বাংলাদেশ একসময় বিশ্বে টিকাদান কর্মসূচির রোল মডেল হিসেবে প্রশংসিত হয়েছিল। GAVI-এর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থা দেশের টিকাদান সাফল্যকে স্বীকৃতি দিয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা-কে “Vaccine Hero” পুরস্কারে ভূষিত করেছিল ২০১৯ সালে। সেই অর্জন ছিল কেবল একটি সরকারের নয়, বরং একটি রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি জনস্বাস্থ্য বিনিয়োগের ফল।
কিন্তু আজকের বাস্তবতা নির্মম। রাজধানীর একটি সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালেই মাত্র এক মাসে ১৯ শিশুর মৃত্যু— এটা শুধু স্বাস্থ্যখাতের সংকট নয়, বরং নীতিনির্ধারণের ভয়াবহ ব্যর্থতার প্রতীক। প্রশ্ন হচ্ছে, কোথায় ভেঙে পড়লো সেই সাফল্যের কাঠামো?
প্রথমত, বর্তমান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল সরকারের বক্তব্য ও বাস্তবতার মধ্যে স্পষ্ট বৈপরীত্য দেখা যাচ্ছে। একদিকে তারা দাবি করছে দীর্ঘদিন টিকা দেওয়া হয়নি, অন্যদিকে চিকিৎসকেরা বলছেন—নিয়মিত বুস্টার ডোজ বন্ধ থাকা, টিকার ঘাটতি এবং পরিকল্পনার অভাবই বর্তমান প্রাদুর্ভাবের মূল কারণ। যদি সত্যিই ৮ বছর টিকা না দেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে এই সরকারের দায়িত্ব কী ছিল? ক্ষমতায় এসে কি তারা সেই ঘাটতি পূরণে জরুরি পদক্ষেপ নিয়েছে?
দ্বিতীয়ত, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকেই স্বাস্থ্যখাতে শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ার লক্ষণ স্পষ্ট ছিল। টিকা সরবরাহ চেইন দুর্বল হয়ে পড়ে, মাঠপর্যায়ে নজরদারি কমে যায়, এবং জনসচেতনতা কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে। একটি দেশের টিকাদান কর্মসূচি কখনোই “একবার সফল হলেই শেষ”— এমন কোনো বিষয় নয়; এটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া, যেখানে সামান্য গাফিলতিও বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
তৃতীয়ত, বর্তমান সরকারের নীতি প্রতিক্রিয়া মূলত প্রতিক্রিয়াশীল, প্রোঅ্যাকটিভ নয়। যখন হাসপাতাল ভর্তি, শিশুমৃত্যু বাড়ছে— তখন বাজেট বরাদ্দের ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো: সংকট তৈরি হওয়ার আগেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা কোথায় ছিল?
আরও উদ্বেগজনক হলো, সরকারের পক্ষ থেকে দায় স্বীকারের পরিবর্তে দায় এড়ানোর প্রবণতা। রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়ে অতীতকে দোষারোপ করা সহজ, কিন্তু বাস্তবতা হলো—রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব বর্তমানে যাদের হাতে, ব্যর্থতার দায়ও তাদেরই নিতে হবে।
এই পরিস্থিতি আমাদের একটি কঠিন সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়: উন্নয়ন শুধু পুরস্কার জেতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং সেই অর্জনকে ধরে রাখার সক্ষমতার মধ্যেই প্রকৃত নেতৃত্বের পরিচয়। একসময় যে দেশ টিকাদানে বিশ্বকে পথ দেখিয়েছে, আজ সেই দেশেই শিশুমৃত্যুর খবর শিরোনাম হচ্ছে—এটা কেবল দুঃখজনক নয়, লজ্জাজনকও।
স্বাস্থ্যখাত নিয়ে রাজনৈতিক বাকযুদ্ধ নয়, প্রয়োজন জবাবদিহিতা, ধারাবাহিকতা এবং বাস্তবভিত্তিক নীতি। নইলে “ভ্যাকসিন হিরো” থেকে “হাম আতঙ্ক”—এই পতনের গল্প আরও দীর্ঘ হবে, আর তার মাশুল গুনতে হবে নিরীহ শিশুদেরই।

