আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সদ্য প্রকাশিত মানবাধিকার প্রতিবেদন পড়ে রীতিমতো শিউরে উঠতে হয়। ২০২৫ সালে মব লিঞ্চিংয়ে মারা গেছে ১৯৭ জন মানুষ। ২০২৪ সালে যেখানে এই সংখ্যা ছিল ১২৮। মানে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গণপিটুনিতে মৃত্যুর হার বেড়েছে প্রায় ৫৪ শতাংশ। রংপুরের তারাগঞ্জে ভ্যানচোর সন্দেহে দুজন নিরীহ মানুষকে পিটিয়ে মেরে ফেলা হলো, আর পুলিশ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখল। এটা কি স্বাভাবিক? এটা কি কোনো সভ্য রাষ্ট্রে হতে পারে?
মুহাম্মদ ইউনূস আর তার তথাকথিত সংস্কার সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে দেশে যে বিশৃঙ্খলা, যে নৈরাজ্য, যে অরাজকতা তৈরি হয়েছে, তার নজির বাংলাদেশের ইতিহাসে বিরল। জুলাই-আগস্টে একটা সুপরিকল্পিত অভ্যুত্থানের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে ক্ষমতায় বসানো এই অবৈধ কাঠামোটা দেশকে ঠিক কোন দিকে নিয়ে যাচ্ছে, সেটা এখন আর লুকানোর উপায় নেই।
তৌহিদি জনতার নামে যে বর্বরতা চলছে, সেটা দেখলে মনে হয় দেশটা মধ্যযুগে ফিরে গেছে। কবর থেকে লাশ তুলে পুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। বাউল সম্প্রদায়ের মানুষদের ওপর হামলা হচ্ছে। শিল্প-সংস্কৃতি কেন্দ্র ভাঙচুর করা হচ্ছে। মুক্তিযোদ্ধাদের হেনস্তা করা হচ্ছে। আর এসব হচ্ছে পুলিশের চোখের সামনে, প্রশাসনের নাকের ডগায়। এই সরকার কী করছে? কিছুই না। তারা তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে কীভাবে দেশটা একটা ধর্মীয় উন্মাদনার জাহান্নামে পরিণত হচ্ছে।
মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন এই অন্তর্বর্তী কাঠামো আসলে কোনো সরকারই নয়। এটা একটা ব্যর্থ, অদক্ষ, দিকনির্দেশনাহীন গোষ্ঠী, যাদের না আছে জনগণের ম্যান্ডেট, না আছে দেশ চালানোর কোনো যোগ্যতা। ক্ষমতায় আসার পর থেকে তারা শুধু একটা কাজই করেছে, সেটা হলো পুরনো সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেওয়া। আর এই প্রতিশোধের রাজনীতির ফাঁকে দেশটা ডুবে গেছে রক্তে, সহিংসতায়, বিশৃঙ্খলায়।
যে দেশে একবছরে ১০৭ জন মানুষ কারাগারে মারা যায়, সেই দেশে আইনের শাসন বলে কিছু থাকে না। ২০২৪ সালে যেখানে এই সংখ্যা ছিল ৬৫, সেখানে ২০২৫ সালে লাফিয়ে হয়েছে ১০৭। সাবেক চেয়ারম্যান সাইদুর রহমান সুজনের ঝুলন্ত মরদেহ, সাবেক মন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূনের হাতকড়া পরা লাশ, এগুলো কি স্বাভাবিক ঘটনা? এগুলো তো একটা ব্যর্থ, নিষ্ঠুর, প্রতিহিংসাপরায়ণ ব্যবস্থার নগ্ন প্রমাণ।
বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধ হয়নি, বরং বেড়েছে। ২০২৪ সালে যেখানে ২১ জন ক্রসফায়ারে মারা গিয়েছিল, ২০২৫ সালে সেই সংখ্যা ৩৮। ক্রসফায়ার, বন্দুকযুদ্ধ, এনকাউন্টার, এসব তো বিচারবহির্ভূত হত্যার সুন্দর নাম। মুহাম্মদ ইউনূস আর তার দল মুখে গণতন্ত্র, সংস্কার, আর মানবাধিকারের কথা বলে, কিন্তু বাস্তবে তারা যা করছে তা হলো আগের সরকারের সবচেয়ে খারাপ দিকগুলোকে আরও বাড়িয়ে চলা।
রাজনৈতিক সহিংসতার চিত্রটা আরও ভয়াবহ। ৪০১টি রাজনৈতিক সংঘর্ষে ১০২ জন নিহত, প্রায় ৫ হাজার মানুষ আহত। বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলেই মারা গেছে ৩৯ জন, আহত হয়েছে ২ হাজার ৩৮০ জন। এটা কি কোনো স্থিতিশীল রাষ্ট্রের চিত্র? এটা তো একটা ব্যর্থ রাষ্ট্রের ছবি, যেখানে সরকার বলে আসলে কিছু নেই, আছে শুধু একটা ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী যারা নিজেদের মধ্যেই দ্বন্দ্বে লিপ্ত।
