বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সবচেয়ে বড় প্রতারণাগুলোর একটি হলো এই যে, জামায়াতে ইসলামী যখন রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে নেয়, তখন মানুষ বুঝতেই পারে না ঠিক কোন মুহূর্তে তাদের পকেট কাটা হলো। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে ঠিক এই কাজটাই হয়েছে। একটা নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে যে অবৈধ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, তার পেছনের আসল নাট্যকার হচ্ছে জামায়াতে ইসলামী, আর মুখ্য অভিনেতা হিসেবে মঞ্চে দাঁড় করানো হয়েছে মুহাম্মদ ইউনূসকে।
ইউনূস নিজে কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব নন। তার পরিচয় একজন ক্ষুদ্রঋণ ব্যবসায়ী হিসেবে, যার প্রতিষ্ঠান দরিদ্র মানুষকে চড়া সুদে ঋণ দিয়ে তাদের আরো দরিদ্র করে তুলেছে দশকের পর দশক ধরে। নোবেল পুরস্কার তাকে আন্তর্জাতিক সম্মান এনে দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু বাংলাদেশের গ্রামীণ দরিদ্র নারীদের কাছে গ্রামীণ বাংলা মানে হলো এমন একটি প্রতিষ্ঠান যেখান থেকে টাকা নিলে আর শোধ শেষ হয় না। সাপ্তাহিক কিস্তি, সাপ্তাহিক চক্রবৃদ্ধি সুদ, আর না দিতে পারলে সামাজিক লাঞ্ছনা। এই মানুষটাকে নিয়ে আসা হয়েছে বাংলাদেশ পরিচালনা করতে, কারণ তার পেছনে রয়েছে পশ্চিমা দাতা সংস্থার বিশাল নেটওয়ার্ক আর আন্তর্জাতিক বৈধতা।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, ইউনূস কেন এই ভূমিকায় রাজি হলেন? একজন আশি বছরের মানুষ, যার জীবনে সম্মান আর প্রতিপত্তির কোনো অভাব নেই, তিনি কেন একটা অবৈধ রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের মুখ হতে রাজি হলেন? উত্তর সহজ। তার নিজের ব্যবসায়িক স্বার্থ রক্ষা করতে হবে, আর সেই সাথে তার আন্তর্জাতিক পৃষ্ঠপোষকদের স্বার্থও। গ্রামীণ ব্যাংক নিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের সাথে তার যে বিরোধ চলছিল, সেটা তো সবাই জানে। ক্ষুদ্রঋণ খাত নিয়ে নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে তার সাথে সরকারের যে দ্বন্দ্ব ছিল, সেটা শেষ পর্যন্ত তাকে সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্রে যুক্ত করেছে।
এখন আসি জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকায়। এই সংগঠনটি বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল, একাত্তরে গণহত্যায় অংশ নিয়েছিল, আর তারপর থেকে প্রতিটি মুহূর্তে তারা বাংলাদেশ রাষ্ট্রের মূল চেতনার বিরুদ্ধে কাজ করে গেছে। কিন্তু তাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, প্রকাশ্যে নিজেদের পরিচয় দিয়ে তারা কখনোই ক্ষমতায় আসতে পারবে না। বাংলাদেশের মানুষ, এমনকি অনেক ধর্মপ্রাণ মুসলমানও, জামায়াতকে বিশ্বাস করে না। তাই তারা বেছে নিয়েছে ছদ্মবেশের কৌশল।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন নামে যে প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা হয়েছিল, সেটা ছিল জামায়াতের সবচেয়ে বড় সাফল্য। এই নামটা এতই নিরীহ, এতই আপত্তিহীন যে কেউই প্রশ্ন করেনি এর পেছনে কারা আছে। বৈষম্যের বিরোধিতা তো সবারই করা উচিত, তাই না? কিন্তু এই নামের আড়ালে যারা সংগঠিত হচ্ছিল, তাদের একটা বড় অংশ ছিল ইসলামী ছাত্র শিবিরের কর্মী। তাদের সাথে যুক্ত হয়েছিল কিছু বামপন্থী কর্মী, যাদের রাজনৈতিক বিচক্ষণতা নিয়ে এখন প্রশ্ন তোলা জরুরি। কীভাবে একজন বামপন্থী কর্মী, যার মতাদর্শিক শত্রু হওয়ার কথা জামায়াতে ইসলামী, তিনি তাদের তৈরি প্ল্যাটফর্মে গিয়ে দাঁড়ান?
