দেশে হঠাৎ হামের প্রাদুর্ভাব বেড়ে যাওয়ায় জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। তবে এই সংকট মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার বদলে আওয়ামী লীগ সরকারকে দায়ী করছে বিএনপি। তবে তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এই দায় পুরোটাই ইউনূসের ওপর বর্তায়।
সম্প্রতি স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনের ‘গত ৮ বছর দেশে হামের টিকা দেওয়া হয়নি’ এমন মন্তব্যকে ‘ডাহা মিথ্যাচার’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। অন্যদিকে, সময়মতো টিকা সরবরাহে ব্যর্থতার জন্য ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে বিএনপি।
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক ওষুধ শিল্প মেলার উদ্বোধনকালে স্বাস্থ্যমন্ত্রী দাবি করেন, গত আট বছর দেশে হামের কোনো ভ্যাকসিন দেওয়া হয়নি। অথচ সরকারি তথ্য এবং ইউনিসেফের প্রতিবেদন বলছে ভিন্ন কথা। ২০১৯ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা DTP3 এবং MCV1 (হামের প্রথম ডোজ) ভ্যাকসিনে উচ্চ সফলতার জন্য গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাক্সিনেশন অ্যান্ড ইমিউনাইজেশন (GAVI) থেকে ‘ভ্যাকসিন হিরো’ পুরস্কারে ভূষিত হয়েছিল।
ফ্যাক্টচেক প্রতিষ্ঠান ‘ডিসমিসল্যাব’-এর অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ২০২০ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২১ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত দেশব্যাপী বিশাল আকারে হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি পালিত হয়েছিল। ইউনিসেফের তথ্যমতে, সেই অভিযানে প্রায় ৩ কোটি ৬০ লক্ষ শিশুকে টিকা দেওয়া হয়। এমনকি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের মাসিক সভার কার্যবিবরণীও প্রমাণ করে যে, করোনাকালের মধ্যেও এই টিকাদান কার্যক্রম সফলভাবে পরিচালিত হয়েছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর এমন ভুল তথ্য প্রদানকে রাজনৈতিক দায় এড়ানোর কৌশল হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিএনপির স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক মো. রফিকুল ইসলাম রাজশাহীতে এক সংবাদ সম্মেলনে বর্তমান পরিস্থিতির জন্য সরাসরি অন্তর্বর্তী সরকারকে দায়ী করেছেন। তিনি জানান, চলতি বছরের শুরুতেই রোহিঙ্গা ক্যাম্পে হাম শনাক্ত হলেও সরকার সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারেনি।
অভিযোগ উঠেছে যে, ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রচলিত প্রক্রিয়ায় টিকা সংগ্রহ করা হলেও বর্তমান সরকার হঠাৎ করে অন্য একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে টিকা কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় জটিলতা তৈরি হয়। এই প্রাতিষ্ঠানিক রদবদল এবং টিকাদান সংশ্লিষ্ট কর্মীদের আন্দোলনের কারণে মাঠ পর্যায়ে কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে, যার ফলে শিশুদের মধ্যে সংক্রমণের ঝুঁকি চরম আকার ধারণ করেছে।
ইউনিসেফের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) একসময় অনেক উন্নত হলেও এখনো প্রায় ৪ লাখ শিশু সব ডোজ টিকা পাচ্ছে না। এর মধ্যে ৭০ হাজার শিশু একটি টিকাও পায়নি। বিশেষ করে শহরের বস্তি এলাকা এবং দুর্গম অঞ্চলে টিকাদানের হার উদ্বেগজনকভাবে কম।
স্বাস্থ্য খাতের এই নাজুক অবস্থায় সরকারের দায়িত্বশীল পর্যায় থেকে ভুল তথ্য প্রদান সাধারণ মানুষের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মিথ্যাচারের সংস্কৃতি পরিহার করে দ্রুত টিকা সরবরাহ নিশ্চিত না করলে দেশ এক ভয়াবহ স্বাস্থ্য ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

