দেশের আলোচিত নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মোহাম্মদ ইউনুস ও তার নিয়ন্ত্রিত বিভিন্ন ট্রাস্ট, গ্রামীণ টেলিকম, গ্রামীণ কল্যাণসহ গ্রামীণ পরিবারের একাধিক প্রতিষ্ঠানের আর্থিক লেনদেনে চাঞ্চল্যকর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। কর দপ্তর, দুর্নীতি দমন কমিশনসহ বিভিন্ন সংস্থার হাতে থাকা নথি যাচাই করে তদন্তকারীরা বলছেন, এটি বহু বছর ধরে সাজানো একটি সুগঠিত আর্থিক নেটওয়ার্ক। এর মাধ্যমে বিপুল অঙ্কের টাকা ট্রাস্টের নামে বিভিন্ন ব্যাংকে ঘুরিয়ে–ফিরিয়ে রাখা হয়েছে, স্থানান্তর করা হয়েছে এবং প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধারাবাহিকভাবে ‘অলাভজনক’ দেখিয়ে কর ও শ্রমিক কল্যাণ ফান্ডের টাকা এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে।
২০১৮ থেকে ২০২২ সময়কালে ‘প্রফেসর মোঃ ইউনুস ট্রাস্ট’ নামে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকে জমা রাখা হয় ১২৮.৩৯ কোটি টাকা, উত্তোলন করা হয় ১২৭.৪ কোটি। এখান থেকেই গ্রামীণ টেলিকম ট্রাস্টের হিসাবে ১৭.৩২ কোটি এবং রূপায়ণ হাউজিংয়ে ১.৬১ কোটি টাকা স্থানান্তরের তথ্য পাওয়া গেছে। আরও দেখা গেছে—এই ট্রাস্টের নামে বিভিন্ন ব্যাংকে ১০৩টি এফডিআর, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ এক ব্যাংক থেকে অন্য ব্যাংকে ট্রান্সফার করে নতুন করে এফডিআর করা হয়েছে। তদন্তকারীদের মতে, একই টাকা বারবার ঘুরিয়ে নতুন হিসাব বানানোর মাধ্যমে প্রকৃত উৎস ও ব্যবহার আড়াল করার চেষ্টা থাকতে পারে।
অভিযোগের তালিকা এখানেই শেষ নয়। মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকে ২০১৮–২০২২ সময়ে জমা হয় ১২.১ কোটি, উত্তোলন ১৬.৫৩ কোটি। বিনিয়োগ দেখানো হয়েছে গ্রামীণ ওয়ান মিউচুয়াল ফান্ডে। তদন্তকারী সংস্থার ভাষায়—স্বাভাবিক আর্থিক কর্মকাণ্ডের চেয়ে এসব লেনদেন ট্রাস্টের নামে অর্থ সরানোর কৌশল হিসেবেই বেশি নজরে পড়ছে।
অন্যদিকে গ্রামীণ টেলিকম ও গ্রামীণ কল্যাণ—এই দুই প্রতিষ্ঠানেই ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত এফডিআর রয়েছে প্রায় ৪৯৭৪ কোটি টাকার। অথচ প্রতিষ্ঠানগুলোকে বছরের পর বছর ‘অলাভজনক’ দেখিয়ে গেছে। তদন্তকারীদের প্রশ্ন—এমন বিপুল এফডিআর থাকা সত্ত্বেও প্রতিষ্ঠানগুলো লাভ দেখাতে পারে না কীভাবে? এর লক্ষ্য কি কর ফাঁকি দেওয়া ও শ্রমিকদের কল্যাণ ফান্ড এড়িয়ে যাওয়া?
দুদকের মামলায়ও উঠে এসেছে আরও গুরুতর অভিযোগ। নথি অনুযায়ী, গ্রামীণ টেলিকমের পরিচালনা পর্ষদের সভায় ড. ইউনুস সভাপতিত্বে ৪৩৭.০১ কোটি টাকা বিতরণের অনুমোদন দেওয়া হয়, যার মধ্যে প্রায় ২৬.২২ কোটি টাকা ঢুকেছে কর্মচারী ছাড়াও ইউনিয়ন নেতার ও এক আইনজীবীর হিসাবে। অভিযোগ—এই অর্থ বণ্টন ছিল একটি সাজানো প্রক্রিয়া, যা পরে ধারা ৪০৯, ৪২০, ৪৬৭সহ একাধিক জালিয়াতি ও আত্মসাতের ধারায় মামলায় পরিণত হয়।
শ্রম আদালতের মামলায় গ্রামীণ টেলিকমের বিরুদ্ধে অভিযোগ—শ্রমিকদের বৈধ পাওনা ও কল্যাণ ফান্ডের অর্থ ইচ্ছাকৃতভাবে আটকে রাখা হয়েছে। কর দপ্তরের মামলাতেও ড. ইউনূসের দান করা ৭৬.৭৩ কোটি টাকার ওপর ১৫.৩৯ কোটি টাকার কর আরোপ বৈধ বলে হাইকোর্ট রায় দিয়েছে।
গ্রামীণ ব্যাংকের অর্থায়নে গড়ে ওঠা গ্রামীণ পরিবারের কোম্পানিগুলো থেকে সদস্যদের প্রকৃত কল্যাণের চেয়ে অন্য উদ্দেশ্যে টাকা ব্যবহারের অসংখ্য প্রমাণ সামনে আসছে। গ্রামীণফোন থেকে পাওয়া ১০ হাজার ৮৯০.১৯ কোটি টাকার মধ্যে ব্যাংককে কোনো লভ্যাংশ না দেওয়ার বিষয়টিকেও তারা বড় ধরনের অনিয়ম হিসেবে দেখছেন।
তদন্তকারী সংস্থার অভিমত, বহু প্রতিষ্ঠানে লোকসান দেখানো, বিপুল পরিমাণ টাকা এফডিআরে আটকে রাখা, স্থায়ী বিনিয়োগ থেকে অর্থ সরানো এবং বিদেশ থেকে আসা রেমিট্যান্সের অস্পষ্টতা—সব মিলিয়ে একটি বড় আর্থিক জটিলতার ইঙ্গিত স্পষ্ট। এগমন্ট গ্রুপের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ওমান, পর্তুগাল, স্পেন, চীন ও জাপান থেকে আসা রেমিট্যান্সের উৎসও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, দেশের আলোচিত এই অধ্যায়ের শেষ এখনো অনেক দূর। নতুন তথ্য সামনে এলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।

