যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বিতর্কিত ও অসম বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে অবশেষে মুখ খুলেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় স্বাক্ষরিত এই চুক্তিতে দেশের স্বার্থ জলাঞ্জলি দেওয়ার যে অভিযোগ উঠেছে, তার প্রেক্ষিতে তিনি জানিয়েছেন, দেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল— বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর পূর্ণ সম্মতিতেই এই চুক্তি করা হয়েছে।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী পল কাপুরের সাথে বৈঠকের পর ব্রিফিংয়ে খলিলুর রহমান বলেন, “ইউএস ট্রেড রিপ্রেজেন্টেটিভ আমাদের প্রধান দুটি দলের প্রধানের সঙ্গে নির্বাচনের আগেই কথা বলেছেন এবং তারাও এতে সম্মতি দিয়েছিল। সুতরাং এমন না যে, এইটা আমরা অন্ধকারে করেছি।”
উল্লেখ্য, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করা খলিলুর রহমান বর্তমানে বিএনপি সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
বিশ্লেষকরা এই চুক্তিকে ‘দেশবিরোধী’ ও ‘আমদানির কঠিন বাধ্যবাধকতা’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। চুক্তির ধারাগুলো পর্যালোচনা করে দেখা যায়:
বিমানের বোঝা: বাংলাদেশ বিমানকে যুক্তরাষ্ট্রের বোয়িং কোম্পানি থেকে ১৪টি উড়োজাহাজ কিনতে বাধ্য করা হয়েছে।
জ্বালানি খাতে নিয়ন্ত্রণ: আগামী ১৫ বছরে ১৫ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন এলএনজি কেনার শর্তারোপ করা হয়েছে।
কৃষিখাতে বিপর্যয়: বছরে ৭ লাখ টন গম ও ১.২৫ বিলিয়ন ডলারের সয়াবিনসহ মোট ৩.৫ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন কৃষিপণ্য আমদানির লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়েছে, যা দেশীয় কৃষকদের অস্তিত্বের সংকটে ফেলবে।
ভর্তুকি ও শুল্ক লোপ: মার্কিন পণ্যের ওপর থেকে সব শুল্ক তুলে নেওয়া এবং রাষ্ট্রীয় শিল্প সংস্থায় (চিনিকল বা বিটাক) সরকারি ভর্তুকি বন্ধের শর্ত দেওয়া হয়েছে।
ওষুধ শিল্প ও রাজস্বে আঘাত
কঠোর মেধা সম্পদ (আইপি) আইন কার্যকরের শর্তের কারণে বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প হুমকির মুখে পড়বে এবং সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাবে ওষুধের দাম। এছাড়া গুগল-ফেসবুকের মতো মার্কিন টেক জায়ান্টদের ওপর ‘ডিজিটাল সার্ভিস ট্যাক্স’ আরোপ না করার প্রতিশ্রুতি দেওয়ায় রাষ্ট্র হাজার হাজার কোটি টাকার রাজস্ব হারাবে।
ভূ-রাজনৈতিক ও সার্বভৌমত্বের সংকট
চুক্তির ৪.৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, বাংলাদেশ যদি যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থবিরোধী কোনো দেশের (যেমন- চীন) সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি করে, তবে যুক্তরাষ্ট্র এই চুক্তি বাতিল করতে পারবে। এমনকি নির্দিষ্ট দেশ থেকে পারমাণবিক জ্বালানি বা চুল্লি কেনার ক্ষেত্রেও মার্কিন নিষেধাজ্ঞা মানতে বাধ্য করা হয়েছে বাংলাদেশকে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম এই চুক্তিকে ‘জাতিকে বোকা বানানোর শামিল’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি অভিযোগ করেন, শুরুতে প্রচার করা হয়েছিল এটি কেবল শুল্ক কমানোর আলোচনা, কিন্তু চুক্তির বিস্তারিত প্রকাশের পর এর ভয়াবহ রূপ দেখে সংশ্লিষ্ট মহলে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে।

