দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থেকে রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েই আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার আইনি কাঠামো চূড়ান্ত করেছে বিএনপি সরকার। যদিও নির্বাচনের আগে দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব নির্বাহী আদেশে কোনো রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন, তবুও শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধের পথেই হাঁটল তারা। সন্ত্রাসী কার্যক্রমে জড়িত কোনো সত্তার যাবতীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার বিধান যুক্ত করে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) অধ্যাদেশ অনুমোদন করেছে জাতীয় সংসদ। গত বছর ওই অধ্যাদেশের বলে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীকে মাঠ থেকে সরানোর এই কৌশল বিএনপির জন্য দীর্ঘমেয়াদে ‘আত্মঘাতী’ হতে পারে এবং দলটিকে বিলীন হওয়ার ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।
উল্লেখ্য যে, ২০২৪ সালের আগস্টে বেগম খালেদা জিয়া প্রতিহিংসা বর্জনের ডাক দিয়েছিলেন। এমনকি ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে এক সাক্ষাৎকারে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন যে, আজ এক দল নিষিদ্ধ হলে কাল অন্য দলের ওপরও সেই খড়্গ নেমে আসতে পারে। কিন্তু ক্ষমতার শুরুতেই সেই অবস্থান থেকে সরে এসে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করায় বিএনপির রাজনৈতিক স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করে বিএনপি মূলত নিজেকেই কঠিন ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। এর ফলে তৈরি হতে পারে বেশ কয়েকটি জটিল পরিস্থিতি।
১. আওয়ামী লীগের প্রতি জনসহানুভূতি আরও বাড়বে : আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার ফলে তারা জনগণের কাছে ‘মজলুম’ হিসেবে উপস্থাপিত হওয়ার সুযোগ পাবে। এতে দলটির প্রতি সাধারণ মানুষের সহানুভূতি বাড়তে পারে, যা প্রকারান্তরে বিএনপির গণতান্ত্রিক ভাবমূর্তিকেই বিশ্ববাসীর কাছে প্রশ্নবিদ্ধ করবে।
২. আন্তর্জাতিক মহলের চাপ: জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), কমনওয়েলথ এবং যুক্তরাষ্ট্রের মতো আন্তর্জাতিক অংশীদাররা সবসময় অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির পক্ষে। একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করার ফলে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ও দাতা দেশগুলোর কাছ থেকে বিএনপি সরকার চরম কূটনৈতিক চাপের মুখে পড়তে পারে।
৩. নৈতিক ও ঐতিহাসিক সংকট: সমালোচকরা বলছেন, একদিকে একাত্তরের গণহত্যার দায়ে অভিযুক্ত জামায়াতে ইসলামী রাজনীতি করার সুযোগ পাচ্ছে, অন্যদিকে স্বাধীনতার নেতৃত্ব দেওয়া দল আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে—এই বৈপরীত্য বিএনপিকে নৈতিকভাবে দুর্বল করে দেবে। এর ফলে বিএনপি নিজেই স্বাধীনতাবিরোধীদের তোষণকারী হিসেবে অভিযুক্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকবে। এতে দলটি একসময় রাজাকারের দোসর হিসেবে রাজনৈতিক দৃশ্যপট থেকে বিলীন হয়ে যেতে পারে। এছাড়া দেশবিরোধী জামায়াত দেশের রাজনীতিতে আরও শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে।
৪. বড় একটি অংশের ভোটাধিকার হরণ: দেশের অন্তত ৩০ শতাংশ বা এক-তৃতীয়াংশ ভোটার ঐতিহাসিকভাবে আওয়ামী লীগের সমর্থক। দল নিষিদ্ধ করার মাধ্যমে এই বিশাল জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক অধিকার ও ভোটাধিকার কার্যত হরণ করা হলো। এই বিশাল অংশকে রাজনীতির বাইরে রাখা দীর্ঘমেয়াদী জনঅসন্তোষ এবং সামাজিক বিভাজন তৈরি করতে পারে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আওয়ামী লীগকে মাইনাস করার ফলে জামায়াতে ইসলামী এখন বিএনপির প্রধান বিকল্প শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে। যদি ভবিষ্যতে কোনো কারণে মানুষ বিএনপির ওপর অসন্তুষ্ট হয়, তবে বিকল্প হিসেবে কট্টরপন্থী শক্তির উত্থান ঘটার সম্ভাবনা প্রবল। রাজনৈতিক মহলে এখন এই আলোচনা জোরালো যে, আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার এই সিদ্ধান্ত বিএনপির জন্য শেষ পর্যন্ত ‘বুমেরাং’ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

