Thursday, January 15, 2026

ভাড়াটে বিপ্লব: বাংলাদেশে বেজমেনভের সাবভারশন থিওরির বাস্তবায়ন

১৯৮৪ সালে সাবেক কেজিবি এজেন্ট ইউরি বেজমেনভ ‘সাইকোলজিক্যাল ওয়ারফেয়ার’ বা মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ বিষয়ক সাবভারশনের কথা বলেছিলেন, তখন তিনি হয়তো ভাবেননি যে তার বর্ণিত সেই চারটা ধাপ একদিন বাংলাদেশে এতো নিখুঁতভাবে কার্যকর করা হবে। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে যা ঘটেছে, সেটা কোনো স্বতঃস্ফূর্ত গণআন্দোলন ছিল না। এটা ছিল একটা সুপরিকল্পিত অন্তর্ঘাত, যার প্রতিটা পর্যায় ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হয়েছে। আর এখন যখন মুহাম্মদ ইউনুস আর ওয়াকার-উজ-জামানের মতো লোকেরা ক্ষমতায়, তখন পরিষ্কার হয়ে যায় যে এই পুরো খেলাটা কতটা গভীর ছিল।

প্রথমে আসি নৈতিক অবক্ষয়ের প্রসঙ্গে। গত পনেরো বছর ধরে এই দেশে একটা কাজ খুব সুচারুভাবে করা হয়েছে। সেটা হলো প্রজন্মের পর প্রজন্মকে বোঝানো যে দেশপ্রেম মানে পুরনো চিন্তা, জাতীয়তাবাদ মানে সাম্প্রদায়িকতা, আর মুক্তিযুদ্ধের চেতনা মানে রাজনৈতিক হাতিয়ার। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীদের শেখানো হয়েছে রাষ্ট্রকে প্রশ্ন করতে, কিন্তু কখনো শেখানো হয়নি কোন প্রশ্নগুলো আসলে দেশের জন্য ক্ষতিকর। সোশ্যাল মিডিয়ায় ইনফ্লুয়েন্সাররা দিনরাত একটা জিনিস প্রচার করেছেন যে এই দেশে সবকিছু ভুল, সবাই দুর্নীতিবাজ, আর একমাত্র পরিবর্তন মানেই মুক্তি। এই যে ধীরে ধীরে একটা জাতির আস্থার ভিত্তি নষ্ট করে দেওয়া, এটাই তো বেজমেনভের বলা প্রথম ধাপ।

এরপর এলো অস্থিতিশীলতার পালা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সেশনজট, চাকরির বাজারে অনিশ্চয়তা, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, এই সবকিছু মিলিয়ে তরুণ সমাজকে তৈরি করা হয়েছে একটা বিস্ফোরক পরিস্থিতির জন্য। কোটা সংস্কারের দাবি নিয়ে যখন ছাত্ররা রাস্তায় নামলো, তখন সেটা ছিল একটা ন্যায্য দাবি। কিন্তু সেই দাবিকে কাজে লাগিয়ে যেভাবে সহিংসতা ছড়ানো হলো, সরকারি ভবনে আগুন দেওয়া হলো, পুলিশের ওপর হামলা হলো, সেটা কি আসলেই ছাত্রদের কাজ ছিল? নাকি এর পেছনে ছিল প্রশিক্ষিত ক্যাডার আর জঙ্গি সংগঠনের সদস্যরা? যেসব ভিডিও পরবর্তীতে বের হয়েছে, তাতে দেখা গেছে অনেক হামলাকারীই বয়স্ক মানুষ, যাদের ছাত্র বলে চালানো হয়েছিল। এটা পরিকল্পিত ডিস্টেবিলাইজেশন ছাড়া আর কিছু না।

আর তারপর এলো সংকটকাল। জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহে যখন পুরো দেশ একটা যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হলো, যখন ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে গেল, যখন মানুষ ঘরে বসে কাঁপতে লাগলো, তখনই এই সংকটের সদ্ব্যবহার করা হলো। শেখ হাসিনাকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করা হলো, আর তার জায়গায় বসানো হলো মুহাম্মদ ইউনুসকে। এই লোকটা কে? যে মাইক্রোক্রেডিটের নামে দরিদ্র মানুষের কাছ থেকে সুদ নিয়ে ধনী হয়েছে, যার বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ আছে, যে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পরও দেশের মানুষের কাছে কখনো গ্রহণযোগ্য নেতা হিসেবে দাঁড়াতে পারেনি। কিন্তু পশ্চিমা দেশগুলোর কাছে সে একজন আদর্শ ব্যক্তি। কারণ সে তাদের স্বার্থ রক্ষা করবে। আর তার সাথে আছে সেনাপ্রধান ওয়াকার-উজ-জামান, যিনি নির্বাচিত সরকারের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে একটা অবৈধ সরকারকে ক্ষমতায় বসাতে সাহায্য করলেন।

