বাংলাদেশে এখন এক অদ্ভুত পরিস্থিতি চলছে। যে জঙ্গিদের সংগঠিত তৎপরতার মধ্য দিয়ে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে দেশব্যাপী সহিংসতা ছড়িয়ে একটি নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করা হয়েছিল, সেই জঙ্গিদের বিরুদ্ধে এখন কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেই। কারাগার ভেঙে পালিয়ে যাওয়া ছয়জন সাজাপ্রাপ্ত জঙ্গি এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। প্রায় ২০০ জঙ্গি জামিনে মুক্তি পেয়ে হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে। আর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অবৈধ সরকার এ নিয়ে কোনো মাথাব্যথা দেখাচ্ছে না। এটা আশ্চর্যের কিছু নয়। যে মই বেয়ে উঠেছেন, সেই মই কি তিনি নিজেই সরিয়ে ফেলবেন?
গত বছরের জুলাই-আগস্টের সহিংসতায় দেশের ১৭টি কারাগার আক্রান্ত হয়েছিল। ছয়টি কারাগার মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পাঁচটি কারাগার থেকে পালিয়ে গিয়েছিল ২২৩২ জন বন্দি, যার মধ্যে ৮৮ জন ছিল মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত। এই সুপরিকল্পিত হামলার পেছনে যে একটি সংগঠিত শক্তি ছিল, তা নিয়ে এখন আর কারো কোনো সন্দেহ নেই। নরসিংদী কারাগারে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ৮২৬ জন বন্দি ছাড়িয়ে নেওয়া, শেরপুর থেকে ৫১৮ জন আর কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কারাগার থেকে ২০৯ জন দুর্ধর্ষ অপরাধী মুক্ত করা – এসব ঘটনা কোনো স্বতঃস্ফূর্ত জনরোষের ফল ছিল না। এগুলো ছিল পরিকল্পিত সামরিক অভিযান।
আর এই অভিযানের সুবিধাভোগী এখন ক্ষমতায় বসে আছেন। ইউনূস সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রথম কাজ হিসেবে যা করেছে, তা হলো এই জঙ্গিদের জামিন দেওয়া। জামিনে বেরিয়ে গেছে জেএমবির ১৪৮ জন সদস্য, আনসারুল্লাহ বাংলা টিম, হিজবুত তাহরীর, আনসার আল ইসলামসহ নানা জঙ্গি সংগঠনের মোট প্রায় ২০০ জন সদস্য। ব্লগার রাজিব হায়দার হত্যা মামলায় দণ্ডিত আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের কথিত প্রধান জসিম উদ্দিন রাহমানীও মুক্তি পেয়েছেন। মুক্তি পেয়ে তিনি বলেছেন, আনসারুল্লাহ বাংলা টিম বলে কিছুই ছিল না। এই অদ্ভুত যুক্তি দিয়ে একজন খুনি খালাস পেয়ে গেলেন, আর সরকারের কোনো মাথাব্যথা নেই।
ইউনূসের অবস্থান থেকে দেখলে বিষয়টা পরিষ্কার হয়। তিনি ক্ষমতায় এসেছেন একটি অভ্যুত্থানের মাধ্যমে, যেখানে মূল ভূমিকা পালন করেছে জঙ্গি সংগঠন আর তাদের বিদেশি প্রভুরা। সামরিক বাহিনীর একটি অংশও এই ষড়যন্ত্রে জড়িত ছিল। এখন তিনি যদি তার মিত্রদের বিরুদ্ধে কঠোর হন, তাহলে নিজের ক্ষমতার ভিত্তিই নড়বড়ে হয়ে যাবে। তাই জঙ্গিবিরোধী অভিযান স্থগিত রাখা তার জন্য রাজনৈতিক প্রয়োজন।
গত দেড় বছরে দেখা গেছে, এটিইউ বা ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিট থেকে কোনো বড় জঙ্গিবিরোধী অভিযান হয়নি। গোয়েন্দা নজরদারি শিথিল হয়ে পড়েছে। এর ফল হাতেনাতে পাওয়া গেল কেরানীগঞ্জের হাসনাবাদে উম্মুল কুরা ইন্টারন্যাশনাল মাদ্রাসায় বিস্ফোরণের ঘটনায়। মাদ্রাসার পরিচালক শেখ আল আমিন, যার বিরুদ্ধে নব্য জেএমবির সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে, এখন আত্মগোপনে। পুলিশ তাকে ধরতে পারছে না, অথবা ধরতে চাইছে না।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা সতর্ক করে দিয়েছেন যে বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ সমস্যা কেবল অমীমাংসিতই নয়, বরং আরো জটিল হয়ে উঠেছে। কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া জঙ্গিরা এখন মাঠে সক্রিয়। তাদের হাতে রয়েছে কারাগার থেকে লুট করা ১৮টি আগ্নেয়াস্ত্র আর বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ। জামিনে বেরিয়ে যাওয়া ২০০ জনের হালনাগাদ অবস্থান সম্পর্কে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে কোনো তথ্য নেই। এরা এখন কোথায়, কী করছে, কীভাবে নিজেদের সংগঠিত করছে – এসব নিয়ে সরকারের মাথাব্যথা নেই বললেই চলে।
যেসব জঙ্গি এখন মুক্ত, তাদের অনেকেই দেশের ভয়াবহতম সন্ত্রাসী হামলার সঙ্গে যুক্ত। এরা শুধু আদর্শিকভাবে উগ্রই নয়, প্রশিক্ষিত এবং অভিজ্ঞ যোদ্ধা। এদের একটা বড় অংশ বিদেশি জঙ্গি নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত। আর এখন তারা একটি সরকারের ছত্রছায়ায় স্বাধীনভাবে তাদের কার্যক্রম চালাতে পারছে। এর চেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি আর কী হতে পারে?
