শিশুপালের দিঘী, বিএনপির কীর্তি এবং আমাদের ইতিহাসের কবর

কাপাসিয়ার কপালেশ্বরে শিশুপালের দিঘীর পাশে এখন ক্রয়-বিক্রয়ের সাইনবোর্ড। প্রত্নতাত্ত্বিক সংরক্ষণের নয়, সরকারি অধিগ্রহণের নয়, একটা সাধারণ জমি বিক্রির বিজ্ঞাপন। ১৮৪০ সালে জেমস টেলর যে দিঘীর পাশে ইটের স্তুপ দেখেছিলেন, সেই দিঘী আজ “ব্যক্তি মালিকানাধীন সম্পত্তি”। এই লজ্জা কার?

টেলর তাঁর A Sketch of the Topography and Statistics of Dacca বইয়ে লিখেছিলেন, শিশুপালের রাজধানীর কাছে একটি চমৎকার জলাশয় এবং ইট ও মাটির ঢিপি বিদ্যমান। মোহাম্মদ আসাদুজ্জামানের বাংলা অনুবাদে সেই বিবরণ পড়লে বোঝা যায়, এটা কেবল একটা গ্রামীণ পুকুরের কথা নয়। দুইশো বছর আগে একজন ব্রিটিশ সার্জন এই স্থানকে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ মনে করে নথিভুক্ত করে গেছেন। আর আজ, স্বাধীন বাংলাদেশে, সেই দিঘীর পাড়ে বিক্রির বিজ্ঞপ্তি ঝুলছে।

এখন ক্ষমতায় যারা আছেন, তারা ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সালের একটি নির্বাচনের মাধ্যমে এসেছেন। সেই নির্বাচনে দেশের প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো অংশ নেয়নি। সাধারণ মানুষ সেই ভোটকে প্রত্যাখ্যান করেছে। জিয়াউর রহমানের তৈরি বিএনপি, যার জন্ম সেনানিবাসের ছায়ায়, সেই দল এখন মন্ত্রিপরিষদ গঠন করে দেশ চালাচ্ছে। আর এই সরকারের আমলে শিশুপালের দিঘী বিক্রি হয়ে যাচ্ছে, কেউ টের পাচ্ছে না। অন্তত সরকারিভাবে কেউ টের পেতে চাইছে না।

বিএনপি এবং তার তথাকথিত মন্ত্রিসভার কাছে প্রশ্ন একটাই, সিএস জরিপে ভুলে কোনো ব্যক্তির নামে রেকর্ড হলে সেটা সংশোধনের সুযোগ ছিল জরিপের পরপরই আপিলের সময়। সেটা হয়নি। কিন্তু এখনো তো অধিগ্রহণের পথ বন্ধ নয়। ঐতিহাসিক গুরুত্বসম্পন্ন যেকোনো স্থান রাষ্ট্র চাইলে অধিগ্রহণ করতে পারে। সেই সদিচ্ছা কোথায়? দেশপ্রেম আর ইতিহাস-ঐতিহ্যের কথা যারা মুখে বলেন, তাদের ক্ষমতায় থাকার সময় যখন এই ঐতিহ্য বিক্রি হয়, তখন তাদের মুখের কথার দাম কতটুকু?

ভাওয়াল অঞ্চলের ইতিহাস নিয়ে একাডেমিক মহলের যে উদাসীনতা, সেটাও এই পুরো চিত্রের অংশ। রমেশচন্দ্র মজুমদার বা নীহাররঞ্জন রায়রা শত বছর আগে ভাওয়ালকে গুরুত্ব দেননি, তাই এখনো একদল পণ্ডিত এই অঞ্চলের ইতিহাসকে জনশ্রুতি বলে হাসেন। কিন্তু কর্ণপুরের দুটি দিঘীর ইট, শ্রীপুরের উয়াদ্দিদিয়া দিঘীর ইট, দরদরিয়ার রাণীর ভিটার দেয়ালের ইট, চিনাশুখানিয়ার বান্দাবাড়িতে মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকা চন্ডাল রাজার প্রাসাদের ধ্বংসাবশেষ, এগুলো কি মিথের ইট? গবেষণা না করে, মাটি না খুঁড়ে, প্রমাণ সংগ্রহের চেষ্টা না করে কিছুকে জনশ্রুতি বলে দেওয়া অলসতা, না অজ্ঞতা?