এখন চলছে নরমালাইজেশনের পর্ব। যারা আন্দোলনের নামে রাস্তায় নেমেছিল, যারা ভেবেছিল তারা একটা নতুন বাংলাদেশ দেখবে, তারা এখন বুঝতে পারছে যে তাদেরকে বোকা বানানো হয়েছে। ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের ওপর যেভাবে হামলা হচ্ছে, আওয়ামী লীগের সমর্থকদের বাড়িঘর জ্বালানো হচ্ছে, সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন চলছে, এটা কি গণতন্ত্রের লক্ষণ? বেজমেনভ ঠিকই বলেছিলেন, বিপ্লবের পর যারা বিপ্লব করেছে, তাদেরকেই প্রথমে সরিয়ে দেওয়া হয়। কারণ তারা যে স্বপ্ন দেখেছিল, সেটা বাস্তবায়ন হয় না। তখন তারা আবার প্রশ্ন করতে শুরু করে। তাই নতুন শাসকরা তাদেরকে নীরব করে দেয়।

এখন প্রশ্ন হলো, এই পুরো প্রক্রিয়ার পেছনে কারা ছিল? বিদেশি রাষ্ট্রের কথা যদি বলি, তাহলে পাকিস্তান আর তুরস্কের নাম আসবে। পাকিস্তানের আইএসআই তো বাংলাদেশে তাদের নেটওয়ার্ক বহু আগে থেকেই তৈরি করে রেখেছে। তুরস্কের এরদোগান সরকার চায় যে বাংলাদেশ একটা ইসলামিক রাষ্ট্রে পরিণত হোক, যেখানে তার প্রভাব থাকবে। আর এই দুই দেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বাংলাদেশে সাবভারশনের থিওরি ভালোভাবে পড়েছে। তারা জানে কীভাবে একটা দেশকে ভেতর থেকে ভাঙতে হয়। টাকা দিয়ে মিডিয়া কিনে নিতে হয়, সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রোপাগান্ডা ছড়াতে হয়, তরুণদের মাথায় বিষ ঢুকিয়ে দিতে হয়। আর এই কাজে তাদের সাহায্য করেছে জামায়াতে ইসলামীর মতো জঙ্গি সংগঠন।

জামায়াত এই দেশে কখনো নির্বাচনে জিততে পারে না। কারণ মানুষ তাদের আসল চেহারা চেনে। তারা জানে যে এই সংগঠন একাত্তরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সাথে মিলে গণহত্যায় অংশ নিয়েছিল। কিন্তু ক্ষমতায় আসার জন্য তাদের নির্বাচন লাগে না। তাদের লাগে অরাজকতা। আর সেই অরাজকতা তারা তৈরি করেছে জুলাই মাসে। হেফাজতে ইসলাম, আনসারুল্লাহ বাংলা টিম, এই সব সংগঠনের সদস্যরা মাঠে নেমেছিল। আর এখন তারা পুরস্কার হিসেবে পেয়েছে ক্ষমতার ভাগ।

সবচেয়ে হতাশাজনক ব্যাপার হলো সেনাবাহিনীর ভূমিকা। একটা দেশের সেনাবাহিনী সংবিধানের রক্ষক হওয়ার কথা। কিন্তু ওয়াকার-উজ-জামান যা করলেন, সেটা একেবারে নগ্ন বিশ্বাসঘাতকতা। নির্বাচিত সরকার থাকতে তিনি তাকে সরিয়ে দিয়ে একটা অবৈধ সরকারকে সমর্থন দিলেন। এটা কু ছাড়া আর কিছু না। আর এই কুর ফলাফল হিসেবে এখন সেনাবাহিনী সরাসরি দেশ চালাচ্ছে। ইউনুস তো একটা মুখোশ মাত্র। আসল ক্ষমতা এখন সেনা সদরে।

