২০২৬ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রফতানি ইউরোপীয় ইউনিয়নে ২৫ শতাংশেরও বেশি কমে গেছে। এক বছরের ব্যবধানে প্রায় ৪৮০ মিলিয়ন ইউরো উবে গেছে। গার্মেন্টস শ্রমিকের ঘামে ভেজা এই টাকাটার কথা মনে পড়লে খারাপ লাগে, কিন্তু যাদের হাতে এখন দেশের চাবিকাঠি, তারা এসব নিয়ে যে খুব একটা ভাবছে, তার প্রমাণ মেলা ভার।
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের কথা মনে আছে নিশ্চয়ই। দেশের বড় বড় রাজনৈতিক দলগুলো সেই নির্বাচনে ছিল না। জনগণের বড় অংশ ভোট দিতে যায়নি। কিন্তু সেই ফাঁকা মাঠে গোল দিয়ে বিএনপি এখন ক্ষমতায়। ক্যান্টনমেন্টে জন্ম নেওয়া এই দলটি কীভাবে ক্ষমতায় এসেছে, সেটা দেশের মানুষ জানে। তারপরও এই সরকারের মন্ত্রীরা এখন বড় বড় কথা বলছেন অর্থনীতি নিয়ে, উন্নয়ন নিয়ে।
পোশাক খাতের এই ধস কিন্তু শুধু বৈশ্বিক বাজারের সমস্যা বলে চালিয়ে দেওয়া যাবে না। হ্যাঁ, ইউরোপের বাজারে সামগ্রিক আমদানি কমেছে ১৫ শতাংশের মতো। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষতি হয়েছে ২৫ শতাংশ। মানে বাংলাদেশ শুধু বৈশ্বিক সংকটের শিকার হয়নি, বাংলাদেশ বৈশ্বিক সংকটের চেয়েও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই পার্থক্যটা কে তৈরি করল? ভিয়েতনাম, ভারত, ইন্দোনেশিয়া সবাই কম রফতানি করেছে ঠিকই, কিন্তু তারা অন্তত ইউনিট মূল্য ধরে রাখতে পেরেছে, কেউ কেউ বাড়াতেও পেরেছে। বাংলাদেশ সেটা পারেনি। পরিমাণেও কমেছে, দামেও কমেছে। দুই দিক থেকে মার খেয়েছে এই শিল্প।
এই সরকারের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এই কয় মাসে ঠিক কী করেছে? ইউরোপের ক্রেতাদের সঙ্গে কোনো কার্যকর আলোচনা হয়েছে? নতুন বাজার ধরার জন্য কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে? নাকি মন্ত্রীরা ব্যস্ত ছিলেন আওয়ামী লীগক্র গালি দিতে আর নিজেদের ক্ষমতার বৈধতা প্রমাণ করতে?
বিএনপির ইতিহাস দেখলে এই পরিচিত দৃশ্য চেনা যায়। দুর্নীতি আর লুটপাটের যে সংস্কৃতি এই দলটি বাংলাদেশে চালু করেছিল, সেটা তারা বহন করে চলেছে। এই মুহূর্তে পোশাক খাতের ব্যবসায়ীরা যখন মাথায় হাত দিয়ে বসে আছেন, যখন কারখানায় অর্ডার কমছে, শ্রমিকদের কাজের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে, তখন এই সরকার কোথায়?
পাকিস্তান পরিমাণে ৪৯ শতাংশ বেশি পোশাক পাঠিয়েছে ইউরোপে, যদিও দাম কমিয়ে। মানে পাকিস্তান অন্তত চেষ্টা করেছে বাজার ধরে রাখতে। বাংলাদেশ দাম কমিয়েছে, পরিমাণও কমেছে। এর চেয়ে খারাপ ফলাফল আর কী হতে পারে?
ইউনুস সরকার যা রেখে গেছে, তার উপর দাঁড়িয়ে বিএনপি যদি এই শিল্পকে আরও গভীর সংকটে ফেলে, তাহলে দায়টা পুরোপুরি তাদের। অর্থনীতির এই জায়গায় ব্যর্থতা মানে লাখো শ্রমিকের জীবনে সরাসরি আঘাত। সেই মানুষগুলোর বেশিরভাগই মেয়ে, যারা সারাদিন মেশিনের সামনে বসে এই দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয় করেন। তাদের কথা ভাবার সময় এই সরকারের নেই, কারণ তাদের মাথায় এখন অন্য হিসাব।
২০২৬ সালের প্রথম মাসেই এই অবস্থা। বছরের বাকি সময়টায় কী হবে, ভাবলে দুশ্চিন্তায় রাতের ঘুম উড়ে যাচ্ছে।