ইউনূস সরকারের কাছে জঙ্গি দমনের দাবি করা মূলত একটা হাস্যকর প্রস্তাব। এই সরকার নিজেই জঙ্গিদের উত্থানের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। জুলাইয়ের সহিংসতায় যেসব জঙ্গি সংগঠন সক্রিয় ছিল, তারাই এখন সরকারের অলিখিত মিত্র। তাদের সামরিক প্রশিক্ষণ, তাদের সাংগঠনিক দক্ষতা, তাদের মরণপণ তৎপরতাই তো এই সরকারকে ক্ষমতায় বসিয়েছে। এখন সেই মিত্রদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব নয়, আর প্রয়োজনও নেই।
বরং উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে। জামিনে বেরিয়ে আসা জঙ্গিরা এখন সমাজে স্বাভাবিকভাবে মিশে যাচ্ছে। তাদের কেউ কেউ আবার নিজেদের সংগঠন পুনর্গঠিত করছে। নতুন সদস্য সংগ্রহ করছে। অর্থ সংগ্রহ করছে। আর সরকার চুপচাপ তাকিয়ে দেখছে। কারণ এই জঙ্গিরাই তো তাদের শক্তির উৎস। এরা যদি আবার রাস্তায় নামে, তাহলে সরকার টিকে থাকবে। এরা যদি শান্ত থাকে, তাহলেও সরকার নিরাপদ। কিন্তু এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে সরকারের নিজের অস্তিত্বই বিপন্ন হবে।
দেশের মানুষ এখন একটা অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। যেসব জঙ্গি সংগঠন এতদিন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চাপে দুর্বল হয়ে পড়েছিল, তারা এখন নতুন করে শক্তি সঞ্চয় করছে। যারা দীর্ঘদিন জেলে ছিল, তারা এখন মুক্ত। যারা পালিয়ে গিয়েছিল, তাদের খোঁজ নেওয়ার কেউ নেই। আর সবচেয়ে বড় কথা, যে সরকার ক্ষমতায় আছে, সেই সরকারই জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নিতে আগ্রহী নয়।
ইউনূস সরকার যে বিদেশি অর্থায়নে টিকে আছে, সেটা এখন আর কোনো গোপন বিষয় নয়। যেসব দেশ তাদের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থে বাংলাদেশে অস্থিরতা চায়, তারাই এই সরকারের পৃষ্ঠপোষক। আর জঙ্গিবাদ হলো সেই অস্থিরতা সৃষ্টির সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার। তাই জঙ্গিদের নিয়ন্ত্রণে রাখা, তাদের মুক্তি দেওয়া, তাদের তৎপরতায় চোখ বন্ধ রাখা – এসব এই সরকারের সচেতন নীতির অংশ।
সামরিক বাহিনীর একটি অংশ যেভাবে এই পুরো ষড়যন্ত্রে জড়িত ছিল, সেটাও এখন স্পষ্ট। জুলাইয়ের ঘটনাবলীতে সেনাবাহিনীর ভূমিকা নিয়ে অনেক প্রশ্ন রয়ে গেছে। কেন তারা সময়মতো হস্তক্ষেপ করেনি? কেন কারাগার ভাঙার মতো গুরুতর ঘটনায় তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি? এসব প্রশ্নের উত্তর এখন স্পষ্ট। কারণ পুরো অভিযানটাই ছিল সমন্বিত, আর সামরিক বাহিনীর কিছু অংশ এতে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিল।
এখন যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা দেশের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। একদিকে রাজনৈতিক অস্থিরতা, অন্যদিকে অর্থনৈতিক সংকট, আর তার ওপর জঙ্গিবাদের নতুন উত্থান। এই তিনটি মিলে যে বিস্ফোরক পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, তার জন্য দেশ মোটেও প্রস্তুত নয়। আর যে সরকারের কাছ থেকে এই বিপদ মোকাবেলার নেতৃত্ব পাওয়ার কথা, সেই সরকারই এই বিপদের অংশীদার।
কারাগার থেকে যেসব অস্ত্র লুট হয়েছে, সেগুলো এখন কোথায়? কার হাতে? কীভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার কোনো উদ্যোগ নেই। পালিয়ে যাওয়া ৭০০ বন্দি, যাদের মধ্যে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত খুনি, ধর্ষক, মাদক ব্যবসায়ী আর জঙ্গি রয়েছে, তারা এখন কোথায়? তাদের খোঁজ করার দায়িত্ব কার? সরকার এসব প্রশ্ন এড়িয়ে যাচ্ছে কারণ এগুলোর উত্তর দিলে তাদের নিজেদের ভূমিকা প্রকাশ হয়ে পড়বে।
বাংলাদেশ এখন একটা সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। এক দশক ধরে যে জঙ্গিবাদ দমনে সাফল্য এসেছিল, তা এখন হুমকির মুখে। যে সংগঠনগুলো ভেঙে পড়েছিল, তারা নতুন করে শক্তি সঞ্চয় করছে। আর সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, এই উত্থানে রাষ্ট্রযন্ত্রের একটা অংশ সক্রিয়ভাবে সহায়তা করছে। যে সরকার জনগণের নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্ব নিয়ে ক্ষমতায় বসে, সেই সরকারই জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অনাগ্রহী। এর চেয়ে বিপজ্জনক পরিস্থিতি আর কী হতে পারে?
দেশের মানুষের এখন বুঝে নেওয়া দরকার যে যে সরকার জঙ্গিদের ছাড়িয়ে ক্ষমতায় এসেছে, সেই সরকার কখনোই জঙ্গিদের বিরুদ্ধে কঠোর হবে না। এটা আশা করাই বোকামি।