এই পুরো ঘটনা থেকে কয়েকটা জিনিস পরিষ্কার। প্রথমত, সোশ্যাল মিডিয়া একটা মারাত্মক অস্ত্র। ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটকে যে পরিমাণ ভুয়া খবর আর প্রোপাগান্ডা ছড়ানো হয়েছে, তার ফলে মানুষ সত্য মিথ্যা আলাদা করতে পারছে না। যে কেউ যেকোনো কিছু বলে দিচ্ছে, আর হাজার হাজার মানুষ সেটা বিশ্বাস করে শেয়ার করে দিচ্ছে। এই যে তথ্য যাচাই না করে আবেগের বশে কাজ করার প্রবণতা, এটাই একটা জাতিকে ধ্বংস করার জন্য যথেষ্ট।

দ্বিতীয়ত, প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আস্থা নষ্ট করে দেওয়াটা খুব সহজ, কিন্তু সেই আস্থা ফিরিয়ে আনা অনেক কঠিন। পুলিশ, প্রশাসন, বিচার বিভাগ, এই সবগুলো প্রতিষ্ঠানকে যেভাবে আক্রমণ করা হয়েছে, তাতে এখন মানুষ কাউকে বিশ্বাস করে না। আর যখন মানুষ রাষ্ট্রের ওপর আস্থা হারায়, তখন রাষ্ট্র নামের জিনিসটাই আর থাকে না।

তৃতীয়ত, তরুণ সমাজকে যদি সঠিকভাবে শিক্ষা না দেওয়া হয়, তাহলে তাদেরকে যে কেউ যেকোনো কাজে ব্যবহার করতে পারে। জুলাই মাসে যেসব ছাত্র রাস্তায় নেমেছিল, তাদের অধিকাংশই ছিল আবেগতাড়িত। তারা ভেবেছিল তারা দেশের জন্য লড়ছে। কিন্তু তারা জানত না যে তাদেরকে ব্যবহার করা হচ্ছে। যারা আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিল, তারা জানত ঠিক কী ঘটছে। কিন্তু সাধারণ ছাত্ররা জানত না। আর এখন তারা যখন দেখছে যে তাদের স্বপ্নের বাংলাদেশ আসেনি, বরং আরো খারাপ একটা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে।

মুহাম্মদ ইউনুস আর ওয়াকার-উজ-জামান এখন যা করছেন, সেটা হলো একটা দেশকে পুরোপুরি ধ্বংস করার আয়োজন। অর্থনীতি ভেঙে পড়ছে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে, প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক খারাপ হচ্ছে। আর সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো, জঙ্গিবাদ মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে। যেসব জঙ্গি সংগঠন আগে আন্ডারগ্রাউন্ডে ছিল, তারা এখন প্রকাশ্যে কাজ করছে। কারণ তারা জানে যে এই সরকার তাদের ছোঁবে না। কারণ এই সরকার তাদের সমর্থন নিয়েই ক্ষমতায় এসেছে।

বেজমেনভ বলেছিলেন যে একবার যদি কোনো দেশ নরমালাইজেশন স্টেজে চলে যায়, তাহলে সেখান থেকে ফিরে আসা প্রায় অসম্ভব। কারণ তখন পুরো রাষ্ট্রযন্ত্র দখল হয়ে যায়। শিক্ষা ব্যবস্থা, মিডিয়া, আইন-আদালত, সবকিছু। আর তখন মানুষ যতই প্রমাণ দেখুক না কেন, তারা সত্য মানতে চায় না। কারণ তাদের মগজটা এমনভাবে তৈরি করে ফেলা হয়েছে যে তারা শুধু সেটাই বিশ্বাস করে যেটা তাদের বিশ্বাস করতে বলা হয়েছে।

বাংলাদেশ এখন ঠিক সেই অবস্থায় আছে। যারা ক্ষমতায় এসেছে, তারা জানে যে তাদের কোনো গণভিত্তি নেই। তাই তারা নির্বাচন দিতে চায় না। তারা যতদিন পারে ক্ষমতায় থাকবে, আর এই সময়ে দেশকে এমনভাবে বদলে ফেলবে যাতে আর কখনো আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়া সম্ভব না হয়। ইউনুস জানেন যে তিনি একটা পাপেট। তার কাজ হলো পশ্চিমা দেশগুলোকে খুশি রাখা আর দেশের ভেতরে জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটতে দেওয়া। আর ওয়াকার জানেন যে তিনি সংবিধান লঙ্ঘন করেছেন। কিন্তু তিনি এটাও জানেন যে তার বিরুদ্ধে কিছু করার কেউ নেই। কারণ বন্দুকের নল তার হাতে।

