বাংলাদেশে গত ১৮ ডিসেম্বর প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টার কার্যালয়ে ভয়াবহ হামলা এবং সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ছায়ানট-এ ভাঙচুরের ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছে সাতটি আন্তর্জাতিক সংগঠন। এই ঘটনাগুলোকে বাংলাদেশের মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর এক চরম হুমকি হিসেবে অভিহিত করেছে তারা।
সোমবার (২৩ ডিসেম্বর) ইস্যু করা এক যৌথ বিবৃতিতে সংগঠনগুলো জানায়, দক্ষিণ এশিয়ার শীর্ষস্থানীয় দুটি গণমাধ্যম এবং বাংলাদেশের অন্যতম সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের ওপর এই দৃশ্যত ‘সমন্বিত’ হামলাগুলো স্বাধীন গণমাধ্যম, সাংবাদিক, অধিকারকর্মী এবং সাংস্কৃতিক অঙ্গনের ওপর সহিংসতার এক গুরুতর উসকানি।
যৌথ বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারী সংগঠনগুলো হলো: অ্যাক্সেস নাও , বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট), হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ), ইন্টারন্যাশনাল ট্রুথ অ্যান্ড জাস্টিস প্রজেক্ট (আইটিজেপি), জার্নালিস্টস ফর ডেমোক্রেসি ইন শ্রীলঙ্কা (জেডিএস) এবং টেক গ্লোবাল ইনস্টিটিউট (টিজিআই)।
বিবৃতিতে ওই একই রাতে ময়মনসিংহের ভালুকায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগে দীপু চন্দ্র দাস নামের এক ব্যক্তিকে জনসমক্ষে পিটিয়ে ও পুড়িয়ে হত্যার খবরে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। সংগঠনগুলো বলেছে, “দীপু চন্দ্র দাসকে জনসমক্ষে পিটিয়ে ও পুড়িয়ে মারার নির্ভরযোগ্য প্রতিবেদনে আমরা গভীরভাবে শঙ্কিত।”
২০২৪-এর জুলাই অভ্যুত্থানের অন্যতম নেতা ও রাজনৈতিক কর্মী শরিফ ওসমান হাদি নিহত হওয়ার পরই এই সহিংসতার ঘটনাগুলো ঘটে। হাদি গত ১২ ডিসেম্বর ঢাকায় গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন এবং ১৮ ডিসেম্বর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।
সংগঠনগুলো উল্লেখ করেছে যে, যাচাইকৃত তথ্য অনুযায়ী প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টার-এর অগ্নিদগ্ধ কার্যালয়ের ভেতরে সাংবাদিক ও কর্মীরা আটকা পড়েছিলেন, যা তাদের জীবনের জন্য সরাসরি হুমকি ছিল। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “এ ধরনের পরিস্থিতিতে দ্রুত ও কার্যকরভাবে সাড়া দিতে ব্যর্থ হওয়া জীবনের সুরক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের মৌলিক কর্তব্যের লঙ্ঘন।”
সংবাদপত্র দুটির অনলাইন ও ছাপা সংস্করণ সাময়িকভাবে বন্ধ করতে বাধ্য হওয়াকে বাংলাদেশের গণমাধ্যম জগতের জন্য এক ‘নজিরবিহীন বিপর্যয়’ হিসেবে বর্ণনা করেছে তারা।
ছায়ানটে হামলার বিষয়ে বলা হয়েছে, এটি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি ক্রমবর্ধমান বৈরিতা এবং শিল্পচর্চার জন্য একটি অনিরাপদ পরিবেশের ইঙ্গিত দেয়। সংগঠনগুলো সতর্ক করে বলেছে যে, অনলাইন ও অফলাইন সহিংসতার এক বিপজ্জনক সমন্বয় ঘটছে, যার প্রমাণ সারা বছর ধরে হওয়া বাউল, সাংবাদিক ও শিল্পীদের ওপর হওয়া হামলাগুলো।
বিবৃতিতে অভিযোগ করা হয়েছে, অনেক হামলাই অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া ঘৃণা এবং সহিংসতার সরাসরি ডাকের মাধ্যমে প্ররোচিত হয়েছে, যা প্রায়ই বিপুল অনুসারী থাকা প্রভাবশালী ব্যক্তিরা ছড়িয়েছেন। এ ক্ষেত্রে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ব্যর্থতা এবং রাষ্ট্রের অপর্যাপ্ত পদক্ষেপের সমালোচনা করা হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রস্তাবিত সাইবার আইন সংস্কারের বিষয়টি উল্লেখ করে সংগঠনগুলো বলেছে, ডিজিটাল মাধ্যমে সহিংসতার উসকানি বন্ধে এখনও বড় ধরনের প্রয়োগিক ঘাটতি রয়েছে। বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন (আইসিসিপিআর) এবং নিজস্ব সংবিধান অনুযায়ী মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তা রক্ষায় দায়বদ্ধ।
বিবৃতিতে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি নিচের দাবিগুলো জানানো হয়েছে: সাংবাদিক, গণমাধ্যমকর্মী এবং সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য অবিলম্বে কার্যকর সুরক্ষা নিশ্চিত করা; হামলার ঘটনাগুলোর দ্রুত, স্বাধীন ও স্বচ্ছ তদন্ত করা এবং পরিকল্পনাকারী ও হামলাকারীদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা; অনলাইনে ঘৃণা ছড়ানো বন্ধে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর সাথে কাজ করা; গণমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের ওপর সব ধরনের সহিংসতার প্রকাশ্যে নিন্দা জানানো; ২০২৬ সালের নির্বাচনের আগে সাংবাদিকতা ও নাগরিক অংশগ্রহণের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা ও জাতীয় আইন ও নীতিমালাকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা।
বিবৃতি শেষে সংগঠনগুলো জানায়, তারা বাংলাদেশের সাংবাদিক, শিল্পীদের সাথে সংহতি প্রকাশ করছে এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও জবাবদিহিতা রক্ষায় তাদের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করছে।