কাপাসিয়ার পোড়াবাজারের পোড়া রাজার প্রাসাদের ইট আজও আশেপাশের নলকূপ আর গোসলখানার মেঝেতে। শত শত বছর ধরে ইতিহাস এভাবেই সরে গেছে। কথিত মিথের ইট বাড়ির উঠানে, আর মিথের দিঘী যাচ্ছে ব্যক্তির দখলে। এই দুটো ঘটনা আলাদা নয়, একই অবহেলার দুটো রূপ।

দরদরিয়া গ্রামের কথা একটু বলা দরকার। ইতিহাসে এটি একটি শহর ছিল, টেলরের বিবরণেও এর উল্লেখ আছে। এই গ্রামেই আমার পূর্বপুরুষদের বসবাস ছিল, তারাই ছিলেন এই ইতিহাসের প্রথম সাক্ষী। সেই দরদরিয়ায় নাসির উদ্দিন শাহের আমলে নির্মিত একটি পাকা মসজিদ ছিল। পাঁচ বছর আগে সেই মসজিদ ভেঙে ফেলা হয়েছে। নতুন ইট দিয়ে নতুন মসজিদ উঠেছে। ইতিহাসের প্রতি ঈর্ষান্বিত মানুষই ইতিহাসের চিহ্ন মুছে ফেলে। অন্যের অতীতকে যারা ধারণ করতে পারে না, তারাই এই কাজ করে। আর সেই মানুষগুলোই আজ ক্ষমতার আশেপাশে ঘুরছে, কাউকে না কাউকে ইতিহাস শেখাতে চাইছে।

গাজীপুর জুড়ে ভাওয়াল জমিদারের অনেক দিঘী আজ ব্যক্তির নামে রেকর্ড হয়ে গেছে। ভূমি অফিসের অসাধু কর্মকর্তাদের সাথে যোগসাজশ করে, সার্ভেয়ারকে ঘুষ দিয়ে, নামজারি করিয়ে নেওয়া হয়েছে। এটা ভুলক্রমে হয়নি। পরিকল্পিতভাবে হয়েছে। আর এই পরিকল্পনা তখনই সফল হয়, যখন রাষ্ট্র চোখ বন্ধ করে থাকে।

শিশুপাল বৌদ্ধ ছিলেন, জৈন ছিলেন, হিন্দু ছিলেন, বাঙালি ছিলেন, কোচ ছিলেন, তাঁর নাম শিশুপাল ছিল না কিশোরপাল, সময়কাল সাতশো বছর আগের না হাজার বছরের আগের, এই বিতর্ক পরে হবে। আগে প্রশ্ন হোক, এই দিঘী কি সংরক্ষণের দাবি রাখে কি রাখে না। যদি রাখে, তাহলে বিক্রির সাইনবোর্ড নামাতে হবে। প্রত্নতাত্ত্বিক সাইনবোর্ড লাগাতে হবে। ইটগুলো নিয়ে গবেষণা করতে হবে। বরেন্দ্র আর ভাওয়াল বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রাচীন জনপদ। এই মাটির নিচেই লুকিয়ে আছে বাংলাদেশের আদি ইতিহাস। সেই ইতিহাসকে মাটিচাপা দিয়ে রাখা মানে নিজের শিকড়কেই অস্বীকার করা।

কাপাসিয়ার কপালেশ্বরে শিশুপালের দিঘীর পাশে এখন ক্রয়-বিক্রয়ের সাইনবোর্ড। প্রত্নতাত্ত্বিক সংরক্ষণের নয়, সরকারি অধিগ্রহণের নয়, একটা সাধারণ জমি বিক্রির বিজ্ঞাপন। ১৮৪০ সালে জেমস টেলর যে দিঘীর পাশে ইটের স্তুপ দেখেছিলেন, সেই দিঘী আজ “ব্যক্তি মালিকানাধীন সম্পত্তি”। এই লজ্জা কার?

টেলর তাঁর A Sketch of the Topography and Statistics of Dacca বইয়ে লিখেছিলেন, শিশুপালের রাজধানীর কাছে একটি চমৎকার জলাশয় এবং ইট ও মাটির ঢিপি বিদ্যমান। মোহাম্মদ আসাদুজ্জামানের বাংলা অনুবাদে সেই বিবরণ পড়লে বোঝা যায়, এটা কেবল একটা গ্রামীণ পুকুরের কথা নয়। দুইশো বছর আগে একজন ব্রিটিশ সার্জন এই স্থানকে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ মনে করে নথিভুক্ত করে গেছেন। আর আজ, স্বাধীন বাংলাদেশে, সেই দিঘীর পাড়ে বিক্রির বিজ্ঞপ্তি ঝুলছে।

এখন ক্ষমতায় যারা আছেন, তারা ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সালের একটি নির্বাচনের মাধ্যমে এসেছেন। সেই নির্বাচনে দেশের প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো অংশ নেয়নি। সাধারণ মানুষ সেই ভোটকে প্রত্যাখ্যান করেছে। জিয়াউর রহমানের তৈরি বিএনপি, যার জন্ম সেনানিবাসের ছায়ায়, সেই দল এখন মন্ত্রিপরিষদ গঠন করে দেশ চালাচ্ছে। আর এই সরকারের আমলে শিশুপালের দিঘী বিক্রি হয়ে যাচ্ছে, কেউ টের পাচ্ছে না। অন্তত সরকারিভাবে কেউ টের পেতে চাইছে না।

বিএনপি এবং তার তথাকথিত মন্ত্রিসভার কাছে প্রশ্ন একটাই, সিএস জরিপে ভুলে কোনো ব্যক্তির নামে রেকর্ড হলে সেটা সংশোধনের সুযোগ ছিল জরিপের পরপরই আপিলের সময়। সেটা হয়নি। কিন্তু এখনো তো অধিগ্রহণের পথ বন্ধ নয়। ঐতিহাসিক গুরুত্বসম্পন্ন যেকোনো স্থান রাষ্ট্র চাইলে অধিগ্রহণ করতে পারে। সেই সদিচ্ছা কোথায়? দেশপ্রেম আর ইতিহাস-ঐতিহ্যের কথা যারা মুখে বলেন, তাদের ক্ষমতায় থাকার সময় যখন এই ঐতিহ্য বিক্রি হয়, তখন তাদের মুখের কথার দাম কতটুকু?