এই পুরো পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়েছে সাধারণ মানুষের। যারা কোনো রাজনীতির সাথে জড়িত না, যারা শুধু চায় একটা শান্তিপূর্ণ জীবন, তারা এখন অনিশ্চয়তার মধ্যে আছে। ব্যবসা-বাণিজ্য ঠিকমতো চলছে না, চাকরি যাচ্ছে, দ্রব্যমূল্য বাড়ছে। আর সবচেয়ে ভয়ের ব্যাপার হলো নিরাপত্তাহীনতা। যে কেউ যেকোনো সময় আক্রান্ত হতে পারে, যদি তার রাজনৈতিক পরিচয় ভুল হয়।

ইতিহাস বলে যে যেসব দেশ সামরিক হস্তক্ষেপ আর অবৈধ সরকারের শিকার হয়েছে, তাদের পুনরুদ্ধার হতে দশকের পর দশক লেগে যায়। পাকিস্তান তার উদাহরণ। সেখানে সামরিক শাসন এসেছে বারবার, আর ফলাফল হিসেবে দেশটা আজ একটা ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশ কি সেই পথে হাঁটছে? দেখে তো তাই মনে হচ্ছে। আর যদি তাই হয়, তাহলে দায় কার? যারা এই অবৈধ সরকারকে সমর্থন করছে, তাদের। যারা জুলাই মাসের সহিংসতাকে জায়েজ করছে, তাদের। যারা ভাবছে যে তারা একটা বিপ্লব করেছে, তাদের।

বিপ্লব হয় না এভাবে। বিপ্লব হয় যখন একটা জাতি একসাথে দাঁড়ায়, যখন সবার লক্ষ্য এক হয়, যখন নেতৃত্ব সৎ আর স্বচ্ছ হয়। কিন্তু এখানে যা হয়েছে, সেটা বিপ্লব না। এটা একটা ষড়যন্ত্র, একটা সাজানো নাটক, যার শিকার হয়েছে পুরো জাতি। আর এই নাটকের পরিচালকরা এখন মজা করে দেখছে কীভাবে একটা দেশ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।

১৯৮৪ সালে সাবেক কেজিবি এজেন্ট ইউরি বেজমেনভ ‘সাইকোলজিক্যাল ওয়ারফেয়ার’ বা মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ বিষয়ক সাবভারশনের কথা বলেছিলেন, তখন তিনি হয়তো ভাবেননি যে তার বর্ণিত সেই চারটা ধাপ একদিন বাংলাদেশে এতো নিখুঁতভাবে কার্যকর করা হবে। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে যা ঘটেছে, সেটা কোনো স্বতঃস্ফূর্ত গণআন্দোলন ছিল না। এটা ছিল একটা সুপরিকল্পিত অন্তর্ঘাত, যার প্রতিটা পর্যায় ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হয়েছে। আর এখন যখন মুহাম্মদ ইউনুস আর ওয়াকার-উজ-জামানের মতো লোকেরা ক্ষমতায়, তখন পরিষ্কার হয়ে যায় যে এই পুরো খেলাটা কতটা গভীর ছিল।

প্রথমে আসি নৈতিক অবক্ষয়ের প্রসঙ্গে। গত পনেরো বছর ধরে এই দেশে একটা কাজ খুব সুচারুভাবে করা হয়েছে। সেটা হলো প্রজন্মের পর প্রজন্মকে বোঝানো যে দেশপ্রেম মানে পুরনো চিন্তা, জাতীয়তাবাদ মানে সাম্প্রদায়িকতা, আর মুক্তিযুদ্ধের চেতনা মানে রাজনৈতিক হাতিয়ার। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীদের শেখানো হয়েছে রাষ্ট্রকে প্রশ্ন করতে, কিন্তু কখনো শেখানো হয়নি কোন প্রশ্নগুলো আসলে দেশের জন্য ক্ষতিকর। সোশ্যাল মিডিয়ায় ইনফ্লুয়েন্সাররা দিনরাত একটা জিনিস প্রচার করেছেন যে এই দেশে সবকিছু ভুল, সবাই দুর্নীতিবাজ, আর একমাত্র পরিবর্তন মানেই মুক্তি। এই যে ধীরে ধীরে একটা জাতির আস্থার ভিত্তি নষ্ট করে দেওয়া, এটাই তো বেজমেনভের বলা প্রথম ধাপ।

