কয়েক বছর আগেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ বিশ্বে উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে স্বীকৃতি অর্জন করেছিল। সেই বাংলাদেশে এখন অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে বেকারের খনিতে পরিণত হচ্ছে।
সম্প্রতি দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি ও ব্যাংকিং খাতের বর্তমান অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন হা-মীম গ্রুপের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে আজাদ। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ বুলেটিন অনুযায়ী গত অর্থবছরে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৪ দশমিক ২২ শতাংশ, যা চলতি বছরে কমে দাঁড়াতে পারে ৩ দশমিক ৯৭ শতাংশে। প্রবৃদ্ধির এ নিম্নমুখী ধারা অর্থনীতির ভেতরের চাপকেই প্রতিফলিত করছে। শনিবার (২৯ নভেম্বর) সকালে ‘বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সম্মেলন ২০২৫’-এর উদ্বোধনী অধিবেশনে অংশ নিয়ে এসব কথা বলেন তিনি।
এ কে আজাদ বলেন, শিল্পায়নের নিম্নমুখী প্রভাবে চাকরি হারিয়েছে ১৪ লাখ মানুষ। এখন তারা বেকার। প্রতি বছর অন্তত ৩০ লাখ মানুষ নতুন করে চাকরিতে আসে। কিন্তু এ খাতে নতুন করে কোন কর্ম সৃষ্টি না হওয়ায় কর্মসংস্থান হচ্ছে না, বেকারত্ব বেড়ে যাচ্ছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের সর্বোচ্চ ক্ষমতায় বসেন নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূস। ধোঁকায় পড়ে জুলাই আন্দোলনে সমর্থন দেওয়া অনেকেই তখন ভেবেছিল দেশের অর্থনীতির আমূল পরিবর্তন আনবেন তিনি। তবে তার শাসনামলে একদিকে যেমন বেড়েছে দুর্নীতি, অন্যদিকে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থাও নাজুক হয়েছে। আর এখন এসবে দিশেহারা দেশের সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ী সমাজ।
এ নিয়ে সম্প্রতি বিস্ফোরক তথ্য দেন বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) কেন্দ্রীয় কমিটির সহকারী সাধারণ সম্পাদক রাজেকুজ্জামান রতন। তিনি এক টেলিভিশন টকশোতে বলেন, সরকারের লুটপাটে গত এক বছরে খেলাপী ঋণ বেড়ে তিন লাখ কোটি টাকা। এ অপকর্ম কারা করেছে? ব্যাংক থেকে কি চাইলেই টাকা নেওয়া যায়? তার এসব কথা থেকে স্পষ্ট সরকারের ইশারায় এ অপকর্ম ঘটানো হয়েছে।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রভাব এবার স্পষ্টভাবে পড়তে শুরু করেছে ব্যাংকিং খাতে। নোবেলবিজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস ও দোসররা দেশের অর্থনীতি লুটেপুটে খাচ্ছে। আর এর কারণে বড়ো অঙ্কের আমানতকারীরা দ্রুতই ব্যাংক থেকে সরে যাচ্ছেন, কমে যাচ্ছে তাদের হিসাব ও জমা।
অবৈধভাবে ক্ষমতায় আসার পর অধ্যাপক ইউনূস একের পর এক আশ্বাস দিলেও তা বাস্তবে প্রতিফলিত হয়নি বরং শিল্পপতিরা মনে করছেন, তার নেতৃত্বাধীন উপদেষ্টা পরিষদ দেশি শিল্প ধ্বংসে ভূমিকা রাখছে।
গত এপ্রিলে গুলশানে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বলেন, ১৯৭১ সালে বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করা হয়েছিল, আর ২০২৫ সালে হত্যা করা হচ্ছে উদ্যোক্তা ও শিল্পকে। তিনি গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট, ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদের হার এবং আমদানিনির্ভর নীতিমালাকে দায়ী করেন।
সংবাদ সম্মেলনে বিসিআই সভাপতি আনোয়ার উল আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন, “একদিকে গ্যাস নেই, অন্যদিকে কারখানা চালাতে না পারলেও সুদের চাপ বাড়ছে। তিন মাস সুদ না দিলে ব্যাংক ঋণখেলাপি বানিয়ে দিচ্ছে। তার মতে, বিডা বড় বিনিয়োগের কথা বললেও বাস্তবতার সঙ্গে সেগুলোর কোনো মিল নেই। উৎপাদনে যেতে পাঁচ বছর সময় লাগে—এই বাস্তবতায় কেউ বিনিয়োগে আসবে না।
বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) আয়োজিত ‘বাংলাদেশ বিনিয়োগ শীর্ষ সম্মেলন ২০২৫’-এ বিনিয়োগ আকর্ষণের নানা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও বাস্তবে বিনিয়োগ কমেছে ৭০ শতাংশের বেশি। বিশ্বব্যাংকের মতে, ২০২৫ সালে অতিরিক্ত ৩০ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যের মুখে পড়তে পারে।
দেশে মূল্যস্ফীতির হার, বিশেষ করে খাদ্য পণ্যের মূল্যস্ফীতি এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সর্বাধিক। এ অভিমত বিশ্ব ব্যাংকের। গত ডিসেম্বরে ঢাকায় আইএমএফের গবেষণা বিভাগের ডেভেলপমেন্ট ম্যাক্রো ইকোনমিকসের প্রধান ক্রিস পাপা জর্জি বলেছেন, ‘বাংলাদেশের অর্থনীতির চিত্র খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়। দীর্ঘদিনেও নিয়ন্ত্রণে আসছে না মূল্যস্ফীতি, যা আইএমএফের ধারণার চেয়েও অনেক বেশি। উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ে সংস্থাটি শঙ্কিত’। এই অবস্থায় আইএমএফের চাপে মার্কিন ডলারের মূল্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। ফলে ডলারের মূল্য বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সে কারণে পণ্যের মূল্যও বেড়ে যাবে। খাদ্য পণ্যের মূল্য অধিক হওয়ায় দেশের বেশিরভাগ মানুষ খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে রয়েছে।
জাতীয় দৈনিক মানবজমিন-এর তথ্য অনুযায়ী, আগস্ট ২০২৪-এর পর থেকে শতাধিক কারখানা স্থায়ী ও অস্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। প্রায় ৬০ হাজার শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন। উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এর পেছনে দায়ী বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে বাংলাদেশের দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতির চিত্র। গত ডিসেম্বরে আইএমএফের প্রধান অর্থনীতিবিদ ক্রিস পাপা জর্জি বলেন, “বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন ভয়াবহ চাপে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে না আসায় আমরা গভীর উদ্বেগে রয়েছি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ইউনূসের সরকার এখনো প্রচারণানির্ভর উন্নয়ন নীতিতে আস্থা রাখছে, বাস্তবসম্মত সংস্কারের দিকে কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। ফলে বিদেশি বিনিয়োগ বন্ধ, দেশি শিল্প বিপর্যস্ত এবং সাধারণ মানুষ বেকারত্ব ও দারিদ্র্যের দোলাচলে দিন কাটাচ্ছে।
রাজনীতির পরিবর্তনে মানুষ স্বচ্ছতা ও স্বস্তি চেয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে তা রূপ নিচ্ছে দুর্নীতির মহাসড়কে। প্রশ্ন উঠছে—এই অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের দায় নেবে কে? আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—এই দুর্নীতির রোড রেসে থামবে কে?