জুলাই মাসে যা ঘটেছে, সেটাকে আন্দোলন বলা হচ্ছে, কিন্তু বাস্তবে সেটা ছিল সুপরিকল্পিত সহিংসতা। সরকারি ভবন জ্বালানো, পুলিশ হত্যা, সংখ্যালঘু বাড়িতে হামলা, এগুলো কি আন্দোলনের স্বাভাবিক অংশ? না, এগুলো ছিল পরিকল্পিত দাঙ্গা, যার উদ্দেশ্য ছিল রাষ্ট্রকে এমন অবস্থায় নিয়ে যাওয়া যেখানে সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপ অনিবার্য হয়ে ওঠে। আর সেটা হয়েছেও। সেনাবাহিনী হস্তক্ষেপ করেছে, নির্বাচিত সরকার সরে যেতে বাধ্য হয়েছে, আর ক্ষমতায় এসেছে একটি অবৈধ তথাকথিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, যার প্রধান উপদেষ্টা হলেন মুহাম্মদ ইউনূস।
এখন দেখা যাক, এই অবৈধ সরকার গত ছয় মাসে কী করেছে। প্রথমত, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। যেসব জামায়াত নেতা একাত্তরের গণহত্যার জন্য সাজা পেয়েছিলেন, তাদের মুক্তির পথ তৈরি করা হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, জামায়াত এবং শিবিরের কর্মীদের রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য থেকে শুরু করে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে তাদের অনুপ্রবেশ ঘটছে। তৃতীয়ত, সেক্যুলার শক্তিকে ধীরে ধীরে কোণঠাসা করে ফেলা হচ্ছে।
এনসিপি এই পুরো খেলার একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটা তৈরি করা হয়েছে মূলত তরুণ সেক্যুলার শক্তিকে বিভ্রান্ত করার জন্য। জামায়াতে যোগ দিতে যেসব তরুণ লজ্জা পায়, তারা এনসিপিতে যোগ দিতে পারে। এটা একটা সফট ইমেজ তৈরির চেষ্টা। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এনসিপি আর জামায়াত একই মুদ্রার দুই পিঠ। ডেইলি স্টারের কার্টুনটা এই সত্যটা চমৎকারভাবে তুলে ধরেছে।
যেসব তরুণ এখনো এনসিপিতে আছেন, তাদের বুঝতে হবে যে তারা একটা ঐতিহাসিক ভুলের অংশ হয়ে আছেন। তারা যদি মনে করেন যে তারা সমাজ পরিবর্তনের কাজ করছেন, তাহলে তাদের জিজ্ঞাসা করতে হবে, কোন সমাজ? ধর্মীয় উগ্রবাদের সমাজ? সংখ্যালঘু নির্যাতনের সমাজ? নারীর স্বাধীনতা হরণের সমাজ? এটাই কি তারা চান?
২০২৪ সালের জুলাই মাসে যারা আন্তরিকভাবে রাস্তায় নেমেছিলেন, যারা ভেবেছিলেন তারা একটা ন্যায়ভিত্তিক সমাজ তৈরি করবেন, তাদের অনেকেই এখন বুঝতে পারছেন যে তাদের স্বতঃস্ফূর্ততাকে কাজে লাগানো হয়েছে। তারা দেখছেন যে দেশ কোন দিকে যাচ্ছে। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা খর্ব হচ্ছে, বাকস্বাধীনতা কমে যাচ্ছে, সংখ্যালঘুরা ভয়ে আছে, আর ক্ষমতার কেন্দ্রে বসে আছে যুদ্ধাপরাধীদের দল।
মুহাম্মদ ইউনূসের ভূমিকা এখানে বিশেষভাবে নিন্দনীয়। একজন নোবেল পুরস্কার বিজয়ী, যার কথা ছিল দরিদ্রদের সেবা করা, তিনি এখন হয়ে গেছেন ধর্মীয় উগ্রবাদীদের আশ্রয়দাতা। তার সরকারের অধীনে জামায়াত এবং শিবির প্রকাশ্যে কাজ করে যাচ্ছে, আর তিনি নীরব দর্শক হয়ে আছেন। এটা শুধু রাজনৈতিক ব্যর্থতা নয়, এটা নৈতিক পতন।
বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশে এখন যা চলছে সেটা একটা সুপরিকল্পিত প্রকল্প। বিদেশী অর্থ দিয়ে, ধর্মীয় উগ্রবাদীদের কাজে লাগিয়ে, আর সামরিক বাহিনীর নিরপেক্ষতাকে পুঁজি করে একটা নির্বাচিত সরকারকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এটা গণতন্ত্র নয়, এটা অভ্যুত্থান। আর এই অভ্যুত্থানের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী হলো জামায়াতে ইসলামী।
এখন প্রশ্ন হলো, এর পরে কী হবে? যদি নির্বাচন হয়, তাহলে সেটা কি সত্যিকারের নির্বাচন হবে? নাকি সেটা হবে আরেকটা প্রহসন, যেখানে জামায়াত এবং তাদের মিত্ররা নিশ্চিত করবে যে ক্ষমতা তাদের হাতেই থাকে? আর যদি নির্বাচন না হয়, তাহলে এই অবৈধ সরকার আরো কতদিন চলবে?
বাংলাদেশের মানুষকে বুঝতে হবে যে জুলাই মাসে যা ঘটেছে, সেটা কোনো বিপ্লব ছিল না। সেটা ছিল একটা সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র, যার শিকার হয়েছে সাধারণ মানুষ। যারা এখনো এই ষড়যন্ত্রের অংশ হয়ে আছেন, তাদের সময় এসেছে নিজেদের অবস্থান পুনর্মূল্যায়ন করার। ইতিহাস তাদের বিচার করবে, আর সেই বিচারে তারা কোন পক্ষে থাকতে চান, সেটা তাদেরই সিদ্ধান্ত।