এরপর এলো অস্থিতিশীলতার পালা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সেশনজট, চাকরির বাজারে অনিশ্চয়তা, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, এই সবকিছু মিলিয়ে তরুণ সমাজকে তৈরি করা হয়েছে একটা বিস্ফোরক পরিস্থিতির জন্য। কোটা সংস্কারের দাবি নিয়ে যখন ছাত্ররা রাস্তায় নামলো, তখন সেটা ছিল একটা ন্যায্য দাবি। কিন্তু সেই দাবিকে কাজে লাগিয়ে যেভাবে সহিংসতা ছড়ানো হলো, সরকারি ভবনে আগুন দেওয়া হলো, পুলিশের ওপর হামলা হলো, সেটা কি আসলেই ছাত্রদের কাজ ছিল? নাকি এর পেছনে ছিল প্রশিক্ষিত ক্যাডার আর জঙ্গি সংগঠনের সদস্যরা? যেসব ভিডিও পরবর্তীতে বের হয়েছে, তাতে দেখা গেছে অনেক হামলাকারীই বয়স্ক মানুষ, যাদের ছাত্র বলে চালানো হয়েছিল। এটা পরিকল্পিত ডিস্টেবিলাইজেশন ছাড়া আর কিছু না।

আর তারপর এলো সংকটকাল। জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহে যখন পুরো দেশ একটা যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হলো, যখন ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে গেল, যখন মানুষ ঘরে বসে কাঁপতে লাগলো, তখনই এই সংকটের সদ্ব্যবহার করা হলো। শেখ হাসিনাকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করা হলো, আর তার জায়গায় বসানো হলো মুহাম্মদ ইউনুসকে। এই লোকটা কে? যে মাইক্রোক্রেডিটের নামে দরিদ্র মানুষের কাছ থেকে সুদ নিয়ে ধনী হয়েছে, যার বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ আছে, যে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পরও দেশের মানুষের কাছে কখনো গ্রহণযোগ্য নেতা হিসেবে দাঁড়াতে পারেনি। কিন্তু পশ্চিমা দেশগুলোর কাছে সে একজন আদর্শ ব্যক্তি। কারণ সে তাদের স্বার্থ রক্ষা করবে। আর তার সাথে আছে সেনাপ্রধান ওয়াকার-উজ-জামান, যিনি নির্বাচিত সরকারের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে একটা অবৈধ সরকারকে ক্ষমতায় বসাতে সাহায্য করলেন।

এখন চলছে নরমালাইজেশনের পর্ব। যারা আন্দোলনের নামে রাস্তায় নেমেছিল, যারা ভেবেছিল তারা একটা নতুন বাংলাদেশ দেখবে, তারা এখন বুঝতে পারছে যে তাদেরকে বোকা বানানো হয়েছে। ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের ওপর যেভাবে হামলা হচ্ছে, আওয়ামী লীগের সমর্থকদের বাড়িঘর জ্বালানো হচ্ছে, সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন চলছে, এটা কি গণতন্ত্রের লক্ষণ? বেজমেনভ ঠিকই বলেছিলেন, বিপ্লবের পর যারা বিপ্লব করেছে, তাদেরকেই প্রথমে সরিয়ে দেওয়া হয়। কারণ তারা যে স্বপ্ন দেখেছিল, সেটা বাস্তবায়ন হয় না। তখন তারা আবার প্রশ্ন করতে শুরু করে। তাই নতুন শাসকরা তাদেরকে নীরব করে দেয়।

এখন প্রশ্ন হলো, এই পুরো প্রক্রিয়ার পেছনে কারা ছিল? বিদেশি রাষ্ট্রের কথা যদি বলি, তাহলে পাকিস্তান আর তুরস্কের নাম আসবে। পাকিস্তানের আইএসআই তো বাংলাদেশে তাদের নেটওয়ার্ক বহু আগে থেকেই তৈরি করে রেখেছে। তুরস্কের এরদোগান সরকার চায় যে বাংলাদেশ একটা ইসলামিক রাষ্ট্রে পরিণত হোক, যেখানে তার প্রভাব থাকবে। আর এই দুই দেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বাংলাদেশে সাবভারশনের থিওরি ভালোভাবে পড়েছে। তারা জানে কীভাবে একটা দেশকে ভেতর থেকে ভাঙতে হয়। টাকা দিয়ে মিডিয়া কিনে নিতে হয়, সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রোপাগান্ডা ছড়াতে হয়, তরুণদের মাথায় বিষ ঢুকিয়ে দিতে হয়। আর এই কাজে তাদের সাহায্য করেছে জামায়াতে ইসলামীর মতো জঙ্গি সংগঠন।

