৩৪টা সইয়ে বন্দী একটা গ্রাম : হালাল মাইক, হারাম সাউন্ডবক্স

তেররশিয়া পোড়াগ্রামের মসজিদ কমিটি যখন নোটিশ টানিয়ে দিল যে গানবাজনা হারাম, বিয়েতে গীত গাইলে কাজি আসবে না, তখন দেশে সবে নির্বাচনের মৌসুম শেষ হয়েছে। বিএনপি জিতেছে, দুর্নীতির দায়ে লন্ডনে পালিয়ে থাকা তারেক রহমান উড়ে এসে প্রধানমন্ত্রী বনে গেছেন, নতুন সরকার শপথ নিয়েছে। কিন্তু চাঁপাইনবাবগঞ্জের একটা প্রত্যন্ত গ্রামে একদল মানুষ ৩৪টা সই নিয়ে পুরো সমাজের সংস্কৃতি নিষিদ্ধ করে দিচ্ছে, আর নবগঠিত সরকারের টু শব্দ নেই।

এই ৩৪টা সইয়ের দিকে একটু ভালো করে তাকানো দরকার। গ্রামের মানুষ, অনেকে হয়তো পড়তেও পারেন না ঠিকমতো, তাদের কাছ থেকে স্ট্যাম্পে সই নিয়ে ঘোষণা করা হলো পুরো গ্রামে গানবাজনা নিষিদ্ধ। টিপসই নিলে হয়তো আরো সৎ হতো অন্তত। কিন্তু সই দিয়ে একটা বৈধতার আবরণ তৈরি করা হয়েছে, যেটা আসলে ভয় দেখিয়ে নেওয়া হয়েছে কিনা সেটা কেউ জানে না। নোটিশে লেখা “গণসম্মতি”, অথচ গ্রামের নারীরা বলছেন তারা চান না এই নিষেধাজ্ঞা, তরুণরা অখুশি। তাহলে এই গণটা কারা?

এখন মূল প্রশ্নে আসা যাক। মোবাইল ফোন কি ব্যবহার করা যাবে? কারণ ফোনে রিং টোন বাজে। সেটা তো বাদ্যযন্ত্রের শব্দ। ফেসবুক? সেখানে গান ছড়ায়। টিভি? সেখানে তো সারাক্ষণ সংগীত। দোকানদার নিজেই বললেন টিভি আছে কিন্তু গান বাজান না, শুধু ওয়াজ বাজান। তার মানে ডিভাইসটা ঠিক আছে, কনটেন্টের উপর নিষেধাজ্ঞা। কিন্তু কে ঠিক করবে কোন কনটেন্ট হালাল কোনটা হারাম? ওই একই মসজিদ কমিটি?

একসময় ক্যামেরা হারাম ছিল। ছবি তোলা হারাম ছিল। টিভি হারাম ছিল। এখন সেই একই লোকেরা ফেসবুকে লাইভ দেন, ইউটিউবে ওয়াজ দেন, মোবাইলে রাজনৈতিক প্রচার চালান। প্রযুক্তি যখন তাদের কাজে লাগে তখন হালাল, যখন অন্যের আনন্দের বিষয় তখন হারাম। এই দ্বিচারিতার কোনো জবাব কেউ দেয় না।

আর নির্বাচনের কথা তো বলতেই হবে। ভোটের সময় বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে বলা হয় দাঁড়িপাল্লায় ভোট দিলে পরকালে হুর পাবেন, ধানের শীষে ভোট দিলে বেহেশতে জেওর পাবেন। মাইকে রাতভর ওয়াজ করে ঘুম হারাম করা যায়, কিন্তু বিয়েবাড়িতে একটু গীত গাওয়া যাবে না। নির্বাচনী সভায় ঢাক-ঢোল পিটিয়ে মিছিল করা যায়, কিন্তু বিয়েতে সাউন্ডবক্স চলবে না। এই ফারাকটা কোন ইসলামের কিতাবে লেখা আছে?

বিএনপি এখন ক্ষমতায়। ১২ ফেব্রুয়ারি ভোট হলো, ১৭ তারিখে শপথ। কিন্তু চাঁপাইনবাবগঞ্জের এই ঘটনা নিয়ে নতুন সরকারের কোনো স্পষ্ট অবস্থান নেই। পুলিশ গেছে, ব্যানার নামিয়ে এনেছে, এটুকুই। কিন্তু যারা এই নোটিশ দিল, যারা মানুষকে ভয় দেখিয়ে সই নিল, তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা? কিছু না। কারণ ওই ভোটব্যাংকে হাত দিতে নেই।

এটাই আসল সমস্যা। বাংলাদেশে যে সরকারই আসুক, ধর্মীয় রাজনীতিকে ছাড় দেওয়া একটা অলিখিত নিয়ম হয়ে গেছে। মসজিদ কমিটির নামে যখন কেউ একটা গ্রামের সাংস্কৃতিক জীবন বন্ধ করে দেয়, সেটা শুধু গানবাজনার প্রশ্ন না। সেটা একটা মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপনের উপর অন্য মানুষের কর্তৃত্ব জারি করার প্রশ্ন। সেই কর্তৃত্বকে প্রশ্রয় দেওয়া মানে ধীরে ধীরে একটা পুরো সমাজকে ভয়ের মধ্যে ঠেলে দেওয়া।

মার্চ মাস চলছে। নতুন সরকার তিন সপ্তাহ পার করেছে। এই তিন সপ্তাহে চাঁপাইনবাবগঞ্জের পোড়াগ্রামে এখনো গান নেই, বিয়েতে গীত নেই, বাচ্চাদের পিকনিকে সাউন্ডবক্স নেই। এই নীরবতাটাই বলে দেয়, কোন বাংলাদেশে আমরা আছি।

