১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ মধ্যরাতে ‘অপারেশন সার্চলাইটের’ প্রধান লক্ষ্যবস্তু ছিল মেধার কেন্দ্রবিন্দু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। পাকিস্তানি সামরিক জান্তা জানত, বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি হলো এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও শিক্ষক সমাজ। তাই সেই কালরাতে এক সুপরিকল্পিত ও নারকীয় তাণ্ডব চালানো হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হল ও কোয়ার্টারগুলোতে।
রাত ১২টার পর পাকিস্তানি বাহিনী ট্যাংক ও স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র নিয়ে জগন্নাথ হল ঘেরাও করে। হলের উত্তর ও দক্ষিণ ব্লকে শুরু হয় বৃষ্টির মতো গুলিবর্ষণ। কামানের গোলার আঘাতে ধসে পড়ে হলের একাংশ। সেই রাতে প্রায় ৬৬ জন ছাত্রকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। সবচেয়ে ভয়াবহ দৃশ্য ছিল হলের মাঠে—যেখানে ছাত্রদের দিয়েই খুঁড়িয়ে তোলা গর্তে তাদের নিজেদেরই সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে গুলি করে মাটিচাপা দেওয়া হয়।
তৎকালীন ইকবাল হলে (বর্তমান শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) ছিল ছাত্রনেতাদের মূল কেন্দ্র। সেখানে পাকিস্তানি সেনারা নির্বিচারে অগ্নিসংযোগ ও গুলিবর্ষণ করে। অন্যদিকে, নারী শিক্ষার্থীদের আবাসস্থল রোকেয়া হলেও চালানো হয় বর্বরতা। যদিও অধিকাংশ ছাত্রী আগেই হল ত্যাগ করেছিলেন, তবুও যারা ছিলেন এবং হলের কর্মচারীদের ওপর অমানুষিক নির্যাতন ও হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়।
কেবল ছাত্র নয়, মেধা ধ্বংস করতে শিক্ষকদের বাসভবনে হানা দেয় ঘাতক দল। সেই রাতেই শহীদ হন ড. গোবিন্দ চন্দ্র দেব, ড. জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা, অধ্যাপক এ এন এম মুনীরুজ্জামান এবং অধ্যাপক ফজলুর রহমানসহ আরও অনেকে। তাঁদের নিজেদের পরিবারের সামনে টেনে হিঁচড়ে বের করে এনে গুলি করা হয়েছিল। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মৃতদেহ শনাক্ত করার সুযোগ পর্যন্ত দেওয়া হয়নি।
সকাল হওয়ার আগেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ চত্বর লাল রক্তে রঞ্জিত হয়ে যায়। চারদিকে কেবল বারুদের গন্ধ আর পোড়া লাশের স্তূপ। এই নৃশংসতার খবর যাতে বাইরে না যায়, সেজন্য আগেভাগেই বিদেশি সাংবাদিকদের হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছিল। তবে সাইমন ড্রিংয়ের মতো সাহসী সাংবাদিকরা প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে সেই ধ্বংসলীলার ছবি ও সংবাদ বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছে দেন।