জামায়াত এই দেশে কখনো নির্বাচনে জিততে পারে না। কারণ মানুষ তাদের আসল চেহারা চেনে। তারা জানে যে এই সংগঠন একাত্তরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সাথে মিলে গণহত্যায় অংশ নিয়েছিল। কিন্তু ক্ষমতায় আসার জন্য তাদের নির্বাচন লাগে না। তাদের লাগে অরাজকতা। আর সেই অরাজকতা তারা তৈরি করেছে জুলাই মাসে। হেফাজতে ইসলাম, আনসারুল্লাহ বাংলা টিম, এই সব সংগঠনের সদস্যরা মাঠে নেমেছিল। আর এখন তারা পুরস্কার হিসেবে পেয়েছে ক্ষমতার ভাগ।

সবচেয়ে হতাশাজনক ব্যাপার হলো সেনাবাহিনীর ভূমিকা। একটা দেশের সেনাবাহিনী সংবিধানের রক্ষক হওয়ার কথা। কিন্তু ওয়াকার-উজ-জামান যা করলেন, সেটা একেবারে নগ্ন বিশ্বাসঘাতকতা। নির্বাচিত সরকার থাকতে তিনি তাকে সরিয়ে দিয়ে একটা অবৈধ সরকারকে সমর্থন দিলেন। এটা কু ছাড়া আর কিছু না। আর এই কুর ফলাফল হিসেবে এখন সেনাবাহিনী সরাসরি দেশ চালাচ্ছে। ইউনুস তো একটা মুখোশ মাত্র। আসল ক্ষমতা এখন সেনা সদরে।

এই পুরো ঘটনা থেকে কয়েকটা জিনিস পরিষ্কার। প্রথমত, সোশ্যাল মিডিয়া একটা মারাত্মক অস্ত্র। ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটকে যে পরিমাণ ভুয়া খবর আর প্রোপাগান্ডা ছড়ানো হয়েছে, তার ফলে মানুষ সত্য মিথ্যা আলাদা করতে পারছে না। যে কেউ যেকোনো কিছু বলে দিচ্ছে, আর হাজার হাজার মানুষ সেটা বিশ্বাস করে শেয়ার করে দিচ্ছে। এই যে তথ্য যাচাই না করে আবেগের বশে কাজ করার প্রবণতা, এটাই একটা জাতিকে ধ্বংস করার জন্য যথেষ্ট।

দ্বিতীয়ত, প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আস্থা নষ্ট করে দেওয়াটা খুব সহজ, কিন্তু সেই আস্থা ফিরিয়ে আনা অনেক কঠিন। পুলিশ, প্রশাসন, বিচার বিভাগ, এই সবগুলো প্রতিষ্ঠানকে যেভাবে আক্রমণ করা হয়েছে, তাতে এখন মানুষ কাউকে বিশ্বাস করে না। আর যখন মানুষ রাষ্ট্রের ওপর আস্থা হারায়, তখন রাষ্ট্র নামের জিনিসটাই আর থাকে না।

তৃতীয়ত, তরুণ সমাজকে যদি সঠিকভাবে শিক্ষা না দেওয়া হয়, তাহলে তাদেরকে যে কেউ যেকোনো কাজে ব্যবহার করতে পারে। জুলাই মাসে যেসব ছাত্র রাস্তায় নেমেছিল, তাদের অধিকাংশই ছিল আবেগতাড়িত। তারা ভেবেছিল তারা দেশের জন্য লড়ছে। কিন্তু তারা জানত না যে তাদেরকে ব্যবহার করা হচ্ছে। যারা আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিল, তারা জানত ঠিক কী ঘটছে। কিন্তু সাধারণ ছাত্ররা জানত না। আর এখন তারা যখন দেখছে যে তাদের স্বপ্নের বাংলাদেশ আসেনি, বরং আরো খারাপ একটা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে।