তেররশিয়া পোড়াগ্রামের মসজিদ কমিটি যখন নোটিশ টানিয়ে দিল যে গানবাজনা হারাম, বিয়েতে গীত গাইলে কাজি আসবে না, তখন দেশে সবে নির্বাচনের মৌসুম শেষ হয়েছে। বিএনপি জিতেছে, দুর্নীতির দায়ে লন্ডনে পালিয়ে থাকা তারেক রহমান উড়ে এসে প্রধানমন্ত্রী বনে গেছেন, নতুন সরকার শপথ নিয়েছে। কিন্তু চাঁপাইনবাবগঞ্জের একটা প্রত্যন্ত গ্রামে একদল মানুষ ৩৪টা সই নিয়ে পুরো সমাজের সংস্কৃতি নিষিদ্ধ করে দিচ্ছে, আর নবগঠিত সরকারের টু শব্দ নেই।

এই ৩৪টা সইয়ের দিকে একটু ভালো করে তাকানো দরকার। গ্রামের মানুষ, অনেকে হয়তো পড়তেও পারেন না ঠিকমতো, তাদের কাছ থেকে স্ট্যাম্পে সই নিয়ে ঘোষণা করা হলো পুরো গ্রামে গানবাজনা নিষিদ্ধ। টিপসই নিলে হয়তো আরো সৎ হতো অন্তত। কিন্তু সই দিয়ে একটা বৈধতার আবরণ তৈরি করা হয়েছে, যেটা আসলে ভয় দেখিয়ে নেওয়া হয়েছে কিনা সেটা কেউ জানে না। নোটিশে লেখা “গণসম্মতি”, অথচ গ্রামের নারীরা বলছেন তারা চান না এই নিষেধাজ্ঞা, তরুণরা অখুশি। তাহলে এই গণটা কারা?

এখন মূল প্রশ্নে আসা যাক। মোবাইল ফোন কি ব্যবহার করা যাবে? কারণ ফোনে রিং টোন বাজে। সেটা তো বাদ্যযন্ত্রের শব্দ। ফেসবুক? সেখানে গান ছড়ায়। টিভি? সেখানে তো সারাক্ষণ সংগীত। দোকানদার নিজেই বললেন টিভি আছে কিন্তু গান বাজান না, শুধু ওয়াজ বাজান। তার মানে ডিভাইসটা ঠিক আছে, কনটেন্টের উপর নিষেধাজ্ঞা। কিন্তু কে ঠিক করবে কোন কনটেন্ট হালাল কোনটা হারাম? ওই একই মসজিদ কমিটি?

একসময় ক্যামেরা হারাম ছিল। ছবি তোলা হারাম ছিল। টিভি হারাম ছিল। এখন সেই একই লোকেরা ফেসবুকে লাইভ দেন, ইউটিউবে ওয়াজ দেন, মোবাইলে রাজনৈতিক প্রচার চালান। প্রযুক্তি যখন তাদের কাজে লাগে তখন হালাল, যখন অন্যের আনন্দের বিষয় তখন হারাম। এই দ্বিচারিতার কোনো জবাব কেউ দেয় না।

আর নির্বাচনের কথা তো বলতেই হবে। ভোটের সময় বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে বলা হয় দাঁড়িপাল্লায় ভোট দিলে পরকালে হুর পাবেন, ধানের শীষে ভোট দিলে বেহেশতে জেওর পাবেন। মাইকে রাতভর ওয়াজ করে ঘুম হারাম করা যায়, কিন্তু বিয়েবাড়িতে একটু গীত গাওয়া যাবে না। নির্বাচনী সভায় ঢাক-ঢোল পিটিয়ে মিছিল করা যায়, কিন্তু বিয়েতে সাউন্ডবক্স চলবে না। এই ফারাকটা কোন ইসলামের কিতাবে লেখা আছে?

বিএনপি এখন ক্ষমতায়। ১২ ফেব্রুয়ারি ভোট হলো, ১৭ তারিখে শপথ। কিন্তু চাঁপাইনবাবগঞ্জের এই ঘটনা নিয়ে নতুন সরকারের কোনো স্পষ্ট অবস্থান নেই। পুলিশ গেছে, ব্যানার নামিয়ে এনেছে, এটুকুই। কিন্তু যারা এই নোটিশ দিল, যারা মানুষকে ভয় দেখিয়ে সই নিল, তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা? কিছু না। কারণ ওই ভোটব্যাংকে হাত দিতে নেই।

এটাই আসল সমস্যা। বাংলাদেশে যে সরকারই আসুক, ধর্মীয় রাজনীতিকে ছাড় দেওয়া একটা অলিখিত নিয়ম হয়ে গেছে। মসজিদ কমিটির নামে যখন কেউ একটা গ্রামের সাংস্কৃতিক জীবন বন্ধ করে দেয়, সেটা শুধু গানবাজনার প্রশ্ন না। সেটা একটা মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপনের উপর অন্য মানুষের কর্তৃত্ব জারি করার প্রশ্ন। সেই কর্তৃত্বকে প্রশ্রয় দেওয়া মানে ধীরে ধীরে একটা পুরো সমাজকে ভয়ের মধ্যে ঠেলে দেওয়া।

মার্চ মাস চলছে। নতুন সরকার তিন সপ্তাহ পার করেছে। এই তিন সপ্তাহে চাঁপাইনবাবগঞ্জের পোড়াগ্রামে এখনো গান নেই, বিয়েতে গীত নেই, বাচ্চাদের পিকনিকে সাউন্ডবক্স নেই। এই নীরবতাটাই বলে দেয়, কোন বাংলাদেশে আমরা আছি।

আরো পড়ুন

সর্বশেষ