাংশ ক্ষমতায় থাকবে জামায়াত, তাই কালো টাকা সাদা করার মতো দেশে ঢোকার কিংবা দেশের ভেতরে মাথা তুলে ধান্দাবাজি করার সুযোগ তৈরি হবে। এই প্রচারণার সুবিধাভোগীরা এটা জানে এবং বিএনপির ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের শাসনামলে তারা এই সুবিধা ভোগ করেছে। জামায়াত এলে কী হবে তা তারা জানে না, অনিশ্চয়তা আছে। কিন্তু বিএনপি মানেই তাদের আখের গোছানোর নিশ্চয়তা।

যারা মনে করেন জামায়াত এলে দেশ উগ্র ইসলামপন্থীদের স্বর্গ হবে, কিন্তু বিএনপি এলে হবে না, তারা স্বপ্নের জগতে বাস করছেন। দেশে উগ্র ইসলামপন্থীদের যে উত্থান গত পাঁচ মাসে দেখলাম, সেটা কি আওয়ামী লীগের পনেরো বছরের শাসনামলে শিকড় গাড়েনি? আওয়ামী লীগ যেখানে এই র‍্যাডিকাল, জঙ্গিদের উত্থান ঠেকাতে পারেনি, সেখানে বিএনপি সেটা পারবে ভাবার কী কারণ আছে? আদৌ তাদের সেই ইচ্ছা আছে কি না সেটাই তো প্রশ্ন।

এখন প্রশ্ন আসতে পারে, বিএনপিও খারাপ, জামায়াতও খারাপ, তাহলে আমরা কী করব? সারাজীবন কি আওয়ামী লীগকেই ভোট দেব? এই প্রশ্নের উত্তর হ্যাঁ বলতে পারলে ভালো হতো, কিন্তু গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় তার সুযোগ নেই। আওয়ামী লীগ টানা পনেরো বছর ক্ষমতায় ছিল। একটি গণতান্ত্রিক দেশে শুধুমাত্র একটি দল আজীবন শাসন করতে পারে না। তাই দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, কোনো না কোনো সময় বিএনপিকে ক্ষমতায় আসতেই হতো। বিএনপির শাসন মূলত দুঃশাসন, এটা আমরা দেখেছি। উন্নয়ন ও রাষ্ট্র পরিচালনায় তারা অত্যন্ত অদক্ষ। তবু শেখ হাসিনা বাংলাদেশের যে কাঠামোগত উন্নয়ন করে গেছেন, তার ভিত্তিতে একটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি ক্ষমতায় এলে দেশের জন্য তেমন ক্ষতিকর হতো না।

কিন্তু ২০২৪ সালের পাঁচ আগস্টের ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারের নয়, বাংলাদেশেরই পতন হয়েছে। ওই সময় আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা কিছুটা কমে গিয়েছিল, এটা সত্য। এই অবস্থায় সকল দলের অংশগ্রহণে একটি নির্বাচন হলে বিএনপি হয়তো জিতত। সেটা তাদের দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির জন্য অত্যন্ত ভালো হতো। প্রায় উনিশ বছর ক্ষমতার বাইরে থাকার পর, যখন প্রায় কিছু না করেই বিএনপি দেশের দ্বিতীয় জনপ্রিয় দল, তখন তারা কেন আওয়ামী লীগবিহীন একটি প্রহসনের নির্বাচনে অংশ নিয়ে ক্ষমতায় আসতে চাইছে, সেটা বোঝা অসম্ভব। সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন না করতে পারার মাশুল আওয়ামী লীগকে একটি বিশাল ষড়যন্ত্রের মধ্য দিয়ে দিতে হচ্ছে, এটা কি বিএনপি দেখছে না? আওয়ামী লীগ ছাড়া নির্বাচনে অংশ নিয়ে তারা হয়তো চার-পাঁচ বছর রাষ্ট্র চালাতে পারবে, কিন্তু আসন্ন অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বিপর্যয়ের কথা মাথায় রেখে কেন তারা এমন একটি সাজানো খেলায় নামছে, সেটা বিস্ময়কর। এটা প্রমাণ করে উনিশ বছর ক্ষমতার বাইরে থেকে বিএনপিও রাজনৈতিক দূরদর্শিতা হারিয়ে ফেলেছে। না হলে তারা আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে এনে, সেই নির্বাচনে জিতে সংসদে যাওয়ার সাহস দেখাতে পারত।

আসল ব্যাপার হলো, শেখ হাসিনাকে দেশের বাইরে পাঠিয়ে, খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে এবং বিএনপিকে জনপ্রিয়তার শীর্ষে থাকা অবস্থায়ও প্রহসনের নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় পাঠিয়ে একটি গোষ্ঠী ২০০৬ সালের মাইনাস টু ফর্মুলা বাস্তবায়নের পথে এগোচ্ছে। জুলাই ষড়যন্ত্রের যে চক্র নেতৃত্ব দিয়েছে, তারা মূলত বাংলাদেশের শীর্ষ দুটি রাজনৈতিক দলকে অকার্যকর করে কোনো অগণতান্ত্রিক শক্তিকে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষমতায় বসিয়ে আঞ্চলিক প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করতে চায়। এটা যদি অন্তত সুশীল সমাজ বুঝতে না পারে, তাহলে বাংলাদেশের জন্য আরও ভয়াবহ সময় অপেক্ষা করছে।

জামায়াতের চেয়ে বিএনপি ভালো, এই প্রোপাগান্ডায় পা না দিয়ে সবার উচিত আওয়ামী লীগসহ সকল দলের অংশগ্রহণে সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবি তোলা। যে প্রচারণায় মানুষ এখন সামিল হচ্ছে, তার আসল উদ্দেশ্য হলো মানুষকে বোঝানো যে আওয়ামী লীগ ছাড়াও বাংলাদেশ চলতে পারে। কিন্তু এটা সম্পূর্ণ মিথ্যা। সরকারে হোক বা বিরোধী দলে, আওয়ামী লীগ ছাড়া বাংলাদেশ চলতে পারে না। জোর করে নির্বাচন করা যায়, কিন্তু সেটা গ্রহণযোগ্য হবে না, টেকসই হবে না।

বাংলাদেশের জন্ম হয়েছে আওয়ামী লীগের হাত ধরে। মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার ঘোষণার আলোকে এই দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় একটি সার্বজনীন, অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। বিদেশি রাষ্ট্রের টাকায়, ইসলামি জঙ্গি সংগঠনের সহায়তায় আর সামরিক বাহিনীর সমর্থনে জুলাই মাসে দেশজুড়ে দাঙ্গা বাঁধিয়ে নির্বাচিত সরকারকে ক্যু করে ফেলে দেওয়া সুদি মহাজন ইউনুস আর তার সহযোগী বিএনপি-জামায়াত যে নির্বাচনের আয়োজন করছে, সেটা শুধু প্রহসনই নয়, বাংলাদেশের অস্তিত্বের প্রতি হুমকি।

আরো পড়ুন

সর্বশেষ