মুহাম্মদ ইউনুস আর ওয়াকার-উজ-জামান এখন যা করছেন, সেটা হলো একটা দেশকে পুরোপুরি ধ্বংস করার আয়োজন। অর্থনীতি ভেঙে পড়ছে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে, প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক খারাপ হচ্ছে। আর সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো, জঙ্গিবাদ মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে। যেসব জঙ্গি সংগঠন আগে আন্ডারগ্রাউন্ডে ছিল, তারা এখন প্রকাশ্যে কাজ করছে। কারণ তারা জানে যে এই সরকার তাদের ছোঁবে না। কারণ এই সরকার তাদের সমর্থন নিয়েই ক্ষমতায় এসেছে।

বেজমেনভ বলেছিলেন যে একবার যদি কোনো দেশ নরমালাইজেশন স্টেজে চলে যায়, তাহলে সেখান থেকে ফিরে আসা প্রায় অসম্ভব। কারণ তখন পুরো রাষ্ট্রযন্ত্র দখল হয়ে যায়। শিক্ষা ব্যবস্থা, মিডিয়া, আইন-আদালত, সবকিছু। আর তখন মানুষ যতই প্রমাণ দেখুক না কেন, তারা সত্য মানতে চায় না। কারণ তাদের মগজটা এমনভাবে তৈরি করে ফেলা হয়েছে যে তারা শুধু সেটাই বিশ্বাস করে যেটা তাদের বিশ্বাস করতে বলা হয়েছে।

বাংলাদেশ এখন ঠিক সেই অবস্থায় আছে। যারা ক্ষমতায় এসেছে, তারা জানে যে তাদের কোনো গণভিত্তি নেই। তাই তারা নির্বাচন দিতে চায় না। তারা যতদিন পারে ক্ষমতায় থাকবে, আর এই সময়ে দেশকে এমনভাবে বদলে ফেলবে যাতে আর কখনো আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়া সম্ভব না হয়। ইউনুস জানেন যে তিনি একটা পাপেট। তার কাজ হলো পশ্চিমা দেশগুলোকে খুশি রাখা আর দেশের ভেতরে জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটতে দেওয়া। আর ওয়াকার জানেন যে তিনি সংবিধান লঙ্ঘন করেছেন। কিন্তু তিনি এটাও জানেন যে তার বিরুদ্ধে কিছু করার কেউ নেই। কারণ বন্দুকের নল তার হাতে।

এই পুরো পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়েছে সাধারণ মানুষের। যারা কোনো রাজনীতির সাথে জড়িত না, যারা শুধু চায় একটা শান্তিপূর্ণ জীবন, তারা এখন অনিশ্চয়তার মধ্যে আছে। ব্যবসা-বাণিজ্য ঠিকমতো চলছে না, চাকরি যাচ্ছে, দ্রব্যমূল্য বাড়ছে। আর সবচেয়ে ভয়ের ব্যাপার হলো নিরাপত্তাহীনতা। যে কেউ যেকোনো সময় আক্রান্ত হতে পারে, যদি তার রাজনৈতিক পরিচয় ভুল হয়।

ইতিহাস বলে যে যেসব দেশ সামরিক হস্তক্ষেপ আর অবৈধ সরকারের শিকার হয়েছে, তাদের পুনরুদ্ধার হতে দশকের পর দশক লেগে যায়। পাকিস্তান তার উদাহরণ। সেখানে সামরিক শাসন এসেছে বারবার, আর ফলাফল হিসেবে দেশটা আজ একটা ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশ কি সেই পথে হাঁটছে? দেখে তো তাই মনে হচ্ছে। আর যদি তাই হয়, তাহলে দায় কার? যারা এই অবৈধ সরকারকে সমর্থন করছে, তাদের। যারা জুলাই মাসের সহিংসতাকে জায়েজ করছে, তাদের। যারা ভাবছে যে তারা একটা বিপ্লব করেছে, তাদের।

বিপ্লব হয় না এভাবে। বিপ্লব হয় যখন একটা জাতি একসাথে দাঁড়ায়, যখন সবার লক্ষ্য এক হয়, যখন নেতৃত্ব সৎ আর স্বচ্ছ হয়। কিন্তু এখানে যা হয়েছে, সেটা বিপ্লব না। এটা একটা ষড়যন্ত্র, একটা সাজানো নাটক, যার শিকার হয়েছে পুরো জাতি। আর এই নাটকের পরিচালকরা এখন মজা করে দেখছে কীভাবে একটা দেশ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।

আরো পড়ুন

সর্বশেষ