যুক্তরাজ্য যখন আফগানিস্তান, ক্যামেরুন, মিয়ানমার আর সুদানের নাগরিকদের ভিসা স্থগিত করে দিল, তখন প্রশ্নটা স্বাভাবিকভাবেই উঠল, পরেরটা কে? আর সেই উত্তরে বারবার একটাই নাম আসছে, বাংলাদেশ। এই খবরটা লজ্জার, এই খবরটা তীব্র অস্বস্তির। কিন্তু সবচেয়ে বড় কথা হলো, এই পরিণতির জন্য দায়ী যারা, তারা এখন দিব্যি ক্ষমতার গদি গরম করতে বসে আছে।
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের কথা মনে আছে? দেশের প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোকে বাইরে রেখে, জনগণের বড় অংশ যে ভোটকে প্রত্যাখ্যান করেছিল, সেই ভোটের পথ ধরে যারা ক্ষমতায় এসেছে, তাদের শাসনামলেই বাংলাদেশের নাম উঠে এসেছে ব্রিটিশ হোম অফিসের “গ্রে লিস্টে”। কাকতাল বলে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই, কারণ সংখ্যাগুলো কথা বলে।
গত ১৮ মাসে বাংলাদেশের স্টুডেন্ট ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার বেড়ে এখন হয়েছে ২২ শতাংশ, যেখানে ব্রিটিশ সরকারের নিজস্ব সহনশীল সীমা মাত্র পাঁচ শতাংশ। যুক্তরাজ্যের নয়টি বড় বিশ্ববিদ্যালয় ইতিমধ্যে বাংলাদেশি শিক্ষার্থী ভর্তি বন্ধ করে দিয়েছে। এই সংখ্যাগুলো রাতারাতি তৈরি হয়নি, তবে এই মুহূর্তে দেশ পরিচালনার দায়িত্বে যারা আছেন, তারা পরিস্থিতি সামলানোর কোনো লক্ষণ দেখাতে পারছেন না।
বিএনপি দলটির জন্ম থেকে ইতিহাস ঘাঁটলে একটা প্যাটার্ন স্পষ্ট হয়ে যায়। জিয়াউর রহমান সেনানিবাসের ভেতরে বসে যে দলটি তৈরি করেছিলেন, সেটি কখনো গণতান্ত্রিক চর্চাকে আপন করতে পারেনি। ক্ষমতায় থাকলে দুর্নীতি, না থাকলে সহিংসতা, এই দুটো জিনিসই তাদের রাজনীতির মূল পরিচয় হয়ে দাঁড়িয়েছে দশকের পর দশক ধরে। এবার ক্ষমতার কাছাকাছি আসতে না আসতেই সেই পুরনো চেহারা ফিরে আসতে শুরু করেছে।
আর এখনকার তথাকথিত মন্ত্রিপরিষদ? নামসর্বস্ব এই কাঠামোটি দেশের ভেতরে যা করছে তা নিয়ে প্রশ্ন তো আছেই, কিন্তু আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি যে তলানিতে ঠেকেছে, সেটার জবাব কে দেবে? যখন হোম অফিসের ফাইলে বাংলাদেশ “হাই রিস্ক” তকমা পাচ্ছে, যখন বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের দরজা বন্ধ করছে, তখন সরকারের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো কূটনৈতিক তৎপরতার খবর নেই।
লন্ডনের আইনজীবী ব্যারিস্টার ইকবাল হোসেন সরাসরি বলেছেন, দ্বিতীয় প্রান্তিকের তথ্যে যদি অবস্থার পরিবর্তন না হয়, তাহলে মাত্র ২৪ ঘণ্টার নোটিশে বাংলাদেশের জন্য সকল ভিসা বন্ধ করে দিতে পারে হোম অফিস। ডিজিটাল কিল সুইচ তাদের হাতে আছে, ইচ্ছা করলেই ব্যবহার করতে পারে। এই পরিস্থিতিতে একটি দায়িত্বশীল সরকারের কী করার কথা ছিল? লন্ডনে হাইকমিশনকে সক্রিয় করা, হোম অফিসের সঙ্গে সরাসরি আলোচনায় বসা, দেশের ভেতরে যে কারণে মানুষ আশ্রয়ের পথ বেছে নিচ্ছে সেই সমস্যার মূলে হাত দেওয়া। কিন্তু সেসবের বদলে চলছে ক্ষমতার ভাগবাটোয়ারা নিয়ে নিজেদের মধ্যে কাড়াকাড়ি।
যে মানুষগুলো পড়াশোনার স্বপ্ন নিয়ে বিদেশে যাচ্ছেন, কিংবা যারা সত্যিকার অর্থে ভালো কাজের সুযোগ খুঁজছেন, তারা এই রাজনৈতিক ব্যর্থতার মাশুল গুনছেন সরাসরি। ভিসা প্রত্যাখ্যান, বিশ্ববিদ্যালয়ের দরজা বন্ধ, আন্তর্জাতিক পরিসরে দেশের নাম কলঙ্কিত, এই ক্ষতি একদিনে হয়নি ঠিকই, কিন্তু এই মুহূর্তে এটা থামানোর দায়িত্ব যাদের, তারা আদৌ সেই দায়িত্ব বুঝছে কিনা, সেটাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
মে মাসে যখন ব্রিটিশ হোম অফিস পরবর্তী পর্যালোচনায় বসবে, তখন বাংলাদেশের নামটা তালিকায় উঠবে কি উঠবে না, সেটার উত্তর অনেকটাই নির্ভর করছে এখনকার শাসকদের সদিচ্ছা আর সক্ষমতার ওপর। দুটোর কোনোটাই এখন পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না।

