রাজনীতিতে ‘শেষ কথা’ বলে কিছু নেই—এই প্রবাদটি যেন আরও একবার সত্য হলো ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী পাইপলাইনের ক্ষেত্রে। শেখ হাসিনা সরকারের আমলে যে পাইপলাইনকে ‘দেশের স্বার্থ বিকিয়ে দেওয়ার’ প্রকল্প হিসেবে কঠোর সমালোচনা করেছিল তৎকালীন বিরোধী দলগুলো, আজ সেই একই পাইপলাইন ব্যবহার করে জ্বালানি সংকট মোকাবিলার পথে হাঁটছে বর্তমান প্রশাসন।
২০২৩ সালে যখন শিলিগুড়ি থেকে পার্বতীপুর পর্যন্ত এই ১৩১.৫ কিলোমিটার দীর্ঘ ডিজেল পাইপলাইনটি উদ্বোধন করা হয়, তখন বিএনপি ও সমমনা দলগুলোর পক্ষ থেকে একে ‘একতরফা স্বার্থ রক্ষা’র চুক্তি হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছিল। এমনকি রাজপথের সভা-সমাবেশে একে ভারতের ওপর বাংলাদেশের জ্বালানি সার্বভৌমত্ব সপে দেওয়ার শামিল বলে আক্রমণ করা হয়েছিল।
তবে ২০২৪-এর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর চিত্রটি বদলে গেছে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার এখন বাস্তবমুখী নীতির কথা বলছেন। বিশ্ববাজারে তেলের উচ্চমূল্য এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার (যেমন বর্তমান ইরান যুদ্ধ পরিস্থিতি) কারণে ভারত থেকে পাইপলাইনে দ্রুত ও সস্তায় তেল আনাকেই এখন সবচেয়ে নিরাপদ বিকল্প হিসেবে দেখা হচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এর পেছনে তিনটি প্রধান কারণ দেখছেন:
সাশ্রয়ী পরিবহন: ট্রেনে বা জাহাজে করে তেল আমদানির চেয়ে পাইপলাইনে প্রতি ব্যারেলে প্রায় ৬-৭ ডলার সাশ্রয় হয়। বর্তমান ভঙ্গুর অর্থনীতির জন্য এই সাশ্রয় অপরিহার্য।
উত্তরবঙ্গের সেচ সংকট: সামনে বোরো মৌসুম। উত্তরবঙ্গের ১৬ জেলায় নিরবচ্ছিন্ন ডিজেল সরবরাহ না থাকলে কৃষি উৎপাদন মারাত্মক ব্যাহত হতে পারে। পাইপলাইন ছাড়া এত দ্রুত বিপুল পরিমাণ তেল সরবরাহ করা প্রায় অসম্ভব।
বাস্তব রাজনীতি : বিরোধী দলে থাকাকালীন ভারত-বিরোধিতা একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক কার্ড হলেও, ক্ষমতায় বা নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে এলে জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা মেনে নিতে হচ্ছে।
সম্প্রতি বিএনপি ঘরানার অর্থনীতিবিদ এবং দলটির প্রভাবশালী নেতারা ভারতের সাথে থাকা এই জ্বালানি চুক্তির উপযোগিতা স্বীকার করছেন। যদিও তারা বলছেন, “চুক্তিটি স্বচ্ছ হওয়া উচিত ছিল,” তবুও তারা পাইপলাইনটি বন্ধ করার পরিবর্তে একে ব্যবহারের মাধ্যমেই জ্বালানি সরবরাহ সচল রাখতে আগ্রহী। এমনকি পাইপলাইনের মাধ্যমে আরও অতিরিক্ত তেল আমদানির প্রস্তাবও বর্তমান সরকারের পক্ষ থেকে বিবেচনা করা হচ্ছে।
এক সময় শেখ হাসিনাকে এই প্রকল্পের জন্য ‘ভারতের দালাল’ আখ্যা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আজ যখন বিএনপি সরকার ক্ষমতায়, তখন সেই একই পাইপলাইন তাদের ভরসা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

