মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে চলমান গৃহযুদ্ধের সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের সীমান্ত ও ভূ-রাজনীতিতে। টেকনাফ সীমান্ত সংলগ্ন নাফ নদে এখন দাপট দেখাচ্ছে মিয়ানমারের স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মি (এএ)। দীর্ঘ ৯ মাস ধরে টেকনাফ স্থলবন্দর অচল থাকায় সীমান্ত বাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়েছে, যার নেপথ্যে রয়েছে এই সশস্ত্র গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ। তবে বিশেষজ্ঞরা এই পরিস্থিতিকে কেবল অভ্যন্তরীণ যুদ্ধ হিসেবে দেখছেন না; বরং এর পেছনে বঙ্গোপসাগর ও সেন্টমার্টিন ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত নীলনকশা ও হস্তক্ষেপের আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সীমান্তসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, প্রায় দেড় বছর ধরে চলা যুদ্ধে রাখাইন রাজ্যের প্রায় ২৭০ কিলোমিটার সীমান্ত এলাকা বর্তমানে আরাকান আর্মির দখলে। এর ফলে নাফ নদের মিয়ানমার অংশে নৌযান চলাচল সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে গোষ্ঠীটি। অভিযোগ উঠেছে, এই সশস্ত্র গোষ্ঠীকে নেপথ্যে থেকে সমর্থন জোগাচ্ছে আমেরিকা, যা এই অঞ্চলে নতুন সমীকরণ তৈরি করছে।
ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, চীনের ক্রমবর্ধমান আধিপত্য খর্ব করতে এবং বঙ্গোপসাগরের বিশাল প্রাকৃতিক সম্পদ কবজা করতে যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলকে তাদের রণকৌশলের অংশ হিসেবে বেছে নিয়েছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার ইস্যুকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপের আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। বিশ্লেষকরা বলছেন, মিয়ানমারে চীন-সমর্থিত গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্পের বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র এই এলাকায় নিজের অবস্থান শক্ত করতে চায়। বিশেষ করে রোহিঙ্গা সংকট ও মানবিক করিডোর তৈরির অজুহাতে চট্টগ্রাম বন্দর ও সংলগ্ন এলাকায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা তাদের অন্যতম লক্ষ্য।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের কিছু অংশ নিয়ে একটি পৃথক ‘খ্রিস্টান রাষ্ট্র’ গঠনের ষড়যন্ত্রের আশঙ্কা। এই পরিস্থিতিকে অনেক বিশ্লেষক পূর্ব তিমুরের স্বাধীন হওয়ার ঘটনার সাথে তুলনা করছেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইতিপূর্বে একাধিকবার সতর্ক করে বলেছিলেন যে, বাংলাদেশকে ভেঙে ও মিয়ানমারের অংশ নিয়ে একটি বিদেশি রাষ্ট্র গঠনের চক্রান্ত চলছে। তিনি স্পষ্ট করে জানিয়েছিলেন, সেন্টমার্টিনে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের বিনিময়ে ক্ষমতায় থাকার কোনো ইচ্ছা তার নেই। বর্তমান পরিস্থিতি সেই সতর্কবার্তাকেই নতুন করে আলোচনায় নিয়ে এসেছে।
প্রতিরক্ষা ও ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নাফ নদে আরাকান আর্মির দাপট কেবল বাংলাদেশের নিরাপত্তার জন্যই হুমকি নয়, বরং এটি একটি বৃহত্তর আন্তর্জাতিক চক্রান্তের অংশ। তাদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, “যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় নিজেদের সামরিক উপস্থিতি নিশ্চিত করতে চায়। আরাকান আর্মিকে সমর্থন দেওয়ার মাধ্যমে তারা মূলত মিয়ানমার ও বাংলাদেশের সীমান্ত অঞ্চলে একটি অস্থিতিশীল পরিবেশ টিকিয়ে রাখতে আগ্রহী, যাতে ভবিষ্যতে ‘মানবিক হস্তক্ষেপ’ বা ‘শান্তি রক্ষার’ নাম করে এই অঞ্চলে নিজেদের ঘাঁটি গেড়ে বসতে পারে। এটি সফল হলে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব এবং আঞ্চলিক অখণ্ডতা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়বে।”

