১৯৭১ সালের মার্চ মাস ছিল বাঙালির হাজার বছরের বঞ্চনা ঘোচানোর এক অগ্নিঝরা অধ্যায়। আজ ১৭ মার্চ; ১৯২০ সালের এই দিনে টুঙ্গিপাড়ার নিভৃত পল্লীতে জন্মেছিলেন সেই মহানায়ক, যিনি হয়ে উঠেছিলেন বাঙালির আশা-আকাঙ্ক্ষার মূর্ত প্রতীক। তবে ১৯৭১ সালের ১৭ মার্চ ছিল অন্য সব জন্মদিনের চেয়ে আলাদা। ৫২তম জন্মদিনে কোনো আয়োজন ছিল না, ছিল কেবল শোষিত মানুষের মুক্তির জন্য এক ইস্পাতকঠিন শপথ। বঙ্গবন্ধু ও বাঙালি জাতি সেদিন জন্মদিনের আনন্দকে রূপান্তর করেছিল স্বাধীনতার আন্দোলনে।
আমার জীবন আমি আমার মানুষের জন্য উৎসর্গ করেছি
১৭ মার্চ সকালে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাসভবনে যখন বিদেশি সাংবাদিকরা বঙ্গবন্ধুকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাতে যান, তখন তিনি বিষণ্ণ কিন্তু দৃঢ়কণ্ঠে বলেছিলেন, “আমি আমার জন্মদিন পালন করি না। আমার জন্মদিনে আনন্দের কী আছে? আমার মানুষের আজ জীবন বিপন্ন।” বঙ্গবন্ধু ও বাঙালি জাতি সেদিন এমন এক বন্ধনে আবদ্ধ ছিল যে, নেতার জন্মদিন হয়ে উঠেছিল জনগণের মুক্তির শপথ নেওয়ার দিন। এদিনও প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সাথে বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় দফা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়, কিন্তু বাঙালির নেতা স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, কোনো সামরিক শাসন বা দয়া নয়, বরং সাত কোটি বাঙালির পূর্ণ স্বাধীনতা ও অধিকারই একমাত্র কাম্য।
অসহযোগ আন্দোলনের তীব্রতা ও জনজোয়ার
১৭ মার্চ ছিল অসহযোগ আন্দোলনের সপ্তদশ দিন। সারা দেশ তখন অচল, কেবল বঙ্গবন্ধুর নির্দেশেই চলছে সবকিছু। হাজার হাজার মানুষ ফুল নয়, বরং লড়াইয়ের স্লোগান নিয়ে ৩২ নম্বরের সামনে জড়ো হয়েছিলেন। ছোট ছোট শিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধ—সবার মুখে ছিল এক ধ্বনি, “জয় বাংলা”। বঙ্গবন্ধু বারান্দায় এসে বারবার হাত নেড়ে জনতার অভিবাদন গ্রহণ করছিলেন। তিনি সেদিন প্রমাণ করেছিলেন যে, বাঙালির প্রতিটি মানুষই তাঁর পরিবারের সদস্য। বঙ্গবন্ধু ও বাঙালি জাতি সেদিন একই সত্তায় লীন হয়ে গিয়েছিল।
আলোচনার আড়ালে ষড়যন্ত্র ও প্রতিরোধের প্রস্তুতি
১৭ মার্চের সেই রুদ্ধদ্বার বৈঠকে আলোচনার পাশাপাশি ষড়যন্ত্রের জালও বোনা হচ্ছিল। কিন্তু বঙ্গবন্ধু ছিলেন দূরদর্শী। তিনি জানতেন পাকিস্তানিরা সময়ক্ষেপণ করছে। তাই তিনি জনতাকে যুদ্ধের চূড়ান্ত প্রস্তুতির নির্দেশ দেন। এদিন ছাত্রনেতারা ‘জয় বাংলা বাহিনী’র তৎপরতা আরও বাড়িয়ে দেন। বিশ্ববাসী দেখছিল, একজন মানুষের জন্মদিনে কীভাবে একটি পুরো জাতি নতুনভাবে জন্ম নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
আজ ২০২৬ সালের ১৭ মার্চে দাঁড়িয়ে আমরা যখন জাতির পিতার ১০৬তম জন্মবার্ষিকী ও জাতীয় শিশু দিবস পালন করছি, তখন সেই উত্তাল ১৯৭১-এর স্মৃতি আমাদের রক্তে নাচন জাগায়। বঙ্গবন্ধু যে স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়তে চেয়েছিলেন, আজ তাঁরই সুযোগ্য নেতৃত্বে আমরা বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছি।
বঙ্গবন্ধু ও বাঙালি জাতি অবিচ্ছেদ্য। ১৭ মার্চ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বঙ্গবন্ধু মানেই বাংলাদেশ। তাঁর ত্যাগ, সাহস ও দেশপ্রেমই আমাদের জাতীয় সত্তার মূল ভিত্তি। আজকের এই দিনে আমাদের অঙ্গীকার হোক—বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে বুকে ধারণ করে একটি বৈষম্যহীন, আধুনিক ও স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ে তোলা।

