এই প্রজন্মের বড় একটি অংশ জানে না কেন সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে তারেক রহমান ১৮ মাস কারাবন্দি ছিলেন, কেন তার ওপর শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছিল, কেন মুচলেকা দিয়ে তাকে দেশ ছাড়তে হয়েছিল এবং কেন সেই সময় বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে “দুর্নীতির চ্যাম্পিয়ন” রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছিল। এসব প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের বিএনপি–জামায়াত জোট সরকারের শাসনামলে গড়ে ওঠা একটি প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি ও রাষ্ট্রীয় অপশাসনের কাঠামোর ভেতরে।
সে সময় “হাওয়া ভবন” নামে পরিচিত একটি অঘোষিত ক্ষমতাকেন্দ্র প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের বাইরে রাষ্ট্র পরিচালনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়, যার নেতৃত্বে ছিলেন তারেক রহমান। সরকারি নিয়োগ, বদলি, ঠিকাদারি, বড় প্রকল্পের অনুমোদন—সবকিছুই নির্ধারিত হতো এই হাওয়া ভবন থেকে। নির্বাচিত সরকার থাকা সত্ত্বেও রাষ্ট্র কার্যত পরিচালিত হয়েছে একটি পারিবারিক ও দলীয় ছায়া-কেন্দ্রের নির্দেশে, যা সাংবিধানিক শাসনব্যবস্থাকে সম্পূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
২০০৪ সালের ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগের শান্তিপূর্ণ সমাবেশে গ্রেনেড হামলা সেই সময়ের রাষ্ট্রীয় সহিংসতার সবচেয়ে ভয়াবহ দৃষ্টান্ত। শেখ হাসিনাকে লক্ষ্য করে চালানো ওই হামলায় আইভি রহমানসহ ২৪ জন নিহত হন এবং শতাধিক মানুষ আহত হন। পরবর্তী বিচারিক প্রক্রিয়ায় এটি স্পষ্ট হয় যে, এই হামলা কোনো বিচ্ছিন্ন সন্ত্রাসী ঘটনা ছিল না; বরং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ভেতরে থাকা শক্তির প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রশ্রয়ে সংঘটিত একটি রাজনৈতিক হত্যাচেষ্টা।
একই সময়ে চট্টগ্রামের বিএম ডিপোতে ধরা পড়ে “১০ ট্রাক অস্ত্র”—বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় অস্ত্র চোরাচালানের ঘটনা। তদন্তে উঠে আসে, এসব অস্ত্র ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন ULFA-র কাছে পাঠানোর প্রস্তুতি চলছিল এবং এতে সরকারের গোয়েন্দা সংস্থা, শীর্ষ মন্ত্রী ও জোট সরকারের প্রভাবশালী মহলের সংশ্লিষ্টতা ছিল। এই ঘটনা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তাকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
দুর্নীতির আরেক বড় উদাহরণ ছিল নাইকো গ্যাস চুক্তি ও কয়লা খনি কেলেঙ্কারি। কানাডীয় কোম্পানি নাইকোর সঙ্গে করা চুক্তিতে রাষ্ট্রের হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়, পরিবেশ ধ্বংস হয় এবং অবৈধ সুবিধা দেওয়া হয় বলে অভিযোগ ওঠে। এসব মামলায় খালেদা জিয়াসহ বিএনপি সরকারের উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিরা অভিযুক্ত হন, যা সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে দুর্নীতির গভীরতা প্রকাশ করে।
এই সময় ‘টু-ইন-ওয়ান’ বা একাধিক মন্ত্রণালয়ের একক দখলদারিত্ব ছিল সাধারণ চিত্র। বড় বড় প্রকল্পে ১০ থেকে ২০ শতাংশ কমিশনের অভিযোগ ছিল প্রকাশ্য গোপন বিষয়। রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন প্রকল্প পরিণত হয় ঘুষ ও কমিশন বাণিজ্যের উৎসে, আর জনগণের অর্থ লুটপাটের মাধ্যমে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা শক্তিশালী করা হয়।
শিক্ষা ও প্রশাসনেও দলীয়করণ ছিল চরম পর্যায়ে। বিসিএসসহ সরকারি নিয়োগে বিএনপি–জামায়াতপন্থীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়, অন্যদিকে আওয়ামী লীগ সমর্থকদের চাকরি, পদোন্নতি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়োগ থেকে পরিকল্পিতভাবে বঞ্চিত করা হয়। মেধা ও যোগ্যতার পরিবর্তে রাজনৈতিক পরিচয়ই হয়ে ওঠে রাষ্ট্রীয় সুযোগ পাওয়ার প্রধান শর্ত।
এই প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির স্বীকৃতি আসে আন্তর্জাতিক পরিসরে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের রিপোর্ট অনুযায়ী ২০০১ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত টানা পাঁচ বছর বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে চিহ্নিত হয়। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ব্যর্থতা নয়, বরং রাষ্ট্রীয়ভাবে দুর্নীতিকে বৈধ ও সংগঠিত করার ফল।
একই সঙ্গে জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের পৃষ্ঠপোষকতায় যুদ্ধাপরাধীদের দোসররা সিমেন্ট, টেলিকম ও বাণিজ্য খাতে শক্তিশালী ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য গড়ে তোলে। রাজনীতি ও অর্থনীতি একে অপরের সঙ্গে এমনভাবে জড়িয়ে যায় যে, যুদ্ধাপরাধ ও অর্থনৈতিক লুটপাট একই কাঠামোর অংশ হয়ে ওঠে।
উন্নয়ন ক্ষেত্রেও এই সরকার ছিল স্থবির ও অনীহাপূর্ণ। ১৯৯৬ সালে পরিকল্পিত পদ্মা সেতু, রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্প ও বঙ্গবন্ধু টানেলের মতো মেগা প্রকল্পগুলো বিএনপি সরকারের আমলে কার্যত থমকে যায় বা বাতিল হয়। ফলে বাংলাদেশ উন্নয়নের সম্ভাবনাময় একাধিক পথ থেকে পিছিয়ে পড়ে।
সব মিলিয়ে ২০০১–২০০৬ সালের বিএনপি–জামায়াত জোট সরকার ছিল দুর্নীতির প্রাতিষ্ঠানিক যুগ, রাষ্ট্রীয় সহিংসতার সময়কাল এবং উন্নয়নবিরোধী শাসনের প্রতিচ্ছবি। এই সময়ে বাংলাদেশ অন্তত কয়েক দশক পিছিয়ে যায়। ইতিহাস বিকৃত হলে বা ভুলে গেলে তার পুনরাবৃত্তি অনিবার্য—এই অধ্যায়গুলো নতুন প্রজন্মের স্মৃতিতে জীবিত রাখাই আজ সবচেয়ে জরুরি।

