ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মসজিদ প্রাঙ্গণে কাজী নজরুল ইসলামের সমাধির পাশেই শুইয়ে দেওয়া হলো ওসমান হাদিকে। এই হাদি, যিনি ছায়ানট ভাঙচুরের সমর্থক, ভারতবিদ্বেষী ইনকিলাব মঞ্চের নেতা। যে মানুষটা সারাজীবন সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লড়েছেন, যিনি লিখেছেন “মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান”, তার পাশেই শায়িত করা হলো এমন একজনকে যার অনুসারীরা রবীন্দ্রনাথের বই পুড়িয়েছে, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করেছে।
এই ঘটনা শুধু একটি সমাধি স্থাপনের বিষয় নয়। এটি প্রতীকী আক্রমণ। বাংলাদেশে যে অবৈধ ক্ষমতা দখলকারী সরকার এখন বসে আছে, তারা পরিকল্পিতভাবে দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে মুছে ফেলার কাজে নেমেছে। ইউনূস এবং তার মদদপুষ্ট জামায়াতে ইসলামীসহ জঙ্গি সংগঠনগুলো দেশটাকে এমন এক অন্ধকারে ঠেলে দিচ্ছে যেখান থেকে ফিরতে হয়তো কয়েক প্রজন্ম লেগে যাবে।
জুলাই মাসে যে দাঙ্গা বাঁধানো হয়েছিল, সেটা কোনো ছাত্র আন্দোলন ছিল না। সেটা ছিল সুপরিকল্পিত অভ্যুত্থান, যার পেছনে ছিল বিদেশি অর্থায়ন, সামরিক বাহিনীর একাংশের মদদ আর জঙ্গি সংগঠনগুলোর সক্রিয় অংশগ্রহণ। নির্বাচিত সরকারকে সরিয়ে ক্ষমতায় বসানো হয়েছে একজন সুদী মহাজনকে, যার একমাত্র যোগ্যতা হচ্ছে পশ্চিমা শক্তির কাছে গ্রহণযোগ্যতা। আর সেই মহাজন এখন দেশটাকে তুলে দিচ্ছে সেই সব শক্তির হাতে যারা একাত্তরে বাংলাদেশের জন্মের বিরোধিতা করেছিল।
হাদির মৃত্যুর পরে যা ঘটেছে, সেটা আরও ভয়ংকর। প্রথম আলো আর ডেইলি স্টারের মতো সংবাদপত্রের অফিসে হামলা হয়েছে, আগুন দেওয়া হয়েছে। ছায়ানট আর উদীচীর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো যারা দশকের পর দশক ধরে বাংলার সংস্কৃতি লালন করে এসেছে, তাদের ভবন ধ্বংস করা হয়েছে। আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে হামলা হয়েছে। আর এসবের মধ্যে ইউনূস সাহেব শুধু আবেদন করেছেন শান্ত থাকার জন্য। কিন্তু যখন উত্তেজিত জনতা বলে চালিয়ে দেওয়া জঙ্গি ক্যাডাররা পুরো রাত ধরে ভাঙচুর চালিয়ে গেছে, তখন পুলিশ কোথায় ছিল? র্যাব কোথায় ছিল? সামরিক বাহিনী কোথায় ছিল? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আসলে সবাই জানে।
নজরুলের পরিবার এখন ভয়ে আছেন যে পরবর্তীতে কবির সমাধির ওপরেই হয়তো আক্রমণ হবে। এই আশঙ্কা অমূলক নয়। যারা জীবিত মানুষের ওপর আক্রমণ করতে পারে, সংবাদপত্র পুড়িয়ে দিতে পারে, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ভাঙচুর করতে পারে, তারা একটা সমাধির প্রতি সম্মান দেখাবে, এমন আশা করাটাই বোকামি। নজরুল যে বাংলাদেশের জাতীয় কবি, তার সমাধি যে পবিত্র স্থান, সেসব কথা এই জঙ্গি মানসিকতার মানুষদের কাছে কোনো মূল্যই রাখে না।
এই অবৈধ সরকার আসলে সরকার নয়, এটা একটা দখলদার গোষ্ঠী। জামায়াতে ইসলামী যারা একাত্তরে পাকিস্তানের পক্ষে দাঁড়িয়েছিল, যাদের হাতে রক্ত মাখা, তারা এখন রাষ্ট্রক্ষমতার অংশীদার। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার যারা ঠেকাতে চেয়েছিল, তারা এখন দেশ চালাচ্ছে। আর তাদের পৃষ্ঠপোষকতায় চলছে সাংস্কৃতিক নির্মূল অভিযান। রবীন্দ্রনাথ-নজরুলকে মুছে ফেলার চেষ্টা চলছে। বাংলাদেশের যে অসাম্প্রদায়িক চেতনা, যে উদার মানবিক মূল্যবোধ, সেগুলোকে শেকড় সমেত উপড়ে ফেলার কাজ চলছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য যখন হাদিকে ইতিহাসের অংশ বলে অভিহিত করেন, তখন বোঝা যায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোও এখন কতটা অসহায়, নয়তো এই ক্ষমতাসীনদের সাথে আপস করে নিয়েছে। যে বিশ্ববিদ্যালয় একদিন মুক্তচিন্তার কেন্দ্র ছিল, যেখানে ভাষা আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল, সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন এখন জঙ্গি নেতার মহিমা কীর্তন করছে।
বাংলাদেশে এখন যা চলছে, সেটা শুধু রাজনৈতিক পালাবদল নয়। এটা একটা সভ্যতার লড়াই। একদিকে আছে উদার, অসাম্প্রদায়িক, মানবিক বাংলাদেশের স্বপ্ন। অন্যদিকে আছে মধ্যযুগীয় অন্ধকারে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা। আর দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এই মুহূর্তে দ্বিতীয় শক্তিটাই রাষ্ট্রযন্ত্র নিয়ন্ত্রণ করছে। ইউনূস এবং তার দোসররা যে বাংলাদেশ গড়তে চাইছেন, সেখানে নজরুল-রবীন্দ্রনাথের জায়গা নেই, গণতন্ত্রের জায়গা নেই, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জায়গা নেই।
নজরুলের পরিবারের আর্তি শুনে মনে হয়, তারা জানেন আরও বড় কিছু ঘটতে যাচ্ছে। কবির সমাধিও হয়তো নিরাপদ নয়। কারণ যে মানসিকতার লোকেরা এখন ক্ষমতায়, তাদের কাছে নজরুল মানে বিদ্রোহ, মানে সাম্য, মানে মানবতা। আর এসব কিছুই তাদের আদর্শের বিপরীত। তাই নজরুলকে অসম্মান করা, তার স্মৃতিকে কলঙ্কিত করা, এটা হয়তো তাদের পরবর্তী লক্ষ্য।
বাংলাদেশ এখন এমন এক অন্ধকারে ডুবে আছে যেখান থেকে বেরোনোর পথ খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। গণতন্ত্র খুন হয়েছে, সংস্কৃতি খুন হচ্ছে, মানবিকতা খুন হচ্ছে। আর এসবের নায়ক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছেন একজন নোবেল বিজয়ী মহাজন এবং তার পেছনে সারিবদ্ধ যুদ্ধাপরাধী, জঙ্গি আর সাম্প্রদায়িক শক্তি। ইতিহাস কখনো তাদের ক্ষমা করবে না।

