কেরানীগঞ্জের হাসনাবাদে একটি মাদ্রাসা ভবনে সাম্প্রতিক বিস্ফোরণ এবং সেখান থেকে উদ্ধারকৃত বিপুল পরিমাণ বোমা তৈরির সরঞ্জাম কোনো সাধারণ অপরাধ নয়। এটি মূলত গত দেড় বছর ধরে বাংলাদেশে চলতে থাকা একটি সুগভীর এবং ভয়ঙ্কর পরিণতির ইঙ্গিত। জুলাইয়ে দাঙ্গার মাধ্যমে একটি নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করা হয়েছে। বিদেশি ষড়যন্ত্রে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে যে সরকার ক্ষমতায় বসেছে, তারা আজ গণতন্ত্রের মোড়কে দেশটিকে জঙ্গিবাদের চারণভূমিতে পরিণত করছে।
হাসনাবাদের এই মাদ্রাসা ভবনটি ২০২২ সালে ভাড়া নেওয়ার পর থেকে কীভাবে এটি একটি বোমা তৈরির কারখানায় পরিণত হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্রযন্ত্র যখন ইচ্ছাকৃতভাবে চোখ বন্ধ করে রাখে, তখনই কেবল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আড়ালে এমন জঙ্গি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে ওঠা সম্ভব। ইউনূস সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে জামায়াতে ইসলামীর মতো যুদ্ধাপরাধী সংগঠনকে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে পুনর্বাসিত করা হচ্ছে। ১৯৭১-এর খুনিদের আজ নীতিনির্ধারক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার এই চেষ্টা বাংলাদেশকে একটি অস্থিতিশীল মৌলবাদী রাষ্ট্রে পরিণত করার প্রক্রিয়ারই অংশ।
ইউনুসের অবৈধ সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে সন্ত্রাস আর জঙ্গিবাদ দেশজুড়ে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা হয়েছে, তাদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে, মন্দির ভাঙা হয়েছে। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের হত্যা করা হয়েছে, তাদের বাড়িঘর লুটপাট করা হয়েছে। এসব কিছুই ঘটেছে একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার অধীনে। জামায়াত আর তার সহযোগী জঙ্গি সংগঠনগুলো এখন প্রকাশ্যে তাদের কার্যক্রম চালাচ্ছে। আর ইউনুসের সরকার নীরব দর্শক হয়ে বসে আছে, কারণ এই জঙ্গিদের সমর্থন ছাড়া তারা ক্ষমতায় থাকতে পারবে না।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের তথাকথিত ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ যে সাধারণ শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত বিদ্রোহ ছিল না, তা আজ দিবালোকের মতো পরিষ্কার। আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আব্দুল কাদেরের সাম্প্রতিক স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, ৫ আগস্ট রাতে এক জামায়াত নেতার বাসায় নাহিদ ইসলামসহ অন্যান্য সমন্বয়কদের গোপন বৈঠকের মাধ্যমেই বর্তমান রাজনৈতিক পথরেখা তৈরি হয়। সাধারণ শিক্ষার্থীদের আবেগকে ‘টোপ’ হিসেবে ব্যবহার করে মূলত জামায়াত-শিবির ও আন্তর্জাতিক অপশক্তির একটি যৌথ মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন করা হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিবিরের প্রকাশ্য আসা এবং ‘রাজাকার’ স্লোগানকে জনপ্রিয় করার মাধ্যমে অত্যন্ত সুকৌশলে তরুণ প্রজন্মের মগজ ধোলাই করা হয়েছে, যার চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধূলিসাৎ করা।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময় নরসিংদী থেকে কাশিমপুর—দেশের ১৭টি কারাগারে যেভাবে নজিরবিহীন হামলা চালিয়ে শত শত সাজাপ্রাপ্ত জঙ্গি পালিয়ে গেল, তা কোনো সাধারণ জনরোষ হতে পারে না। এটি ছিল নিখুঁত সামরিক অভিযানের মতো একটি জঙ্গি মহড়া। এর চেয়েও উদ্বেগের বিষয় হলো, ইউনূস সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর রহস্যজনকভাবে প্রায় ২০০-র বেশি দুর্ধর্ষ জঙ্গি জামিনে মুক্তি পেয়েছে। কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া ৮৮ জন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামির অধিকাংশ এখনও অধরা। এই বিচারহীনতার সংস্কৃতি প্রমাণ করে যে, সরকার আসলে সেই অপশক্তিগুলোকেই রক্ষা করছে, যারা তাদের ক্ষমতায় বসাতে সহায়তা করেছে।
শান্তির নোবেলজয়ী ড. ইউনূস আজ আন্তর্জাতিক মহলের একটি শক্তিশালী হাতের ‘প্রক্সি নেতা’ হিসেবে কাজ করছেন। পশ্চিমা কিছু দেশ বাংলাদেশকে একটি ভূ-রাজনৈতিক ‘পরীক্ষাগার’ হিসেবে ব্যবহার করতে চায়। তারা চায় বাংলাদেশ যেন ভারত থেকে দূরে সরে যায় এবং একটি অস্থিতিশীল রাষ্ট্রে পরিণত হয়, যেখানে গণতন্ত্রের পরিবর্তে থাকবে উগ্রবাদী শক্তির একচ্ছত্র আধিপত্য। আর এই কাজে ইউনূসের হাতিয়ার হয়েছে জামায়াতের মতো জঙ্গি সংগঠনগুলো। ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে গরিব মানুষের রক্ত চোষা এই ‘সুদখোর মহাজন’ আজ নিজের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে দেশের সার্বভৌমত্বকে বিদেশি প্রভুদের কাছে বিকিয়ে দিচ্ছেন।
আগামী মাসে অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আশার চেয়ে আতঙ্কই বেশি। বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন যে, এই নির্বাচনের মাধ্যমে যদি বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় আসে, তবে তা হবে জঙ্গিবাদের চূড়ান্ত পুনর্বাসন। ২০০১-২০০৬ সালের সেই ভয়াবহ স্মৃতি, শায়খ আব্দুর রহমান ও বাংলা ভাইয়ের উত্থান এবং ১৭ আগস্টের সিরিজ বোমা হামলার বিভীষিকা আজ দেশবাসীকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। বিএনপি কি আবার সেই একই পুরনো পথে হেঁটে বাংলাদেশকে একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করবে?
বাংলাদেশ আজ এক ভয়াবহ সন্ধিক্ষণে। একাত্তরের অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে পদদলিত করে জঙ্গি ও রাজাকারের বংশধরদের হাতে রাষ্ট্রের চাবিকাঠি তুলে দেওয়া হচ্ছে। হাসনাবাদের ঘটনা কেবল একটি সতর্কসংকেত মাত্র। যদি এখনই এই উগ্রবাদী শক্তির বিস্তার এবং ইউনূস সরকারের এই হঠকারী নীতি ঠেকানো না যায়, তবে অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশের অস্তিত্বই সংকটের মুখে পড়বে।