ভাওয়াল অঞ্চলের ইতিহাস নিয়ে একাডেমিক মহলের যে উদাসীনতা, সেটাও এই পুরো চিত্রের অংশ। রমেশচন্দ্র মজুমদার বা নীহাররঞ্জন রায়রা শত বছর আগে ভাওয়ালকে গুরুত্ব দেননি, তাই এখনো একদল পণ্ডিত এই অঞ্চলের ইতিহাসকে জনশ্রুতি বলে হাসেন। কিন্তু কর্ণপুরের দুটি দিঘীর ইট, শ্রীপুরের উয়াদ্দিদিয়া দিঘীর ইট, দরদরিয়ার রাণীর ভিটার দেয়ালের ইট, চিনাশুখানিয়ার বান্দাবাড়িতে মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকা চন্ডাল রাজার প্রাসাদের ধ্বংসাবশেষ, এগুলো কি মিথের ইট? গবেষণা না করে, মাটি না খুঁড়ে, প্রমাণ সংগ্রহের চেষ্টা না করে কিছুকে জনশ্রুতি বলে দেওয়া অলসতা, না অজ্ঞতা?

কাপাসিয়ার পোড়াবাজারের পোড়া রাজার প্রাসাদের ইট আজও আশেপাশের নলকূপ আর গোসলখানার মেঝেতে। শত শত বছর ধরে ইতিহাস এভাবেই সরে গেছে। কথিত মিথের ইট বাড়ির উঠানে, আর মিথের দিঘী যাচ্ছে ব্যক্তির দখলে। এই দুটো ঘটনা আলাদা নয়, একই অবহেলার দুটো রূপ।

দরদরিয়া গ্রামের কথা একটু বলা দরকার। ইতিহাসে এটি একটি শহর ছিল, টেলরের বিবরণেও এর উল্লেখ আছে। এই গ্রামেই আমার পূর্বপুরুষদের বসবাস ছিল, তারাই ছিলেন এই ইতিহাসের প্রথম সাক্ষী। সেই দরদরিয়ায় নাসির উদ্দিন শাহের আমলে নির্মিত একটি পাকা মসজিদ ছিল। পাঁচ বছর আগে সেই মসজিদ ভেঙে ফেলা হয়েছে। নতুন ইট দিয়ে নতুন মসজিদ উঠেছে। ইতিহাসের প্রতি ঈর্ষান্বিত মানুষই ইতিহাসের চিহ্ন মুছে ফেলে। অন্যের অতীতকে যারা ধারণ করতে পারে না, তারাই এই কাজ করে। আর সেই মানুষগুলোই আজ ক্ষমতার আশেপাশে ঘুরছে, কাউকে না কাউকে ইতিহাস শেখাতে চাইছে।

গাজীপুর জুড়ে ভাওয়াল জমিদারের অনেক দিঘী আজ ব্যক্তির নামে রেকর্ড হয়ে গেছে। ভূমি অফিসের অসাধু কর্মকর্তাদের সাথে যোগসাজশ করে, সার্ভেয়ারকে ঘুষ দিয়ে, নামজারি করিয়ে নেওয়া হয়েছে। এটা ভুলক্রমে হয়নি। পরিকল্পিতভাবে হয়েছে। আর এই পরিকল্পনা তখনই সফল হয়, যখন রাষ্ট্র চোখ বন্ধ করে থাকে।

শিশুপাল বৌদ্ধ ছিলেন, জৈন ছিলেন, হিন্দু ছিলেন, বাঙালি ছিলেন, কোচ ছিলেন, তাঁর নাম শিশুপাল ছিল না কিশোরপাল, সময়কাল সাতশো বছর আগের না হাজার বছরের আগের, এই বিতর্ক পরে হবে। আগে প্রশ্ন হোক, এই দিঘী কি সংরক্ষণের দাবি রাখে কি রাখে না। যদি রাখে, তাহলে বিক্রির সাইনবোর্ড নামাতে হবে। প্রত্নতাত্ত্বিক সাইনবোর্ড লাগাতে হবে। ইটগুলো নিয়ে গবেষণা করতে হবে। বরেন্দ্র আর ভাওয়াল বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রাচীন জনপদ। এই মাটির নিচেই লুকিয়ে আছে বাংলাদেশের আদি ইতিহাস। সেই ইতিহাসকে মাটিচাপা দিয়ে রাখা মানে নিজের শিকড়কেই অস্বীকার করা।

আরো পড়ুন

সর্বশেষ