দেশের মানুষ লাইনে দাঁড়িয়ে আছে—ঘণ্টার পর ঘণ্টা, দিনের পর দিন। পেট্রোল পাম্প বন্ধ, যানবাহন অচল, অর্থনীতির চাকা ধীরগতি—কিন্তু মন্ত্রীরা বলছেন, “সংকট নেই”! প্রশ্ন হলো, তাহলে এই লাইন কার জন্য? এই ভোগান্তি কার জন্য? আর এই অসামঞ্জস্যপূর্ণ বাস্তবতার দায় কে নেবে?
সম্প্রতি বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলো এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরছে—ঢাকা থেকে জেলা, শহর থেকে গ্রাম—সবখানেই জ্বালানির জন্য হাহাকার। কোথাও পাম্প বন্ধ, কোথাও অর্ধেক সরবরাহ, আবার কোথাও কালোবাজারে দ্বিগুণ দামে তেল বিক্রি হচ্ছে। অথচ সরকারের বক্তব্য—“সরবরাহ স্বাভাবিক”, “মজুত পর্যাপ্ত”, “চাহিদার তুলনায় বেশি আমদানি”!
এই দ্বৈত বাস্তবতা কেবল প্রশাসনিক দুর্বলতা নয়, বরং নীতিনির্ধারণের ভয়াবহ বিচ্ছিন্নতার প্রমাণ। মাঠের বাস্তবতা যেখানে সংকটের কথা বলছে, সেখানে কাগুজে হিসাব দিয়ে পরিস্থিতি ঢাকার চেষ্টা জনগণের সঙ্গে এক ধরনের প্রতারণা ছাড়া কিছুই নয়।
সরকার বলছে—আতঙ্কে মানুষ বেশি কিনছে, তাই সংকট তৈরি হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, মানুষ আতঙ্কিত কেন? এই আতঙ্ক কি আকাশ থেকে নেমে এসেছে? নাকি সরকারের অদক্ষতা, অস্পষ্ট নীতি এবং তথ্যের অসামঞ্জস্যই মানুষের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে?
পেট্রোল পাম্প মালিকদের অভিযোগ আরও গুরুতর—তারা প্রয়োজনের অর্ধেক তেলও পাচ্ছেন না। ট্যাংকলরি অর্ধেক ভর্তি করে পাঠানো হচ্ছে। এর ফলে একদিকে সরবরাহ চেইন ভেঙে পড়ছে, অন্যদিকে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হচ্ছে—যার সুযোগ নিচ্ছে অসাধু চক্র।
সরকার এখন দায় চাপাচ্ছে “মজুতদার” ও “কালোবাজারির” ওপর। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই অবৈধ মজুতদাররা কারা? তারা কি হঠাৎ করে জন্ম নিয়েছে? নাকি দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও দুর্বল নজরদারির ফলেই এই সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে?
সংকটের গভীরে রাজনৈতিক ব্যর্থতা
এই সংকট কেবল জ্বালানির নয়—এটি রাষ্ট্র পরিচালনার সক্ষমতার সংকট। আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা নতুন কিছু নয়। মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা, বৈশ্বিক জ্বালানি দামের ওঠানামা—এসব বহুবার ঘটেছে। কিন্তু একটি দায়িত্বশীল সরকার এসব পরিস্থিতির জন্য আগাম প্রস্তুতি নেয়, বিকল্প উৎস নিশ্চিত করে, কৌশলগত মজুত গড়ে তোলে। এখানেই প্রশ্ন আসে—কেন বর্তমান সরকার সেই প্রস্তুতি নিতে ব্যর্থ হলো?
শেখ হাসিনা আমলের দূরদর্শিতা: এক তুলনামূলক বাস্তবতা
অতীতের দিকে তাকালে একটি স্পষ্ট পার্থক্য চোখে পড়ে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সময় জ্বালানি খাতে নেওয়া হয়েছিল কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ও দূরদর্শী উদ্যোগ— বহুমুখী আমদানি উৎস: মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে রাশিয়া, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি।
স্ট্র্যাটেজিক স্টোরেজ বৃদ্ধি: বড় আকারের জ্বালানি সংরক্ষণাগার নির্মাণ, যাতে অন্তত কয়েক মাসের চাহিদা পূরণ করা যায়। এলএনজি টার্মিনাল ও বিকল্প জ্বালানি: গ্যাস সংকট মোকাবেলায় এলএনজি আমদানি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝোঁক।
ডিজিটাল মনিটরিং: সরবরাহ চেইন নজরদারিতে প্রযুক্তির ব্যবহার, যাতে মজুতদারি ও চুরি কমানো যায়। এসব উদ্যোগের ফলে বৈশ্বিক সংকটের সময়ও দেশের জ্বালানি পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল ছিল। দীর্ঘ লাইন, পাম্প বন্ধ, সহিংসতা—এসব দৃশ্য তখন নিয়মিত ছিল না।
বর্তমান বাস্তবতা: অস্বীকারের রাজনীতি
আজকের পরিস্থিতিতে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—সমস্যা স্বীকার না করা। যখন মন্ত্রী বলেন “সংকট নেই”, তখন তিনি কেবল বাস্তবতাকে অস্বীকার করেন না, বরং সমাধানের পথও বন্ধ করে দেন। কারণ, সমস্যা স্বীকার না করলে সমাধানও সম্ভব নয়। পরিশেষে উল্লেখ করতে চাই – জ্বালানি সংকট কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়—এটি একটি বড় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার প্রতিফলন। জনগণ আজ শুধু তেল চায় না—তারা চায় সত্য, স্বচ্ছতা এবং কার্যকর পদক্ষেপ।
সরকার যদি এখনো বাস্তবতা না বোঝে, তবে এই সংকট কেবল পাম্পের লাইনে সীমাবদ্ধ থাকবে না—এটি অর্থনীতি, রাজনীতি এবং জনজীবনের প্রতিটি স্তরে বিস্তৃত হবে। সময় এসেছে—অস্বীকার নয়, দায়িত্ব নেওয়ার।