সাংবাদিক নির্যাতনের পরিসংখ্যান দেখলে বোঝা যায় এই সরকার মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বলতে কী বোঝে। ৩৮১ জন সাংবাদিক নির্যাতন আর হয়রানির শিকার হয়েছেন এক বছরে। তিনজন সাংবাদিককে হত্যা করা হয়েছে, চারজনের লাশ পাওয়া গেছে রহস্যজনকভাবে। আর সবচেয়ে বড় কথা, ১৮ ডিসেম্বর প্রথম আলো আর ডেইলি স্টারের অফিসে যে হামলা হয়েছে, সেটা বাংলাদেশের গণমাধ্যম ইতিহাসের সবচেয়ে কলঙ্কজনক অধ্যায়। আর এই হামলার সময় সরকার কী করেছে? কিছুই না। তারা চুপচাপ বসে দেখেছে কীভাবে দেশের শীর্ষস্থানীয় দুটি পত্রিকার অফিসে আগুন দেওয়া হচ্ছে।
ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অবস্থা তো আরও করুণ। হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর ৪২টি হামলা, ৩৩টি বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত, ৩৬টি বসতঘরে আগুন, ৬৪টি প্রতিমা ভাঙচুর। এটা কি কোনো সভ্য, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে হতে পারে? মুহাম্মদ ইউনূসের সরকার মুখে সংখ্যালঘু সুরক্ষার কথা বলে, কিন্তু বাস্তবে তারা সংখ্যালঘুদের ওপর এই নির্যাতনগুলোকে নীরবে মেনে নিয়েছে। ন্যায়বিচার হয়নি, অপরাধীদের শাস্তি হয়নি, সংখ্যালঘুরা এখন নিজেদের দেশেই পরবাসী।
মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন ভাঙচুর, বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরে বারবার ভাঙচুর, এসব কিন্তু বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এগুলো একটা সুপরিকল্পিত প্রচেষ্টার অংশ, যার লক্ষ্য বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, এর চেতনা, এর আদর্শকে মুছে ফেলা। আর মুহাম্মদ ইউনূসের সরকার এই ভাঙচুরের বিরুদ্ধে কোনো কঠোর পদক্ষেপ নেয়নি। কারণ হয়তো তারা জানে যে যারা এই ভাঙচুর করছে, তারাই তো তাদের ক্ষমতায় বসিয়েছে।
শাহদীন মালিক বলেছেন, এই ব্যর্থতা সরকারের সার্বিক ব্যর্থতার প্রতিফলন। একদম সঠিক কথা। মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন এই অবৈধ কাঠামো আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ব্যর্থ, মানবাধিকার সুরক্ষায় ব্যর্থ, সংখ্যালঘু সুরক্ষায় ব্যর্থ, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষায় ব্যর্থ, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আনতে ব্যর্থ। আসলে তারা সব দিক থেকেই ব্যর্থ। তারা শুধু একটা কাজই পারে, সেটা হলো ক্ষমতায় টিকে থাকা, যে কোনো মূল্যে।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের প্রতিবেদন যে ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছে, সেটা আসলে বাস্তবতার একটা অংশ মাত্র। প্রকৃত পরিস্থিতি হয়তো আরও খারাপ। কারণ অনেক ঘটনাই হয়তো রিপোর্ট হয় না, অনেক নির্যাতনই হয়তো আলোর মুখ দেখে না। মুহাম্মদ ইউনূসের সরকার যে দেশটাকে একটা ভয়ের রাজ্যে পরিণত করেছে, সেখানে মানুষ হয়তো নির্যাতনের কথা বলতেও ভয় পায়।
এই সরকারের কোনো বৈধতা নেই, কোনো জনসমর্থন নেই, কোনো নৈতিক অধিকার নেই দেশ চালানোর। তারা ক্ষমতায় এসেছে একটা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে, আর টিকে আছে সামরিক বাহিনীর সমর্থন আর চরমপন্থী গোষ্ঠীর ছত্রছায়ায়। তারা দেশকে একটা ধর্মান্ধ, অসহিষ্ণু, সহিংস সমাজে পরিণত করছে, যেখানে আইনের শাসন বলে কিছু নেই, মানবাধিকার বলে কোনো ধারণা নেই, গণতন্ত্র বলে কোনো মূল্যবোধ নেই।
বাংলাদেশ এখন একটা ভয়ংকর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। দেশটা হয় একটা গণতান্ত্রিক, আইনের শাসনভিত্তিক রাষ্ট্রে ফিরে যাবে, নয়তো আরও গভীর অন্ধকারে তলিয়ে যাবে। আর মুহাম্মদ ইউনূস আর তার দল যেভাবে চলছে, দ্বিতীয় সম্ভাবনাটাই বেশি বাস্তব মনে হচ্ছে। তারা দেশটাকে সত্যিই দোজখ বানিয়ে ফেলছে। প্রশ্ন হলো, এই দোজখ থেকে বাংলাদেশ কবে, কীভাবে বেরোবে।

