আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পর্যবেক্ষক পাঠাচ্ছে না জাতিসংঘ। গত সোমবার সংস্থার মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের মুখপাত্র স্টিফেন দুজারিক এক নিয়মিত প্রেস ব্রিফিংয়ে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে নির্বাচন যখন ‘সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ’ করার দাবি জানানো হচ্ছে, তখন জাতিসংঘের এই অনুপস্থিতি দেশের রাজনৈতিক মহলে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
পর্যবেক্ষক না পাঠানোর আনুষ্ঠানিক কারণ
ব্রিফিংয়ে দুজারিক জানান, সাধারণ পরিষদ বা নিরাপত্তা পরিষদের সুনির্দিষ্ট ম্যান্ডেট (অনুমোদন) ছাড়া জাতিসংঘ নিজে থেকে কোনো দেশে নির্বাচন পর্যবেক্ষক পাঠায় না। তিনি বলেন, “আমরা এখন আর এটি (পর্যবেক্ষক পাঠানো) করি না। তবে কারিগরি সহায়তা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।” বিশ্লেষকরা বলছেন, আওয়ামী লীগ আমলের নির্বাচনগুলোতে জাতিসংঘ পর্যবেক্ষক না পাঠিয়ে কঠোর সমালোচনা করেছিল, কিন্তু এবার সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও কেন তারা পর্যবেক্ষক দল পাঠাতে ম্যান্ডেট সংগ্রহ করল না—তা নিয়ে বিতর্ক বাড়ছে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে জাতিসংঘের ‘ছায়াযুদ্ধ’
২০২৪-২৫ সময়কালে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনে জাতিসংঘের ভূমিকা নিয়ে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। জুলাই আন্দোলনের সময় সরকারি স্থাপনায় হামলা, নরসিংদীর কারাগার থেকে জঙ্গি পালানো এবং পুলিশ সদস্যদের নৃশংস হত্যার ঘটনায় জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনার ভলকার টুর্ক রহস্যজনকভাবে নীরব ছিলেন। বরং ২৫ জুলাইয়ের বিবৃতিতে তিনি একতরফাভাবে সরকারের সমালোচনা করেছিলেন। বিশ্লেষকদের মতে, জাতিসংঘের এই পক্ষপাতমূলক আচরণ আন্দোলনকারীদের সহিংসতাকে পরোক্ষভাবে উৎসাহিত করেছে।
সেনাবাহিনীকে ‘শান্তিরক্ষা মিশনের’ হুমকি
সবচেয়ে বিতর্কিত বিষয় ছিল জাতিসংঘের পক্ষ থেকে সেনাবাহিনীকে দেওয়া হুমকি। ভলকার টুর্ক জানিয়েছিলেন, আন্দোলন দমনে সেনাবাহিনী ব্যবহৃত হলে তাদের শান্তিরক্ষা মিশনে নিষিদ্ধ করা হতে পারে। নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও সাবেক সেনা কর্মকর্তাদের মতে, এই হুমকির মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে পক্ষাঘাতগ্রস্ত করা হয়েছিল, যা দেশের সার্বভৌমত্বের ওপর এক ধরণের হস্তক্ষেপ।
একপেশে প্রতিবেদন ও রাজনৈতিক প্রকৌশল
২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রতিবেদনে দাবি করা হয় ১,৪০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে, যা সরকারের তালিকার চেয়ে অনেক বেশি। এছাড়া ১২ মে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তকে জাতিসংঘের রেসিডেন্ট কোঅর্ডিনেটর গোয়েন লুইস স্বাগত জানান। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. ফারুক হোসেনের মতে, ৫০ শতাংশ ভোটারের প্রতিনিধিত্বকারী একটি দলকে বাদ দিয়ে নির্বাচনকে ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক’ বলা জাতিসংঘের গণতন্ত্রবিরোধী অবস্থানের প্রমাণ।
ড. ইউনূসের কৃতজ্ঞতা ও নেপথ্যের সমীকরণ
গত ২৯ জুলাই এক অনুষ্ঠানে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস জুলাই-আগস্টের সংকটে পাশে থাকার জন্য জাতিসংঘের প্রতি প্রকাশ্যে কৃতজ্ঞতা জানান। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, এটি জাতিসংঘের সরাসরি হস্তক্ষেপের একটি স্বীকারোক্তি। ড. ইউনূসের সাথে জাতিসংঘের এই ‘পূর্বনির্ধারিত বোঝাপড়া’ বাংলাদেশকে বিশ্বশক্তিগুলোর একটি রাজনৈতিক ‘পরীক্ষাগারে’ পরিণত করেছে কি না, সেই সন্দেহ জোরালো হচ্ছে।
আন্দোলনের সহিংসতা উপেক্ষা করা, একতরফা প্রতিবেদন প্রকাশ এবং সেনাবাহিনীর ওপর চাপ সৃষ্টি করে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন নিশ্চিত করতে জাতিসংঘ সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এখন প্রশ্ন উঠেছে, নিজেদের সমর্থিত সরকার ক্ষমতায় থাকার পরও কেন তারা পর্যবেক্ষক পাঠাতে অনীহা দেখাচ্ছে? এটি কি কেবল নিয়ম রক্ষা, নাকি পর্দার আড়ালের কোনো রাজনৈতিক সমীকরণের অংশ?

