১৯৭১ সালের মার্চ মাস ছিল বাঙালি জাতির জন্য অধিকার আদায়ের এক অগ্নিপরীক্ষা। ৭ মার্চের সেই ঐতিহাসিক ঘোষণার পর থেকে পুরো দেশ পরিচালিত হচ্ছিল জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একক নেতৃত্বে। আজ ১৫ মার্চ; ১৯৭১ সালের এই দিনে বাঙালির অসহযোগ আন্দোলন এমন এক চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, খোদ পাকিস্তান সরকারকে আলোচনার টেবিলে বসার জন্য ঢাকায় আসতে বাধ্য হতে হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু ও বাঙালি জাতি সেদিন এক ইস্পাতকঠিন ঐক্যের মাধ্যমে বিশ্বকে দেখিয়েছিল যে, একটি জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণের আকাঙ্ক্ষাকে বুলেট দিয়ে স্তব্ধ করা যায় না।
১৫ মার্চ ছিল অসহযোগ আন্দোলনের পাক্ষিক পূর্ণতার দিন। এদিন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এক ঐতিহাসিক বিবৃতি জারি করেন। এই বিবৃতিতে তিনি ৩৫টি সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা প্রদান করেন, যা ছিল মূলত একটি স্বাধীন রাষ্ট্র পরিচালনার পূর্ণাঙ্গ গাইডলাইন। পাকিস্তান সরকারের কেন্দ্রীয় সচিবালয় যখন অচল, তখন বঙ্গবন্ধুর ৩২ নম্বরের বাসভবন থেকে আসা এই ৩৫ দফাই হয়ে উঠেছিল বাঙালির একমাত্র আইন।
খাজনা-ট্যাক্স আদায় বন্ধ রাখা থেকে শুরু করে বেসামরিক প্রশাসন পরিচালনার প্রতিটি খুঁটিনাটি সেখানে উল্লেখ ছিল। বঙ্গবন্ধু ও বাঙালি জাতি সেদিন প্রমাণ করেছিল, তারাই এই ভূখণ্ডের প্রকৃত শাসক।
১৫ মার্চ বিকেলে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান কড়া সামরিক পাহারায় ঢাকা বিমানবন্দরে অবতরণ করেন। কিন্তু যে ঢাকার রাজপথ একসময় তাকে তোষামোদ করত, সেই ঢাকা সেদিন ছিল নিস্তব্ধ এবং ঘাতকের প্রতি ঘৃণায় পূর্ণ। কালো পতাকা এবং “জয় বাংলা” স্লোগানে মুখরিত রাজপথ ইয়াহিয়াকে মনে করিয়ে দিয়েছিল যে, তিনি কোনো অনুগত প্রদেশে নন, বরং একটি বিদ্রোহী জাতির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছেন। বঙ্গবন্ধু তখন স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলেন, কোনো প্রকার আপস নয়, বরং বাঙালির মুক্তি ও অধিকারের প্রশ্নই হবে আলোচনার মূল ভিত্তি।
১৫ মার্চের সেই ক্ষণে বাঙালির প্রতিটি ঘরে ঘরে তখন দুর্গ গড়ে তোলার প্রস্তুতি চলছিল। ছাত্র ও যুব সমাজ ট্রেনিং নিতে শুরু করেছিল। শিল্পী, সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীরা বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের প্রতি অবিচল থেকে স্বাধীনতা যুদ্ধের মানসিক প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। বঙ্গবন্ধু ও বাঙালি জাতির এই যে অভূতপূর্ব মেলবন্ধন, তা আসন্ন ১৬ ডিসেম্বর বা চূড়ান্ত বিজয়ের পথকে প্রশস্ত করে দিয়েছিল।
আজ ২০২৬ সালের এই ১৫ মার্চে দাঁড়িয়ে আমরা যখন উন্নয়নের মহাসড়কে প্রবহমান বাংলাদেশের গর্বিত নাগরিক, তখন সেই উত্তাল দিনগুলোর কথা আমাদের প্রেরণা জোগায়। বঙ্গবন্ধু যে শোষিত বাঙালির মুখে হাসি ফোটানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন, আজ আমরা সেই স্বপ্নের সফল বাস্তবায়নের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি।
বঙ্গবন্ধু ও বাঙালি জাতি এক অবিচ্ছেদ্য সত্তা। ১৫ মার্চের সেই হার না মানা জেদ এবং একাত্মতা আমাদের শিখিয়ে দেয় যে, ন্যায়ের পথে লড়াই করলে জয় অনিবার্য। বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে পাথেয় করে উন্নত ও স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণই হোক আমাদের আগামীর অঙ্গীকার।

